প্রয়োজন ছাড়াই আইসিইউতে রেফার আতঙ্কে করোনা আক্রান্ত রোগীরা

প্রয়োজন ছাড়াই আইসিইউতে রেফার আতঙ্কে করোনা আক্রান্ত রোগীরা

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত একজন রোগীর অক্সিজেন চাহিদা যতক্ষণ মিনিটে ১৫ লিটার পর্যন্ত থাকে ততক্ষণ সাধারণভাবেই তার চিকিৎসা দেওয়া যায়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অক্সিজেন চাহিদা মিনিটে ১৬ থেকে ২০ লিটারের কাছাকাছি গেলেও শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাৎক্ষণিক আইসিইউ সাপোর্ট ছাড়াই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু অধিকাংশ হাসপাতালে এই চাহিদা ১৫ থেকে ২০ লিটারের কাছাকাছি হলেই রোগীকে বাধ্য করা হয় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে। এমন পরিস্থিতিতে করোনা ডেডিকেটেড আইসিইউগুলোতে দিন দিন রোগীর চাপ বাড়ছে। প্রয়োজন ছাড়াই আইসিইউ রেফারের ফলে তা ব্যবস্থা করতে না পারায় মৃতু্য আতঙ্কে ভুগছেন রোগীরা। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় বলা হয়েছে করোনায় আক্রান্ত মাত্র ৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ভাইরাসটি মারাত্মক হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে গেলে আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হতে পারে। তবে রোগীর অক্সিজেনের চাহিদা মিনিটে ১৫ লিটারের কিছু বেশি হলেই যে আইসিইউ লাগবে এই ধারণা একবারেই ভুল। কিন্তু অনেক হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে, এই অজুহাতে ব্যবসায়িক লাভের উদ্দেশ্যে রোগীকে তাৎক্ষণিক আইসিইউতে নেওয়ার পরমার্শ দিচ্ছেন। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইসিইউ শয্যা ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে শতভাগ প্রয়োজন \হছাড়াই রোগীকে আইসিইউতে রেফারের পরামর্শে জেলা শহর থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীর বড় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে খুব বেশি আইসিইউ সাপোর্ট দরকার না হলেও আতঙ্কিত রোগীর স্বজনরা নানা তদবিরের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ শয্যা দখলে রেখেছেন। ফলে গুরুত্বর অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় সময়মতো মানসম্মত আইসিইউ সেবা মিলছে না। আইসিইউ জোগাড় করার চেষ্টায় উন্নত চিকিৎসা ছাড়াই অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন। অপরদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের পরামর্শে আইসিইতে ভর্তি হলেও সেখানে খরচ সামলাতে পারছেন না অধিকাংশ রোগীর পরিবার। গত ১৯ জুলাই জাহানারা বেগম (৫৭) নামে একজন করোনা পজেটিভ রোগী রাজধানীর বেসরকারি আজগর আলী হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ভর্তি হন। ২২ জুলাই সেখান থেকে ছাড়পত্র দিয়ে রোগীকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই রোগী ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে আসলে তার মিনিটে ২০ লিটার অক্সিজেনে স্যাচুরেশন ৯৪ থেকে ৯৬ এর মধ্যে থাকতে দেখা যায়। ধানমন্ডি ক্লিনিকের চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক আইসিইউ সাপোর্ট ততটা প্রয়োজন ছিল না বলে জানান, কিন্তু আতঙ্কিত স্বজনরা ঝুঁকি না নিয়ে আইসিউতে রোগীকে ভর্তি করেন। একইভাবে ফাহিমা খাতুন (৫০) নামে আরেক রোগীর আইসিইউ সাপোর্ট দরকার বলে গত ২০ জুলাই বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকার ধানমন্ডি ক্লিনিকের আইসিইউতে রেফার করা হয়। ক্লিনিকের চিকিৎসকরা জানান, প্রথম অবস্থায় রোগীকে মিনিটে ১৫ লিটার অক্সিজেন প্রয়োগে স্যাচুরেশন ৯৭তে থাকতে দেখা যায়। রোগীকে পর্যায়ক্রমে কয়েকদিন চিকিৎসা দিয়ে মিনিটে ৫ লিটার করে অক্সিজেন দেওয়ার এক পর্যায়ে অক্সিজেন স্যাচুরেশন শতকরা ৯৭ থেকে ৯৮ মধ্যে চলে আসে। এভাবে আইসিইউ চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে গত ২৭ জুলাই তিনি বাড়ি চলে যান। জানতে চাইলে ধানমন্ডি ক্লিনিক হাসপাতালের কোভিড ক্রিটিক্যাল কেয়ারের কো-অর্ডিনেটর ও ডিপেস্নামা ইন ইলেক্ট্রো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, চলতি মহামারি শুরু থেকে বিভিন্ন হাসপাতালের কোভিড আইসিইউতে কাজ করতে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, প্রথমত একজন করোনা রোগীর অক্সিজেন চাহিদা মিনিটে ১ থেকে ১৫ লিটার হলে, তাকে সাধারণ অক্সিজেন ফ্লো মিটার দিয়ে অক্সিজেন দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, রোগীর অক্সিজেন চাহিদা ১৫ থেকে ২০ লিটার হলে, সে ক্ষেত্রে পাশাপাশি দুটি অক্সিজেন ফ্লো মিটার দিয়ে ২০ মিনিটে লিটারের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে ১৫ লিটার এবং অক্সিজেন ন্যাজাল লাইন দিয়ে ৫ লিটার দিতে হবে। তৃতীয়ত রোগীর অক্সিজেন চাহিদা মিনিটে ২০ লিটারের বেশি হলে, অর্থাৎ ২০ থেকে ৮০ লিটার পর্যন্ত হলে হাই-ফ্লো অক্সিজেন ন্যাজাল ক্যানুলা সংযুক্ত মেশিনের দ্বারা মিনিটে ২০ থেকে ৮০ লিটার অক্সিজেন রোগীর দেহে সরবরাহ করতে হবে। চতুর্থ ধাপে হাই-ফ্লোর মাধ্যমেও অবস্থার উন্নতি না হলে সে ক্ষেত্রে বাইপ্যাপ বা নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেটরের মাধামে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। আর বাইপ্যাপের মাধ্যমেও যদি উন্নতি না হয়, সে ক্ষেত্রে রোগীকে আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্টে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়াসমূহ ১০০ ভাগ কার্যকর এবং মানসম্মত। সুতরাং, রোগীর অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে গেলেই তাকে আইসিইউ'তে নিতে হবে, আইসিইউ ছাড়া চিকিৎসা হবে না, এমন চিন্তাভাবনা করার কোনো কারণ নেই। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত আর মানসম্মত চিকিৎসায় পারে অনাকাঙ্ক্ষিত যে কোনো দুর্ঘটনার হাত থেকে রোগীকে বাঁচাতে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে