কেন্দ্রীয় চরিত্র হলে অভিনয় করব

প্রকাশ | ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০০:০০

মাতিয়ার রাফায়েল
'আমাকে কেন্দ্র করে গল্প আবর্তিত হলেই তবে সেই সিনেমায় আমি অভিনয় করব।' কথাটি আর কেউ নয় বলেছেন বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ট্যালেন্ট নায়িকা ববিতা। কিন্তু সেরকম সিনেমা তো বড়জোর দু-একটি গল্পে হতে পারবে, এর বেশি কিছু তো আশা যায় না। আসল কথা হচ্ছে এখন যে বয়সে এ নায়িকা দিন যাপন করছেন সেই বয়সটিকে প্রধান করে সিনেমা বানানো কম যোগ্যতার কথা নয়। কিন্তু একটা বয়সে যেটা খুব সম্ভব ছিল সেটা আজকের এই বয়সে খুব সম্ভব? একের পর এক সম্ভব হতো নতুন চরিত্রের মধ্যে সেই পুরনো জায়গাতে ফিরে যাওয়া কি সম্ভব আজকের অসম্ভবের বয়সে? না, সম্ভব নয়, আর তাই সম্ভব নয় বলেই ববিতাও এমন কথা বললেন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। অসংখ্য কালজয়ী সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছেন দেশ ও দেশের বাইরে। অভিনয়গুণে দর্শক মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। তবে দীর্ঘদিন ববিতাকে বড় পর্দায় দেখছেন না তার ভক্তরা। এখন অভিনয় থেকে অনেকটাই দূরে রয়েছেন তিনি। বেশির ভাগ সময় থাকেন কানাডায় ছেলের কাছে অথবা আমেরিকায় ভাইদের কাছে। কিছুদিন আগে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেশে এসেছেন এ অভিনেত্রী। সুযোগ হলেই ফিরবেন আবার অভিনয়ে, দর্শকরা তাকে আবারও পর্দায় দেখতে পাবে এমন আশার কথাই শোনালেন তিনি। বলেছেন, 'আমাকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি করা হলে অবশ্যই অভিনয় করব। অভিনয়কে আমি কখনোই বিদায় বলতে পারি না।' ববিতা আরও বলেন, 'এখন যেসব চরিত্রের জন্য আমাকে বলা হয়, এগুলো করতে আমি অভ্যস্ত নই। মাঝে শাকিব খানের একটি সিনেমার জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সিনেমার শুটিং আমেরিকা, কানাডায় নাকি হওয়ার কথা ছিল। আমি নিষেধ করে দিয়েছি। শুধু মায়ের চরিত্রে অভিনয় করতে চাই না। কেউ যদি আমাকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি করে তাহলে অবশ্যই অভিনয় করব। কারণ পাশের দেশগুলোতে দেখেন, অমিতাভ বচ্চন এ বয়সেও কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছে। শ্রীদেবী মৃতু্যর আগেও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এ চর্চাটা নেই। সবাই মনে করে বয়স হয়ে গেলেই নায়কের বাবা-মার চরিত্র ছাড়া আমাদের আর কোনো চরিত্র নেই। তাই আমি সিনেমায় নেই। ভালো এবং মনের মতো গল্প হলে অবশ্যই সিনেমায় আমাকে দেখবে দর্শক।' ছবি তো শেষ পর্যন্ত একটি বা দুটি কেন্দ্রীয় চরিত্রবিশিষ্ট হয়। আরও একাধিক চরিত্রও থাকতে পারে। যে চরিত্রগুলো কেন্দ্র করে সবচেয়ে ইতিহাস নাচানো সংলাপ আওড়াতে থাকে। যে সংলাপের কনটেন্টের মধ্যে সিনেমাটি মূর্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু চরিত্রের মধ্যে যদি 'মা' একটি চরিত্র থাকে, সেটা কি মূর্ত হয়ে উঠতে পারে। পারলে কত নম্বর পজিশনে? এই পজিশনটি ঠিক করতেই ছবিটির পরিচালকের প্রচলিত 'মা'কে উপেক্ষা করতে হবে। ফলে কাঙ্ক্ষিত গল্পের সিনেমা অধরাই থেকেই যায়। এজন্য ফরিদা আক্তার ববিতা বলেন, 'আমি যদি বুঝতে পারি এখনকার সিনেমায় দেওয়ার মতো কিছুই নেই আমার, তখন দূরে থাকাই ভালো। তারাও কিছু বানাতে পারলেন না, আমিও কিছু করতে পারলাম না। এমন সিনেমায় আমার এতকালের অর্জন তো মাটি করে দিতে পারি না। এখন শুধু নামকাওয়াস্তে থাকলাম, কিন্তু কিছুই পেলাম না- সেরকম গল্পও না, সেরকম চরিত্রও না- তা করে নিজের সুনাম তো বিনষ্ট করতে পারি না। তবে সেরকম চরিত্র হলে অবশ্যই করব।' ঢাকাই সিনেমা থেকে অনেক বছর দূরে দেশবরেণ্য শিল্পী ফরিদা আক্তার ববিতা। কারণ হিসেবে উপরোক্ত মন্তব্যের পর এখনকার ছবির মান সম্পর্কে বলেন, 'অ্যাকচু্যয়ালি এখন সিনেমাই দেখা হয় না। যে একটি কি দুটি দেখেছি, 'মনপুরা'টা ভালো লেগেছে। খুব যে মারাত্মক কিছু হয়েছে তা-ও না। আমাদের সময়ে যেসব সিনেমা হতো সে তুলনায় এখনকার সিনেমাগুলো কিছুই না। কিছুই না। শুধু এতটুকুই বলতে পারি।' একসময় সিনেমার দর্শক বলতে গোটা দেশের দর্শক ছিল এখন যেন ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে... এমনিতে সারা বছরে যেসব ছবি চলে তাতো দেখতে আছি কেমন চলে কিন্তু উৎকেন্দ্রিক সিনেমাগুলো? 'এটা কিন্তু দেশের সিনেমার জন্য খুব ভালো লক্ষণ না। ছবি হতে হবে সব ধরনের দর্শকের জন্য। সব শ্রেণির দর্শক থাকতে হবে সিনেমায়। নির্দিষ্ট একটা শ্রেণির জন্য বানানো সিনেমা কখনো গোটা দেশের কথা বলতে পারে না। গোটা দেশের পরিচয় বইতে পারে না।' আগে তো সিনেমার নামকরণেও সিনেমাটি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেত- কথাটি টেনে নিয়েই ববিতা বলেন, 'এখন কি সেরকম চিন্তা থেকে সিনেমা বানানো হয়! এখন হচ্ছে কিছু পয়সা ইনকাম হবে- সেই চিন্তা থেকে সিনেমা বানানো। তখন সিনেমা বানানো হতো দেশের জন্য। নিজের সুনামের জন্য। এখন যা হচ্ছে না কমার্শিয়াল, না আর্ট ফিল্ম, না টেলিফিল্ম- আমি নিজেও বুঝি না। এ সিনেমাগুলো কি বলতে চায় কিছুই বুঝি না।' কিন্তু এগুলো আলোচিত হচ্ছে- এমন মন্তব্যে বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে যোগদানকারী ববিতা বলেন- 'অ্যাকচু্যয়ালি মানসিক দিক থেকে আমি এমন আছি, এখন কোথায় কি হচ্ছে তা জানতে পারছি না। বাসায় কোনো পত্রপত্রিকাও রাখি না। কোন ছবি কোন উৎসবে গিয়েছে তাও আমার জানা হয় না।' দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গেই এখন সময় কাটছে ববিতার। নিজের ভাইয়েরা ও তাদের ছেলেমেয়ে, বোনের ছেলেমেয়ে সবাইকে নিয়ে সুন্দর সময় কাটছে তার। তিনি বলেন, 'অনেক বছর পর দাদাবাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছি ভাইবোনেরা মিলে।' এছাড়া বাপ-দাদার মাটিতে পা দিলে যে শান্তি, সেই শান্তি পৃথিবীর কোথাও নেই। কারণ এখনো বাড়িতে গেলে আশপাশের লোকজন আত্মীয়স্বজনের কাছে যেভাবে ভালোবাসা পাই, তাতেই হৃদয় জুড়ে যায়। এখন দেশে এভাবেই সময় কাটছে।' উলেস্নখ্য, ববিতাকে শেষবার দেখা গেছে নারগিস আক্তারের 'পুত্র এখন পয়সাওয়ালা' সিনেমায়।