৯ মাস ধরে বন্ধ ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি

এখনো ডাটা এন্ট্রির বাইরে ৬০ হাজার প্রাথমিক স্কুল নতুন বই পেলেও মেলেনি জুতা, জামা, ব্যাগের এককালীন টাকা
৯ মাস ধরে বন্ধ ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি

৯ মাস ধরে বন্ধ প্রাথমিকের ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি। এর সঙ্গে আটকে গেছে নতুন বছরে বইয়ের সঙ্গে জামা, জুতা ও ব্যাগ কেনার জন্য এককালীন ১ হাজার টাকাও। উপবৃত্তি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান বদল এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সময়মত টাকা ছাড় না করায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। করোনার মহামারির মধ্যে উপবৃত্তি টাকা না পেয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এতে ঝরে পড়ার হার আবারও বেড়ে যাবে এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপবৃত্তি প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০২০ সালের জানুয়ারি টু মার্চ মাসের টাকা শিক্ষার্থীদের মায়ের মোবাইলে পাঠানো হয়েছে। গেল বছরের আরও তিনটি কিস্তি এপ্রিল-জুন, জুলাই-সেপ্টেম্বর, অক্টোবর- ডিসেম্বর আটকে রয়েছে। নতুন বছর ২০২১ সালে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি হয়ে গেছে। বকেয়া ৯ মাসের উপবৃত্তির টাকা কখন ছাড় হবে তারও সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বলতে পারছেন না কেউ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বশেষ ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন মাসের অর্থ ছাড়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা ছাড়ে গড়িমসি করায় সেটাও দেরি হচ্ছে। এরপর থেকে জুলাই-আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর- ডিসেম্বর এই দুই কিস্তির টাকা কবে পাওয়া যাবে তারও নিশ্চিয়তা নেই।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রম্নতি নতুন বছরের বইয়ের সঙ্গে জামা, জুতা ও ব্যাগ কেনার জন্য শিক্ষার্থীদের এককালীন ১ হাজার টাকা কিট অ্যালাউন্স দেওয়া প্রক্রিয়া আটকে গেছে অর্থের অভাবে। এক কালীন টাকার জন্য ১১'শ কোটি টাকার চেয়ে কয়েক দফা চিঠি দিয়েও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাড়া মিলছে না। ফলে নতুন বই পেলেও এককালীন টাকা পাবে কিনা তা এখন অনিশ্চিত।

জানা গেছে, ২০২০ সালে ডিসেম্বর মাসে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্পের

(৩য় পর্যায়) মেয়াদ শেষ হয়। এরপর আরও এক বছরের জন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বর মাসে উপবৃত্তি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই)। রূপালী ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং 'শিউর ক্যাশ' বদলে ডাক বিভাগের মোবাইল লেনদনকারী প্রতিষ্ঠান 'নগদ'কে কাজ দেওয়া হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী এতদিন উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা নতুন করে 'নগদের' সার্ভারে ডাটা এন্ট্রি করতে হচ্ছে। এতে দুই দফা সময় দিয়েও ৬৫ হাজার স্কুলে মধ্যে শুক্রবার (১৫ জানুয়ারি) পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজারের মতো প্রতিষ্ঠানের ডাটা এন্ট্রি করাতে পেরেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। কবে নাগাদ এই এন্ট্রির কাজ শেষ হবে তা নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ ডাটা এন্ট্রির কাজ শেষ না হলে উপবৃত্তি বিতরণ সম্ভব হবে না।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন 'প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রদান' প্রকল্পের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ইউসুফ আলী বলেন, ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন মাসের কিস্তির টাকা ছাড় করার চেষ্টা করছি। অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা ছাড় করা মাত্রই তা বিতরণ করতে আমরা প্রস্তুত। তবে পরের কিস্তির টাকা কবে বিতরণ করা হবে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ ছাড়ের উপর নির্ভর করছে বলে জানান তিনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আগামী সপ্তাহে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এককালীন ১ হাজার টাকাসহ বাকি কিস্তির টাকা চাওয়া হবে।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, অভিভাবকরা প্রায় আমাদের কাছে জানতে চায় উপবৃত্তির টাকা কবে পাবে। কোনো উত্তর দিতে পারি না। তিনি বলেন, উপবৃত্তির টাকা দেওয়ায় যেমন ঝরে পড়ার হার কমেছে তেমনি এই টাকা সময়মত না দিলে ঝরে পড়ার হার বাড়বে।

ভোগান্তির নেপথ্যে জন্ম নিবন্ধন

গত ১৩ ডিসেম্বর প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বিতরণের জন্য সার্ভিস চার্জ দশমিক ৭৫ পয়সা ধরে নগদের সঙ্গে চুক্তি করে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প। চুক্তি অনুযায়ী, জিটুপি (সরকার টু পাবলিক) পদ্ধতিতে উপবৃত্তি টাকা বিতরণ করবে নগদ। চুক্তিতে উপবৃত্তির সুবিধাভোগী অর্থাৎ শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন এবং শিক্ষার্থীর মা'র জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে ডাটা এন্ট্রি করা বাধ্যতামূলক করা হয়।

এরপর ২৮ ডিসেম্বর থেকে ডাটা এন্ট্রি কাজ শুরু করে নগদ। ডাটা এন্ট্রির শুরু থেকেই নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। এর মধ্যে অন্যতম স্কুলে শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন না থাকা। ভর্তির সময় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন না নেওয়া, অভিভাবকদের কাছে সন্তানের জন্ম নিবন্ধন না থাকায় তারা ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ডে জন্মনিবন্ধন আনতে গিয়েও সার্ভার জটিলতায় পড়েছে।

এর সঙ্গে নগদের সার্ভারে সমস্যা, মফস্বল এলাকায় ইন্টারনেটের ধীরগতি, মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা, শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের খুঁজে না পাওয়ার কারণে ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে কচ্ছপগতিতে।

রাজধানীর ভাষানটেক স্কুলের শিক্ষক জলিল মন্ডল বলেন, ডাটা এন্ট্রি করতে গিয়ে রীতিমত পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। ভর্তির সময় অনেক শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন নেওয়া হয়নি, অনেকের জন্ম নিবন্ধন খুঁজে পাচ্ছি না, অভিভাবকদের কাছে চাইলে অনেকের কাছে নেই। নতুন করে করতে গিয়ে তারাও সার্ভার ডাউনের কথা বলছেন। এছাড়া প্রথমদিকে নগদের সার্ভারে সমস্যা ছিল। কোনো এন্ট্রি দিতে পারিনি। এসব কারণে এখনও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ডাটা এন্ট্রি করতে পারেনি।

উপবৃত্তি প্রকল্পের তথ্যমতে, প্রথম দফা সময় বাড়ানোর পর শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ৬৫ হাজার স্কুলের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ১০৬টি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ডাটা এন্ট্রি করতে পেরেছে। আগামী রোববার (১৭ জানুয়ারি) বর্ধিত সময় শেষ হবে।

এরপর কি আবার সময় বাড়ানো হবে এমন প্রশ্নে প্রকল্প পরিচালক মো. ইউসুফ আলী বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত আমরা মাত্র ৫ হাজার স্কুলের তথ্য পেয়েছি। আগামী রোববার পর্যন্ত সময় রয়েছে। এর মধ্যে আরও প্রতিষ্ঠান এন্ট্রির কাজ শেষ করবে। কারণ অনেকেই ৭০ থেকে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীর তথ্য এন্ট্রি করছে। বাকিগুলো করলে তারাও সম্পূর্ণ হালনাগাদ তথ্যের মধ্যে চলে আসবে। এরপর কত প্রতিষ্ঠান বাকি থাকে তা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

শিক্ষকরা জানান, নগদের সার্ভারে শিক্ষার্থীদের মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র ও সেই পরিচয়পত্র দিয়ে কেনা সিম দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। তা না হলে নগদ ডাটা এন্ট্রি নিচ্ছে না। এতে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন।

নতুন বই পেলেও পায়নি জুতা, জামা, ব্যাগের টাকা

২০২০ সালে ফেব্রম্নয়ারি মাসে এক অনুষ্ঠানের প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। বছরের প্রথম দিন নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। নতুন বইয়ের সঙ্গে ২০২১ সালে তারা জামা, জুতা ও ব্যাগ কেনার জন্য ১ হাজার টাকা কিট অ্যালাউন্স দেওয়া হবে।

এর মধ্যে ২০২১ সালের নতুন বছরের প্রথম দিনে বই তুলে দিলেও শিক্ষার্থীদের হাতে এককালীন এ টাকা তুলে দিতে পারেনি সরকার। এর কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ না নেওয়ায় তারা বইয়ের সঙ্গে টাকা তুলে দিতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছর দুই দফা এককালীন টাকা (১১'শ কোটি টাকা) অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় এতে কোনো সাড়া দিচ্ছে না।

প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ টাকা আপাতত দেওয়া সম্ভব নয় বলে আমাদের জানিয়েছে। নিয়মিত উপবৃত্তি টাকা চেয়ে সেই টাকা মিলছে না, তার মধ্যে কিট অ্যালাউন্স দেওয়া সম্ভব না বলে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়েছে।

এদিকে আগামী সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ে সংশোধিত বাজেট নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এককালীন টাকা ইসু্যটি উঠানো হবে জানান প্রকল্প পরিচালক। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, বুধবার প্রধানমন্ত্রী ফের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের এককালীন টাকা দেওয়া হবে দেশবাসীকে বলেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়টি ফের মনে করিয়ে দিব।

প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য ১৯৯৯ সালে উপবৃত্তি প্রকল্প শুরু হয়। বর্তমানে তৃতীয় মেয়াদ শেষে 'বিশেষ বছর' চলছে। প্রাথমিক উপবৃত্তি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে প্রাক-প্রাথমিক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংযুক্তি প্রাথমিক স্তর, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত প্রাথমিক স্কুল, ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম পর্যন্ত চালু করা সরকারি প্রাথমিক স্কুল, সরকার স্বীকৃতপ্রাপ্ত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং হাই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এ বৃত্তি পেয়ে থাকেন। শ্রেণিভেদে শিক্ষার্থীদের ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা (চার শিক্ষার্থীর পরিবার) পর্যন্ত উপবৃত্তি দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের মায়েদের নামে খোলা হিসাবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এই টাকা পাঠানো হয়। তিন মাস করে বছরে চার কিস্তিতে এই টাকা দেওয়া হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে