সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯
walton1

মুক্তিযুদ্ধের সিনেমায় সাজানো বছর

মাতিয়ার রাফায়েল
  ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
'দামপাড়া' সিনেমার একটি দৃশ্য
আজ থেকে শুরু হলো বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ঢাকাই সিনেমার জন্যও চলতি বছরটি হয়ে থাকবে বিজয়ের মাসের হিসেবেই। কারণ এ বছরই দেশভাগ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং এই স্বাধীনতা অর্জনের পথে তুলে ধরা নানা ঘটনাবলি উপজীব্য করে বানানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি সিনেমা। পাশাপাশি এসেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নিউক্লিয়াস চরিত্র হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অনেক সিনেমায়। গত ৫১ বছরে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সংখ্যা পঞ্চাশেরও বেশি। এর বাইরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। কিন্তু সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ কোনো গেরিলা অভিযান, সে সময়কার নানা রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ, ঘটনার আগে ও পরের রাজনীতির পটভূমি ও যোগসূত্র তার কোনোটাই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এসব চলচ্চিত্রে সেভাবে তুলে ধরতে দেখা যায় না; যেমনটা দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তৈরি পশ্চিমা অনেক ছবিতে। নিশ্চয় সে রকম আরও সিনেমা হয়ে যাবে সম্প্রতি ঘটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘটনা নিয়েও। ফলে সে রকম মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রশ্নটি সবার মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা কম কেন এ দেশে? এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান বলেন, 'বিনিয়োগ ফেরত না আসার ভয়ে বাণিজ্যিক নির্মাতারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করেন না।' প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরুও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সিনেমায় ব্যবসা হয় না বলে হল মালিকরাও তা প্রদর্শনে আগ্রহী হন না।' তবে এ বছরই মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে সেই নিয়ম ভাঙার বছর হয়ে থাকবে। এমনিতেই টানা দু'বছরে করোনার কারণে নাকাল হয়ে পড়া ঢাকাই সিনেমা আবার স্বরূপে ফিরতে পারবে কিনা এ নিয়ে ঘোরতর সন্দিহানেই ছিল ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রি। টানা দুই বছর বিগ বাজেটের অনেক সিনেমা নির্মাণ করেও মুক্তি দিতে পারেননি প্রযোজকরা। সেই শঙ্কা ও অচলাবস্থা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত ঢাকাই সিনেমা স্বরূপে তো ফিরেছেই বরং আরও বিপুল সম্ভাবনা জাগিয়েও এসেছে। কারণ, এ বছরই বানানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপট ও তার ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে বেশি সিনেমা। তার মধ্যে কিছু মুক্তিও পেয়েছে। এ বছরে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বানানো সিনেমার মধ্যে আছে যেমন মুশফিকুর রহমান গুলজারের 'টুঙ্গিপাড়ার দুঃসাহসী খোকা', কাজী হায়াতের 'জয়বাংলা', জাহিদ হোসেনের 'সুবর্ণভূমি', হৃদি হকের '১৯৭১ সেই সব দিন', রোজিনার 'ফিরে দেখা', রায়হান রাফীর 'দামাল', আশুতোষ সুজনের 'দেশান্তর', জি এইচ হাবিবের 'ছিটমহল', প্রদীপ ঘোষের 'বীরকন্যা প্রীতিলতা', রাশিদ পলাশের 'প্রীতিলতা', ফাখরুল আবেদীন খানের 'জেকে ১৯৭১' এবং বড় বাজেটের সিনেমা শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত 'মুজিব :একটি জাতির রূপকার'। তার মধ্যে মুক্তিও পেয়েছে ক'টি। এর মধ্যে রায়হান রাফীর 'দামাল' অন্যতম। ফরিদুর রেজা সাগরের মূল ভাবনায় 'দামাল' সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন নাজিম উদ দৌলা ও রায়হান রাফী। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ঘটনার সঙ্গে এই সময়ের গল্পের মিশেলে তৈরি হয়েছে 'দামাল'। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন স্থানে মোট ১৬টি ম্যাচ খেলে। ম্যাচগুলো থেকে মোট আয় করা পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে জমা দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের জুনে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হয়। এ ঘটনাকেই মূল উপজীব্য করে সিনেমাটি আবর্তিত হয়। এছাড়া চলতি মাসের ১৬ তারিখে মুক্তি পাওয়ার তারিখ রয়েছে কাজী হায়াতের 'জয়বাংলা' সিনেমা। আমাদের দেশে এমনিতেই মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সিনেমা হলের মালিকরা প্রদর্শনে আগ্রহী হন না। কারণ হিসেবে তারা বলেন, তাতে দর্শক যেমন কম তার ওপর ব্যবসা তো দূরের কথা বিনিয়োগকৃত অর্থও ফেরত আসে না। সে হিসেবে 'দামাল' সিনেমাটি ভালো দর্শক টানতে সমর্থ হয়েছে বলা যায়। প্রথমে অল্প কয়টি হলে মুক্তি পেলেও পরে হল মালিকরা ব্যবসায়িক সাফল্য দেখে পরবর্তী সপ্তাহেও প্রদর্শনে আগ্রহী হয়। ফলে ২০২২ সালে এটা দেশের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা প্রদর্শনের ইতিহাসেই বিরল ঘটনা হয়ে থাকবে। সে হিসেবে চলতি বছরটি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার বছর বললেও অতু্যক্তি হয় না। মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম সিনেমা 'ওরা ১১ জন' থেকে শুরু করে ২০২২ সাল পর্যন্ত যতটি মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সিনেমা হয়েছে তার মধ্যে নিঃসন্দেহে ২০২২ সালটিই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ এ বছর বেশ ক'টি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা হয়েছে যেগুলো সুনির্দিষ্ট পস্নট ধরে। যেমন গড়াই ফিল্মসের ব্যানারে বানানো 'জে কে ১৯৭১' যে সিনেমাটিকে প্রথম আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা বলা যায়। ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই নির্মিত এই সিনেমাটি বানিয়েছেন ফাখরুল আবেদীন খান। ইতিমধ্যেই সিনেমাটির টিজার প্রকাশ পেয়েছে। ছবিটি ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি দেয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত এটি আগামী বছরে মুক্তি দেয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষকে সহায়তার জন্য ফরাসি যুবক জঁ্য কুয়ে ছিনতাই করেছিলেন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি বিমান। তার দাবি ছিল- বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ওই বিমানে তুলে দিতে হবে এবং তাহলেই মুক্তি পাবে বিমানের সব যাত্রী। এ ঘটনা নিয়েই নির্মিত হয়েছে ছবিটি। এভাবে দেশভাগ, দেশান্তর, দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া পূর্বাপর ঘটনাবলি ও আখ্যান নিয়ে সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ২০২২ সালটি দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে