logo
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১১ আশ্বিন ১৪২৭

  নূর মোহাম্মদ   ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

মাঠ প্রশাসন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

১০ বছরে ২৭৪৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রভাব খাটিয়ে প্রমাণিত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি

পাঁচ বছর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ঘুরে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা স্বামীর অনৈতিক কর্মকান্ড এবং নির্যাতনের বিচার না পেয়ে গত বছরের ১৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হন সালমা বেগম। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের এই অভিযোগ আমলে নিয়ে জনপ্রশাসন সচিবকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপরও তাকে প্রাথমিক কোনো শাস্তি না দিয়ে বহাল রেখেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে জনপ্রশাসনের এই মামলায় প্রভাব খাটিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা- এমন অভিযোগ সালমার।

হাতিয়ার এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে স্ত্রীর করা অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণ পায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হলেও মন্ত্রিপরিষদ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থেকে নোয়াখালীর হাতিয়ায় এসিল্যান্ডকে বদলি করা হয়েছে।

জেলা অফিসে কাজ করতে গিয়ে প্রেম-ভালোবাসাসহ নানা কুপ্রস্তাব দেয় ডিসি। এর বিচার চাইতে গিয়ে নিজের সংসার পর্যন্ত ভেঙে গেছে একজন নারী কর্মকর্তার। উপসচিব পদমর্যাদার এ নারী এক সন্তান নিয়ে অনেকটা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে একই জেলায় স্বামী-স্ত্রীর পদায়ন তার জীবনের কাল হয়ে আসবে তা বুঝতে পারেননি তিনি। সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে কয়েক মাস পর ডিসির বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন তিনি। এরপরই ডিসি তার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়কে তদন্তের নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এরপর গেল সপ্তাহে ওই ডিসিকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসনে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কমিটির পর ওই নারী কর্মকর্তা পড়েছেন অন্য বিড়ম্বনায়। তার কাছে অডিও-ভিডিওসহ দালিলিক প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, স্বামী ও বাচ্চার কারণে ওই সময়ে ডিসির পাঠানো এসএমএসসহ অন্যান্য প্রমাণাদি মুছে (ডিলিট) ফেলেছি। ভিডিও দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তদন্ত কর্মকর্তা চাইলে এগুলো উদ্ধার করা সম্ভব। তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, আমি দুই থেকে আড়াই কেজির মতো কাগজপত্র দিয়ে আসছি। তারপরও তদন্ত কর্মকর্তা সন্তুষ্ট না। তিনি বলেন, ওই ডিসির কারণে আমার ক্যারিয়ারে অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। লন্ডনে একটি ফেলোশিপ পেয়ে যেতে পারিনি।

সালমা, খাদিজা কিংবা এডিসি নারী কর্মকর্তা নয়, গত ১০ বছরে প্রশাসনের দুই হাজার ৭৪৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগ তদন্ত করে মাত্র ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপর প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আলোকে ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এর আগেসহ এ নিয়ে সর্বমোট ৪৪০টি বিভাগীয় মামলার মধ্যে গত ১০ বছরে ৬৭ জন কর্মকর্তাকে গুরুদন্ড, ১২৬ জন কর্মকর্তাকে লঘুদন্ড এবং ২০৩ জন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নামে নানা অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ জমা হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। এসব অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বে একই ক্যাডারের সিনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণ হচ্ছে না। এরপরও যে দু-একটি ঘটনা তদন্তে প্রমাণ হচ্ছে নানা তদবিরের কারণে সেই অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে দায়িত্বে বহাল থেকে প্রভাব খাটিয়ে তদবিরের মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করছেন। শাস্তি না হওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা বেড়েই চলেছে।

ভুক্তভোগী সালমা আক্তার জানান, ২০১২ সালে সাভারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন তার স্বামী। দুই মেয়েসহ স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সেখানে কর্মরত থাকাকালে অপর এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে তিনি অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্ত্রী এর প্রতিবাদ করলে তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করতে থাকেন। এরপর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ দুই মেয়েসহ স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এটি সহ্য করতে না পেরে ৩০ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন সালমা। ওই বছরের ১৪ অক্টোবর একই অভিযোগ করেন অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ওই নারীর স্বামীও। এ সময় ৮ এপ্রিল সহকারী কমিশনারকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ১২ মে ২০১৪ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। হঠাৎ অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে গত ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব (উপসচিব) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। যদিও চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অভিযোগের মাত্রা ও প্রকৃতি বিবেচনা করে তার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা অথবা তদন্তকার্যে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারেন।

এ ব্যাপারে সালমা যায়যায়দিনকে বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর তদন্ত শুরু হয় এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু হঠাৎ করে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কীসের ভিত্তিকে অব্যাহতি দেওয়া হলো তার কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান ভুক্তভোগী এ নারী।

ব্যাচমেটের সঙ্গে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক, স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব না নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ করেন হাতিয়ার এসিল্যান্ডের স্ত্রী খাদিজা খাতুন। এসব অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পরও দায়িত্বে বহাল আছেন ওই কর্মকর্তা। প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুরোধে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের করা তদন্তে এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়। তবুও তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ওই কর্মকর্তার স্ত্রী খাদিজা আক্তার কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বিচার পাচ্ছেন না। গুটিকয়েক প্রভাবশালী কর্মকর্তার কারণেই তার শাস্তি হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্ত্রীর। গত সপ্তাহে এ ঘটনার শুনানি হয়েছে। সেখানে দ্রম্নত তার শাস্তি দাবি করেন খাদিজা।

জানা গেছে, হাতিয়ার এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগগুলো হলো- স্ত্রী সন্তানের অধিকার বঞ্চিত করা, স্ত্রীকে মানসিকভাবে নির্যাতন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং তালাক দেওয়ার হুমকি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনসহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গত ২৫ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদের চিঠির পরও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠলে তাদের ওএসডি করা হয়। কিন্তু তাকে ওএসডি না করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থেকে নোয়াখালীর হাতিয়ায় এসিল্যান্ড হিসেবে বদলি করা হয়েছে। এতে প্রশাসনের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেই মনে করেন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, খাদিজা আক্তার তার স্বামীর নামে ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবং ২০ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের সঙ্গে নির্যাতনের বিভিন্ন ছবি এবং ফোনকলের অডিও রেকর্ডের ক্লিপও জমা দেন খাদিজা। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে ১৯ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইখতিয়ার উদ্দিন আরাফাত। এই কমিটি অভিযুক্তের বিরুদ্দে করা স্ত্রী খাদিজার ৬টি অভিযোগের মধ্যে চারটির প্রমাণ পায়।

অভিযুক্ত কর্মকর্তার কয়েকজন সহকর্মীও তাদের বক্তব্যে বলেছেন, তার সঙ্গে তারই এক ব্যাচমেটের সখ্যতাটা বেশি ছিল। দুজনের আচরণ তাদের কাছে যথেষ্ঠ সন্দেজনক ছিল। তারা ফেনীতে থাকাকালীন একই ডরমিটরির একই তলায় পাশাপাশি রুমে থাকতেন। ফলে তারা দিন-রাত দুজন দুজনের রুমে অবাধে যাতায়াত করতেন। এটি তাদের অন্য সহকর্মীদের চোখেও পড়েছে।

এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, এসিল্যান্ডরা ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করেন। কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বিষয়টি তারা ভালো বলতে পারবেন। এছাড়া মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ বিষয়ে তারা ভালো বলতে পারবেন। এ ব্যাপারে ভূমি সচিব মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে