ভুল বার্তায় বাড়ছে শঙ্কা

টিকা নেওয়া একজন ব্যক্তির দেহে ভাইরাস প্রবেশ করলে তিনি হয়তো টের পাবেন না। কারণ, তার কোনো উপসর্গ থাকবে না। টিকার ফলে সৃষ্ট অ্যান্টিবডিগুলো ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলা করতে পারে, কিন্তু তার শ্বাসতন্ত্রের ওপরের অংশ থেকে ভাইরাস তাড়িয়ে দিতে পারে না। তাই টিকাগ্রহণকারী ব্যক্তির এসব ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন থাকা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
ভুল বার্তায় বাড়ছে শঙ্কা
টিকাদানে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক সেবিকা

প্রাতঃভ্রমণ শেষে রমনা পার্ক চত্বরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে গল্প করছেন চলিস্নশোর্ধ্ব ৭-৮ জন নারী। তাদের একজন ছাড়া কারও মুখে মাস্ক নেই। নেই নিরাপত্তা দূরত্ব বজায় রাখার বালাই। কথা বলে জানা গেল, তাদের মধ্যে যিনি মাস্ক পরিহিত, তিনি ছাড়া আর সবাই দুই-তিনদিন আগে করোনা টিকা নিয়েছেন। তাই তারা এখন নিজেদের সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ভাবছেন। আর এ কারণেই তারা দীর্ঘদিন পর মাস্ক ছাড়া পার্কে হাঁটতে বের হয়েছেন।

এই পার্কেই প্রাতঃভ্রমণে ব্যস্ত অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল গণির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনিও চারদিন আগে করোনার টিকা নিয়েছেন। তাই নিশ্চিন্তে মাস্ক ছাড়া পার্কে হাঁটছেন। নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরে মর্নিংওয়াক করা অনেকটাই দুঃসাধ্য; তাই প্রায় এক বছর পার্কে আসেননি বলে জানান তিনি।

শুধু এই ক'জনই নয়, সারাদেশে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ এতদিন মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়ার কথা একবারের জন্য চিন্তা করেননি, সেসব সচেতন নারী-পুরুষের অনেকেই এখন করোনার টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা পুরোপুরি ভুলে গেছেন। তারা শুধু নিজের কাছে নয়, অন্যের জন্যও নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ ভাবছেন। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তা পেয়েছেন, টিকাগ্রহণকারী ব্যক্তির করোনায় সংক্রমিত হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই। এ ছাড়া তাদের মাধ্যমে অন্য কেউ সংক্রমিতও হবে না।

অথচ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পর মানবদেহ করোনাভাইরাসের জেনেটিক উপাদানগুলো চিনে নিতে এবং অ্যান্টিবডি ও টি-সেল তৈরি করতে বেশ খানিকটা সময় নেয়। এরপরই এগুলো ভাইরাসের দেহকোষে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বা আক্রান্ত কোষগুলোকে মেরে ফেলতে শুরু করে। অর্থাৎ টিকার পুরো কার্যকারিতা তৈরি হতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন সপ্তাহ বা কারও কারও ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় লাগে। তাই টিকাগ্রহণকারী ব্যক্তি এ সময়ের আগে নিজে করোনায় সংক্রমিত হতে পারেন; তার মাধ্যমে এই রোগ ছড়ানোরও আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ফাইজার, মর্ডানা, সিনোভ্যাক ও কোভিশিল্ডসহ সারা বিশ্বে এখন পর্যন্ত যে কয়টি করোনা টিকার অনুমোদন পেয়েছে, এগুলোর ট্রায়ালে মূলত দুটি বিষয় দেখা হয়েছে। এর একটি হলো টিকাটি নিরাপদ কিনা এবং অপরটি হলো তা করোনাভাইরাস আক্রান্তদের গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া কতখানি ঠেকাতে পারে। দুটি ক্ষেত্রেই ভালো ফল পাওয়া গেছে। এ কারণে এগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে টিকা নিলেও একজন থেকে আরেকজনে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে কিনা, এর অনুসন্ধান করা হয়নি। ফলে যারা টিকা নিয়েছেন, তারা অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারেন কিনা- এ বিষয়টি এখনো অজানা।

অন্যদিকে এ নিয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- টিকা নেওয়া একজন ব্যক্তির দেহে যদি ভাইরাস প্রবেশ করে, তাহলে তিনি হয়ত টের পাবেন না। কারণ, তার কোনো উপসর্গ থাকবে না। এমন হতেই পারে, টিকার ফলে সৃষ্ট অ্যান্টিবডিগুলো ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলা করতে পারে, কিন্তু তার শ্বাসতন্ত্রের ওপরের অংশ থেকে ভাইরাস তাড়িয়ে দিতে পারে না। তাই টিকাগ্রহণকারী ব্যক্তির এসব ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন থাকা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

গবেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাস ছড়ানোর ওপর টিকা কোনো প্রভাব ফেলে কিনা, তা এখনো অজানা। তবে টিকা দেওয়ার পরও মানবদেহে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হতে অন্তত তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া উচিত। বিশ্বের যেসব দেশ করোনার টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে, ওইসব দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা এই পরামর্শ দিয়েছেন।

ইসরাইলের উদাহরণ টেনে সংশ্লিষ্টরা জানান, সে দেশের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ক্ল্যালিট চার লাখ লোকের মেডিকেল রেকর্ড পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে দুই লাখ ষাটোর্ধ্ব মানুষ টিকা নিয়েছেন, বাকি দুই লাখ ষাটোর্ধ্ব মানুষ টিকা নেননি। প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর দুই সপ্তাহ পর্যন্ত দেখা গেছে, দুই গ্রম্নপেই করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়া মানুষের অনুপাত মোটামুটি সমান। কিন্তু এরপর থেকে টিকা নিয়েছেন- এমন লোকের মধ্যে নতুন করে ভাইরাস সংক্রমণের পরিমাণ ৩৩ শতাংশ কমে যেতে দেখা গেছে। অর্থাৎ টিকার কার্যকারিতা শুরু হতে অন্ততঃ দুই সপ্তাহ সময় লেগেছে।

অন্যদিকে ফাইজারের টিকার যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছিল হাজার হাজার লোকের ওপর, এতেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। সেই জরিপেও দেখা গেছে, টিকা নেওয়া এবং না নেওয়া অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমণের হারে ব্যবধান তৈরি হতে দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল। প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর ১০০ দিন পর্যন্ত সেই ব্যবধান বেড়েছে।

উলেস্নখিত বিষয়াদি পর্যালোচনায় বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করার পর থেকে এমনিতেই দেশের মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে পুরোপুরি অবহেলা করছেন। এর ওপর টিকা নেওয়ার পর সচেতন অনেক মানুষ যেভাবে বেপরোয়া চলাচল করছেন, এতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যারা টিকা নিচ্ছেন, তাদের এক তৃতীয়াংশও যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে অবহেলা করেন, তাহলে এক সময় তা বিশাল সংখ্যা হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ তিন কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনা হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলা মানুষের সংখ্যা এই হিসাবে এক কোটি হবে। আর তা হলে ভাইরাস সংক্রমণের চেইন চলতেই থাকবে এবং টিকার সুফল কার্যত অধরাই থাকবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলেন, করোনা টিকাগ্রহণ পরবর্তী করণীয় কী- এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি টিকা দেওয়ার সময়ও এ ব্যাপারে কোনো পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগেই এ ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো দেশে টিকা দেওয়ার সময় টিকাগ্রহণ পরবর্তী নির্দেশনার লিফলেট ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

লন্ডনে বসবাসকারী প্রবাসী বাঙালি রাজিয়া মার্জিয়া জানান, সেখানে টিকা দেওয়ার সময় জানানো হচ্ছে, কোভিড-১৯ এর টিকা নেওয়ার পরও সেই ব্যক্তি অন্যকে ভাইরাস সংক্রমিত করতে পারেন। তাই টিকা নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি আগের মতো অনুসরণ করা উচিত। এ ছাড়া ডায়াবেটিকসহ বহুমাত্রিক রোগে আক্রান্ত প্রবীণ ব্যক্তিদের চলাফেরা কেমন হবে, এরও একটি গাইড লাইন দেওয়া হচ্ছে। ফলে সেখানে টিকাগ্রহণকারী ব্যক্তির মধ্যে সচেতনতা যে যথেষ্ট বেড়েছে, তা জোরালোভাবে দাবি করাই যায়- যোগ করেন প্রবাসী ওই নারী।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রবাসী বাঙলি চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) কোভিড-১৯ টিকার অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী, টিকাগুলোকে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কার্যকরী হতে হয়। এখন যেসব টিকা আছে, সেগুলোর কার্যকারিতার অন্তর্র্বর্তীকালীন তথ্য থেকে দেখা যায়, ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার কার্যকারিতা ৯৫ শতাংশ, মডার্নার টিকার ৯৫ শতাংশ, রাশিয়ার স্পুতনিক-ভি টিকার ৯২ শতাংশ এবং অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকার কার্যকারিতা ৭০-৯০ শতাংশ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হলেও একটি নির্ধারিত সংখ্যক মানুষের দেহে এসব টিকা অকার্যকরী হবে। তবে কে বা কারা এই তালিকায় পড়বে, তা অনির্ধারিত। তাই টিকা নিয়েই মানুষ নিজেকে সুরক্ষিত ভাবলে, তা বড় ধরনের ভুল হবে। এতে করোনার প্রকোপ কমতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী বলেন, কার্যকর টিকা সংক্রমণ প্রতিরোধ করার মাধ্যমে অযাচিত মৃতু্য হ্রাস করে। তবে এই মহামারি থেকে উত্তরণের জন্য মাস্ক পরা, হাত ধোয়া ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার চর্চা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। মহামারির অবসান ঘটাতে হার্ড ইমিউনিটি এবং সুরক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। টিকা আর সাধারণ সংক্রমণ প্রতিরোধের মাধ্যমে এটি গড়ে তুলতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে