কঠোর অবস্থানের পরও নৌকার বিরোধিতায় দলীয় এমপিরা!

বিভিন্ন নির্বাচনে এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের বিরোধিতায় বেকায়দায় পড়েছেন প্রার্থীরা
কঠোর অবস্থানের পরও নৌকার বিরোধিতায় দলীয় এমপিরা!

দলীয় কোনো নেতা নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে পদ থেকে বহিষ্কার ও আগামীতে কোনো ধরনের নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। এমন কঠোর হুঁশিয়ারির পরও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে বিদ্রোহীদের মদদ দিয়েই যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্রোহীদের মদদ দেওয়াসহ সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। পাবনা পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করায় জেলার শীর্ষ ১৮ নেতাকে শোকজ করা হয়েছে। তাছাড়া দলের ভেতরে কোন্দল সৃষ্টির অভিযোগে সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ (সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) চার নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য জেলায়ও সাংগঠনিক টিম প্রতিবেদন তৈরি করছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের পাশাপাশি তাদের মদদদাতাদেরও চিহ্নিত করছে আওয়ামী লীগ। চলতি মাসে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে দোষীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এমনকি দোষী প্রমাণিত হলে অনেক সংসদ সদস্য দলীয় পদও হারাতে পারেন। তবে প্রাথমিক সদস্য পদ থাকবে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, যেসব এলাকায় নিজের পছন্দের প্রার্থী মনোনয়ন পান না সেখানে এমপিরা শুধু নৌকা কিংবা প্রার্থীরই বিরোধিতা করেন না, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনকে নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করতে নির্দেশ দেন। বেশিরভাগ জায়গায় এমপিরা প্রকাশ্যে কাজ না করলেও তাদের ঘনিষ্ঠজনদের নৌকার বিরোধী তৎপরতায় বিপাকে পড়েন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

এদিকে, চলমান পৌরসভা ও উপজলো পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের বিরোধিতায় দেশের অনেক জায়গায় বেকায়দায় পড়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। নিজেদের পছন্দের লোক মনোনয়ন না পেলেই নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করাচ্ছেন তারা। কোনো কোনো জায়গায় নিজের বলয় ঠিক রাখতে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের বিরুদ্ধে।

কুমিলস্নার দেবীদ্বার উপজেলা উপনির্বাচনে কুমিলস্না-৪ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থীকে জয়ী করতে নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন নৌকার প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।

জানা গেছে, কুমিলস্নার দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন এএফএম তারেক। সাত বছর আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের 'বিদ্রোহী' প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন তিনি। তারেক এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের চাচা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সীর ছোট ভাই।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, চাচাকে বিজয়ী করতে শেখ হাসিনার প্রার্থীকে হারাতে সব ধরনের শক্তি প্রয়োগ করছেন এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগকে প্রভাবিত করছেন বিএনপির পক্ষে কাজ করতে। যারা এমপির ভয়ভীতি উপেক্ষা করে নৌকার পক্ষে কাজ করছেন তাদেরকে ঘরবাড়ি ছাড়া করার হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০১৯ সালে দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জয়নুল আবেদীন। গত ৩ ডিসেম্বর তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শূন্য ওইপদে আগামী ২৮ ফেব্রম্নয়ারি নির্বাচন হবে।

সূত্রগুলো আরও বলছে, ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রম্নয়ারি দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি দলীয় সমর্থন পেয়েছিলেন দেবীদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম সফিকুল আলম। পরদিন কুমিলস্নার একটি রেস্তোরাঁয় এএফএম তারেককে পাল্টা দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী। ওই নির্বাচনে তারেক পরাজিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী একেএম সফিকুল আলমও পরাজিত হন।

এবার সেই তারেক বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন। আর বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী করতে দলীয় নিদের্শনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সব ধরনের প্রভাব ঘাটাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, স্থানীয় এমপি নৌকা ডুবাতে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ভয়ভীতি ও প্রলোভন দিয়ে আমার পক্ষে কাজ করা থেকে বিরত রেখেছে। নৌকার এমপি হয়ে কিভাবে নৌকার বিরোধিতা করে?

আগামী ২৮ ফেব্রম্নয়ারি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন দলের উপজেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম। আর বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমান মোলস্না। এখানেও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ। তারা স্থানীয় সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো।

অন্যদিকে, সর্বশেষ দলের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভায় বিদ্রোহী ও তাদের মদদদাতাদের ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে সারাদেশে নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে কারা কারা কাজ করছেন সেই তালিকা তৈরি করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান যায়যায়দিনকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করতে বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। বেশ কয়েকজনের নামও এসেছে। তালিকা পেলে পরবর্তী কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভা এবং প্রার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগগুলো আমরা প্রতিবেদন আকারে জমা দেব।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে