কর মওকুফের ফায়দা লুটছে মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ী চক্র

সয়াবিন ও পাতেল আমদানিতে ৪ শতাংশ অগ্রিকর তুলে নেওয়া হয়েছে ষ বিশাল অঙ্কের রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হলেও এর কোনো সুবিধা পাচ্ছে না সাধারণ ভোক্তারা
কর মওকুফের ফায়দা লুটছে মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ী চক্র

দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহজ প্রাপ্য ও দাস্থিতিশীল রাখতে গত কয়েক মাসে ৫ নিত্যপণ্যের ওপর কর মওকুফ করেছে সরকার। রোববার রমজান মাসে ভোজ্যতেলের দাসহনীয় রাখতে সয়াবিন ও পাতেল আমদানিতে ৪ শতাংশ অগ্রিকর প্রত্যাহার করা হয়। কারণে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার। তবে সরকার কর মওকুফ করলেও এর সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না সাধারণ ভোক্তারা। অবশ্য ক্রেতারা বঞ্চিত হলেও মওকুফের ফায়দা লুটছে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ী চক্র।

রোববার সয়াবিন ও পাতেল আমদানিতে কর প্রত্যাহার করে গেজেট প্রকাশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রসঙ্গে এনবিআরের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা এমমুমেন যায়যায়দিনকে জানান, রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে আমদানি করা অপরিশোধিত সয়াবিন ও পামওয়েল তেলের ওপর ৪ শতাংশ অগ্রিকর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে কর মওকুফ পাওয়া ৫ পণ্যগুলো হলো- চাল, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি ও ডাল।

যদিও আন্তর্জাতিকবাজারে দাবাড়ার কারণে গত ১৫ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের বোতলের দামিলগেটে ১২৭ টাকা, ডিলার পর্যায়ে ১৩১ এবং খুচরায় ১৩৯ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। ওই সময় পাঁচ লিটারের বোতল মিল গেটে ৬২০ টাকা, ডিলার পর্যায়ে ৬৪০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ৬৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর আগে সয়াবিন তেলের দামিলগেটে ১০৭ টাকা এবং খুচরায় ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ছাড়া

প্রতি লিটার খোলা পাতেলের দানির্ধারণ করা হয়েছে মিলগেটে ১০৪ টাকা, ডিলার পর্যায়ে ১০৬ টাকা এবং খুচরায় ১০৯ টাকা।

গত ১৭ ফেব্রম্নয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক বিষয়ক জাতীয় কমিটির সভায় প্রতিলিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামিলগেটে ১২৩, পরিবেশক পর্যায়ে ১২৭ এবং খুচরায় ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামিলগেটে ৫৮৫, পরিবেশক পর্যায়ে ৬০০ এবং খুচরায় ৬২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিবার দানির্ধারণের পরও খোলাবাজারে এর চেয়ে বেশি দরে বিক্রে করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। বাংলাদেশে ব্যবহার হওয়া তেলের ৭০ শতাংশই পাসুপার। আগে এর প্রতি লিটারের দাছিল মিলগেটে (খোলা) ৯৫ টাকা, পরিবেশক পর্যায়ে ৯৮ টাকা এবং খুচরা বাজারে ১০৪ টাকা।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত জুলাই থেকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ও অপরিশোধিত পাতেলের দাবাড়ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিকবাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দা(এফওবি) ১ হাজার ২৭৫ ডলার এবং পাতেলের দা(এফওবি) ১ হাজার ৩৭ ডলার। পাশাপাশি পরিবহণ খরচ ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ এবং বোতলের কাঁচামাল রেজিনের দা৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে। ভোজ্যতেলের দাবাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও বিবেচনায় আনা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন কর মূল্যের সঙ্গে স্থানীয় বাজারের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাসের একটি সম্পর্ক রয়েছে। কর মূল্য বৃদ্ধি পেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা পণ্যের বাজার মূল্যকে প্রভাবিত করে। অপরদিকে কর মূল্য কেেগলে বাজার মূল্যের ওপর এর প্রতিফলন ঘটতে অনেক সময় লাগে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি স্থানীয় বাজারে চালের মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য একটি দর নির্ণয় সভায় এনবিআর চাল আমদানির জন্য ধার্যকৃত করের পরিমাণ ৬২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫.৭৫ শতাংশ করেছে। কিন্তু করের হার কমানোর পরও মূল্যের ওপর কোনো প্রভাব না পড়ায় সরকার চালের কর ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এনবিআরের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাল আমদানির ক্ষেত্রে কর মওকুফ বাস্তবায়নের পর ২৩ ফেব্রম্নয়ারি ২০২১ পর্যন্ত এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ১৪৩ কোটি টাকা। ৭ জানুয়ারি থেকে ২৩ ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত ২৫.৭৫ শতাংশ কর প্রদান হারে মোট আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৩২৮.২৮ টন চাল, যার মূল্যমান ৯৯১ কোটি টাকা। উলেস্নখ্য, এই সমপরিমাণ চাল যদি ৬২.৫ শতাংশ হারে কর প্রদানের মাধ্যআেমদানি করা হতো, তাহলে জাতীয় কোষাগারে আরও ১৪৩ কোটি টাকা কর মূল্য জমা পড়ত।

এদিকে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ কর মওকুফ সুবিধা পেয়েছে। সময়ের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৮ টন পিঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে, যার কর মূল্য ৮২২ কোটি টাকা এবং এর ফলে রাজস্ব খাতে ৪১ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে ভোজ্যতেল গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা ও পাইকারি উভয় ক্ষেত্রেই ভোজ্যতেলের দাবেড়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত টনপ্রতি সয়াবিন তেলের দাছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা, যা দফায় দফায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার টাকায়। শুল্ক বিভাগের রেকর্ডকৃত তথ্য যাচাই করে দেখেছেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করছে।

শুল্ক বিভাগের চটগ্রাশাখার তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-জানুয়ারি এই সময়ের মধ্যে পাঅয়েল আমদানি করা হয়েছে ৫ লাখ ২৫ হাজার ২০৮ টন, যেখানে তার আগের বছর আমদানি করা হয়েছিল প্রায় ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৪৩৫ টন। গত জুলাই-জানুয়ারিতে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করা হয়েছে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৯৩৬ টন, যা তার আগের বছর আমদানি করা হয়েছিল ৩ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৫ টন। গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিকবাজারে ভোজ্যতেলের দাঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি পর্যন্ত ৬০ হাজার ৩৩১ টন চিনি আমদানি করা হয়েছে, তার আগের বছর যার পরিমাণ ছিল ৫৭ হাজার ৬৯৫ টন।

সূত্র জানায়, এনবিআর দীর্ঘদিন যাবৎ অপরিহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন চাল, পেঁয়াজ, চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালের ওপর কর মওকুফের সুবিধা প্রদান করে আসছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দর অস্থিতিশীল হলেই আদেশ জারির মাধ্যকের মওকুফের ঘোষণা প্রদান করে থাকে এনবিআর। কিন্তু কর কমানোর কোনো প্রভাব বাজারে পড়ে না। অথচ দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাকমানোর জন্য সরকারের কাছে কর মওকুফ চায়।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, কর মওকুফের কারণে সরকার প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও সাধারণ ভোক্তারা নয়, এর ফায়দা লুটছে অসৎ ব্যবসায়ীরা। যদিও কর মওকুফের কারণে সরকার কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাংকের আগের এক সমীক্ষা মতে, বিভিন্ন খাতে কর মওকুফের কারণে বাংলাদেশ মোট জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এনবিআরের মতে, বর্তমানে আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে কর মওকুফ করা হয়েছে। ফলে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্যের চেয়ে বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক ক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের উচ্চমূল্য আদায় করছেন এবং কর মওকুফের সুযোগের অপব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য নির্ধারণ ও তদারকির জন্য জাতীয় পর্যায়ে গঠিত সমিতির মতে, কর মওকুফের ফলে মূল্যহ্রাসের সুবিধা ভোগ করার অধিকার প্রত্যেক ক্রেতার পাওয়া উচিত। কিন্তু করের পরিমাণ কমানোর পর স্থানীয় বাজারে মূল্য হ্রাসের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোনো রকউদ্যোগ গ্রহণ করছে না।

বিষয়ে ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ক্যাবের সভাপতি গোলারহমান যায়যায়দিনকে বলেন, সঠিক কর নিরূপণের মাধ্যিেনত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার এযাবৎ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে তার মনে হয় না। অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যএেই অসাধু ব্যবসায়ীদের কর্মকান্ড রোধ করা যেতে পারে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে