বিক্ষোভে উত্তাল মিয়ানমার

জীবনের পরোয়া না করে লড়ছে জান্তাবিরোধীরা

'যাকে দেখব তাকেই গুলি করব', টিকটকে সেনার ভিডিও
জীবনের পরোয়া না করে লড়ছে জান্তাবিরোধীরা

গত মাসের অভু্যত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে সবচেয়ে 'রক্তাক্ত' দিন ছিল বুধবার। এদিন দেশটিতে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনার পর বৃহস্পতিবারও মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে ফের ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ দমনে পুলিশ তাজা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সংবাদসূত্র : রয়টার্স, এনডিটিভি

আগের দিন বৃহস্পতিবার বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ এবং সেনার গুলি ও সংঘাতে ৩৮ জনের মৃতু্যর খবর দিয়েছিল জাতিসংঘ। এমন দমন-পীড়নের পরও মিয়ানমারের অভু্যত্থানবিরোধীরা সামরিক শাসন মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চিসহ অন্যদের মুক্তি এবং নভেম্বরের নির্বাচনে সু চির দলের জয়ের স্বীকৃতি আদায়ে চাপ বাড়ানোর ব্যাপারেও তারা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। জীবনের পরোয়া না করেই রাজপথের

লড়াই অব্যাহত রাখছে তারা।

মং সংখ নামের এক আন্দোলনকারী বলেন, 'আমরা জানি, যেকোনো সময় গুলিতে নিহত হতে পারি। কিন্তু জান্তার অধীনে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। মুক্তির জন্য বিপজ্জনক এই পথই বেছে নিয়েছি আমরা।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা যেভাবে পারি জান্তার সঙ্গে লড়াই করে যাবো। জান্তার শেকড় গোড়া থেকে উপড়ে ফেলাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।'

বৃহস্পতিবার ইয়াঙ্গুন ও মধ্যাঞ্চলীয় শহর মোনিয়ায় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। গুলি-কাঁদানে গ্যাসের পরও ইয়াঙ্গুনে বিক্ষোভকারীরা ফের জড়ো হয়ে স্স্নোগান দেয় এবং প্রতিবাদী গান গায়। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ ইয়াঙ্গুনের পশ্চিমের শহর পাথেইনেও গুলি চালিয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম।

এদিন মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয় এবং মন্দিরের শহর বাগানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছে। কয়েকশ আন্দোলনকারীকে সু চির ছবি ও 'আমাদের নেত্রীকে মুক্তি দাও' ব্যানার নিয়ে মিছিল করতে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার মান্দালয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পাঁচটি যুদ্ধবিমান নিচু দিয়ে আলাদা বিন্যাসে বেশ কয়েকবার উড়ে যায় বলে শহরটির বাসিন্দারা জানিয়েছেন। একে জান্তার শক্তির প্রদর্শনী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বুধবার বেশ কয়েকটি শহরে পুলিশ ও সেনারা গুলি চালানোর আগে বিক্ষোভকারীদের সেভাবে সতর্কও করেনি। জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিনা শানার পরে নিউইয়র্কে জানান, বুধবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে সংঘাতে ৩৮ জনের মৃতু্য হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে ১ ফেব্রম্নয়ারির অভু্যত্থানবিরোধী আন্দোলনে মৃতের সংখ্যা ৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ'র গবেষক রিচার্ড উইয়ার বলেছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীকে দেখে মনে হচ্ছে, তাদের এখনকার উদ্দেশ্য হচ্ছে সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে অভু্যত্থানবিরোধী আন্দোলনের মেরুদন্ড ভেঙে দেওয়া। এক ঘটনায়, নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা এক ব্যক্তির শরীরের পেছনের অংশে গুলি করা হয়েছে বলেও মনে হচ্ছে, জানিয়েছে এ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনটি।

যাকে দেখব তাকেই গুলি করব

টিকটকে সেনার ভিডিও

এদিকে, মিয়ানমারের সেনা ও পুলিশ সদস্যরা ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ টিকটকে বিক্ষোভকারীদের হুমকি দিয়ে ভিডিও তৈরি করছে। ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'মিয়ানমার আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট'র (মিডো) বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

মিডো জানায়, তারা সামরিক বাহিনীর পক্ষে তৈরি করা আটশ'র বেশি ভিডিও পেয়েছে, যেখানে বিক্ষোভকারীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। মিডোর নির্বাহী পরিচালক টাইকে টাইকে অং বলেন, টিকটকে ইউনিফর্ম পরা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের শত শত ভিডিও রয়েছে। এটি শুধু হিমশৈলের অগ্রভাগ।

এ বিষয়ে কথা বলতে সেনাবাহিনী ও জান্তা সরকারের এক মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফেব্রম্নয়ারিতে বানানো এমন একটি ভিডিও রয়টার্স যাচাই করেছে। সেখানে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরিহিত এক ব্যক্তি তার রাইফেল ক্যামেরার দিকে তাক করে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে গালি দিয়ে বলছেন, 'আমি তোমার মুখে গুলি করব, আমি সত্যিকারের বুলেট ব্যবহার করছি।'

নিষেধাজ্ঞা-বিচ্ছিন্নতার জন্যও

প্রস্তুত মিয়ানমার জান্তা

অন্যদিকে, সামরিক অভু্যত্থানের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বা একঘরে করে দেয়, তাহলে তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত আছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। বুধবার জাতিসংঘের এক শীর্ষ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানান। দেশটিতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তা।

জাতিসংঘ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গেনার নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উপপ্রধান সোয়ে উইনের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। এ সময় তিনি সোয়ে উইনকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সামরিক অভু্যত্থানের প্রতিক্রিয়ায় সেনাবাহিনী কিছু দেশের শক্ত পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারে এবং তারা বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

জাতিসংঘ দূত বলেন, 'তার (সোয়ে উইন) উত্তর ছিল, 'আমরা নিষেধাজ্ঞায় অভ্যস্ত এবং আমরা টিকে আছি।' তিনি আরও বলেন, 'আমি যখন সতর্ক করলাম, তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে, তার উত্তর ছিল 'অল্প কিছু বন্ধুর সঙ্গেই আমাদের চলতে শিখতে হবে।'

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তার ব্যবসায়িক মিত্রদের চাপ দিতে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বা দেওয়ার বিবেচনা করছে।

এছাড়া মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। তবে রাশিয়া এবং চীনের আপত্তির মুখে অভু্যত্থানের নিন্দা জানাতে পারেনি। ঘটনাগুলোকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় মনে করে দেশ দুটি। রাশিয়া ও চীনের উদ্দেশে শ্রেনার বার্গেনার বলেন, 'আমি আশা করি, তারা এটাকে শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখবে না, এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'

সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ১৯

পুলিশ, অপেক্ষায় আরও

এদিকে, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমারের অন্তত ১৯ জন পুলিশ সদস্য। ভারতের এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বুধবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, মিয়ানমারের এসব পুলিশ সদস্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরামের চাম্পাই এবং সারচিপ জেলার সীমান্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকেছেন।

স্পর্শকাতর ইসু্য হওয়ায় আশ্রয়প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে তারা সবাই মিয়ানমার পুলিশের নিম্নপদস্থ সদস্য এবং ভারতে প্রবেশের সময় পুরোপুরি নিরস্ত্র ছিলেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই ভারতীয় কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার থেকে আরও অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসতে পারেন বলে ধারণা করছেন তিনি। ভারত-মিয়ানমারের মধ্যে প্রায় এক হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার অভিন্ন স্থল সীমান্ত রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে