শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতে উদ্যোগ নেই

শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতে উদ্যোগ নেই

করোনা মহামারিতে অভিভাবকদের আয় কমে যাওয়া, কর্মহীন হয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাসহ নানা সংকটে গত ১৫ মাসে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। বিশেষ করে এ মহাদুর্যোগে দরিদ্র থেকে অতিদরিদ্রের কাতারে এসে দাঁড়ানো বিপুলসংখ্যক পরিবার তাদের সন্তানদের লেখাপড়া থেকে সরিয়ে নিয়ে বিভিন্ন ছোটখাটো কাজে লাগিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেক শিশু বই-খাতা ছেড়ে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে। উদ্বেগজনক হারে শিক্ষার্থীদের এই ঝরে পড়া ঠেকাতে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রস্তাবিত বাজেটেও এ খাতে সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ নেই।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার শুরুতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত হালে পানি পায়নি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। উচ্চবিত্তের সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার যে বৈষম্য রয়েছে তা আরও প্রবল হয়ে উঠছে। যা শিক্ষার হারের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯ ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে গেছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালিত হয়।

গবেষণার আরেকটি ধাপ 'কোভিড ইমপ্যাক্ট অন এডুকেশন লাইফ অব চিলড্রেন'- এ শহর ও গ্রামের ৬ হাজার ৯৯টি পরিবারের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্কুল বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষায় ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, মানসিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাসহ দীর্ঘমেয়াদি নানা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গবেষণায় শহরের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষণ ঘাটতির ঝুঁকি বেশি বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। মেয়েদের ২৬ ও ছেলে শিক্ষার্থীদের ৩০ শতাংশ এ ঝুঁকিতে রয়েছে। দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যারা অতিদরিদ্র, সেসব পরিবারের মাধ্যমিক স্কুলগামী ৩৩ শতাংশ ছেলে শিক্ষার্থীর করোনাসৃষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কায় স্কুল ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, ৯৫ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানদের পুনরায় স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হলে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কেননা ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের মার্চ অবধি শিক্ষা খরচ ১২ গুণ বেড়েছে। ফলে শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়েছে। স্কুলগামী ছেলেশিশুদের ৮ ও মেয়েশিশুদের ৩ শতাংশ

\হকোনো না কোনো উপার্জন প্রক্রিয়ায় জড়িয়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলে যেখানে শহরের তুলনায় মানুষের আয় পুনরুদ্ধারের ও কাজের ভালো সুযোগ রয়েছে, সেখানে এ হার আরও বেশি।

তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দূরে থাক, তাদের পরিসংখ্যান তৈরিতেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের কিভাবে দ্রম্নত চিহ্নিত করে পুনরায় লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনা যায় এ নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো গবেষণা শুরু করেনি। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর এ নিয়ে কাজ শুরু করার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে যেহেতু এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ নেই, সেহেতু তা কার্যকর করার সুযোগ খুবই কম। তাদের ভাষ্য, প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হলেও এতে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। বাজেটে শিক্ষার সঙ্গে অন্যান্য খাত যুক্ত করে টাকার অঙ্কে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।

বিগত বছরের মতো এবারও প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে একীভূত করে 'শিক্ষা ও প্রযুক্তি' খাত করা হয়েছে। এতে রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যৎ প্রকল্পের বরাদ্দও শিক্ষা খাতের বাজেট হিসেবে দেখানো হয়েছে। মহামারিকালে শিক্ষা খাতের ক্ষতি পোষানোর কোনো পরিকল্পনা বাজেটে দেখতে পাননি বলে দাবি করেন তারা।

শিক্ষা গবেষকরা বলেন, দেশের মানুষের শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, অথচ শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তেমন কোনো পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। ঝরে পড়াদের ফের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার কোনো ছক তৈরি করার খবর তারা পাননি। এতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া না হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুববে।

তারা ঝরে পড়া লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাথমিকের অতিদরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসিক অন্তত ৫০০ টাকা এবং মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করেন। এছাড়া পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরাসরি ও ডিজিটাল মাধ্যমের সংমিশ্রণে 'বেস্নন্ডেড লার্নিং' প্রবর্তন করার তাগিদ দেন শিক্ষাবিদরা। এর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সব স্কুলে অতিদরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ, খাতা-কলম-পেন্সিলসহ যাবতীয় শিক্ষা উপকরণ বিনা মূল্যে প্রদান এবং প্রাইভেট টিউটর কিংবা কোচিং সেন্টারের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দূর করা গেলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ফের লেখাপড়ায় ফিরে আসতে পারে বলে মনে করেন তারা।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে শুধু স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নিলেই হবে না। এজন্য বেশকিছু দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হবে। আর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করা জরুরি। এ তালিকা তৈরিতে শিক্ষকদের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগানো যেতে পারে।

দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার আগেই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা। যাতে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যোগ দেওয়ার পরপরই এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হয়। করোনা সংকটে যেসব শিক্ষার্থী এরই মধ্যে ঝরে পড়েছে এবং আরও যাদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের নাম-ঠিকানা ও আনুষঙ্গিক তথ্যাদি সংগ্রহ করে দ্রম্নত যোগাযোগ করার তাগিদ দিয়ে শিক্ষাবিদরা বলেন, দীর্ঘ সময় পার হলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে ফিরে আনা যাবে না। কেননা এদের অনেকেই বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাবে। অতিদরিদ্র অনেক মাধ্যমিক পড়ুয়া মেয়েরা পরিবারের চাহিদামতো বিয়ে করলে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল আহমেদ জানান, করোনাকালে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার আগের চেয়ে বেশখানিকটা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থাকায় এ দুর্যোগময় সময়ে তা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া স্কুল বন্ধ থাকায় বেশকিছু শিক্ষার্থী অন্য কাজকর্মে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকরা যাতে তাদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের স্কুলে ফিরিয়ে আনেন এ জন্য আগেভাগেই দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হবে। মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নেবে।

এ ব্যাপারে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি স্বীকার করে অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, 'করোনাকালে কতসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে সে পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর এর সঠিক পরিসংখ্যান জানা যাবে। তবে আমরা অনুমান করছি এ সংখ্যা একেবারে কম হবে না। স্কুল খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখব কারা স্কুলে আসছে না। তাদের বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতে হবে কেন তারা আসছে না এবং তাদের আবার ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।'

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই সাধ্যমতো শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছে দাবি করে অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, 'শহরাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেওয়া সমস্যা। তারা ফোনে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিচ্ছেন।' তবে এ পদক্ষেপ কতটা সফল হচ্ছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারেননি তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে