পোশাক রপ্তানির টার্গেট পূরণে শঙ্কা

একদিকে ডলার, অন্যদিকে কাঁচামালের দামও বেড়েছে। ফলে পোশাক খাত উভয়মুখী সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে গার্মেন্ট শিল্প টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ সামলানোর আগেই গ্যাস-বিদু্যতের সংকট এ খাতে নতুন বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে
পোশাক রপ্তানির টার্গেট পূরণে শঙ্কা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম এই দুই বাজারের ক্রেতারা নতুন পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে দেশীয় গার্মেন্টগুলোর ক্রয়াদেশ প্রায় ৩০ ভাগ কমে গেছে। ডলারের বাজারে অস্থিরতায় রেমিট্যান্স কমার পাশাপাশি দেশের রিজার্ভ কমায় পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খুলতেও গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা হিমশিম খাচ্ছেন। এর ওপর লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ভীষণভাবে ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কোটি কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ বাতিল হতে পারে। পাশাপাশি গার্মেন্ট খাতে রপ্তানির টার্গেট পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন বায়িং হাউজ ও গার্মেন্ট মালিকরা।

গার্মেন্ট খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, করোনা-পরবর্তীতে তৈরি পোশাক শিল্প ঘুরে দাঁড়ালেও বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে সংকট শুরু হওয়ায় এই উত্থান ধারায় ছেদ পড়েছে। জুলাই থেকে আগামী ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত পোশাক কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৭০ শতাংশ বুকিং অর্ডার পাচ্ছে। ফলে সাব-কন্ট্রাক্টের কাজের ওপর নির্ভরশীল অনেক ছোট ছোট গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অর্ডার সংকটে বড় ও মাঝারি কারখানাগুলোও তাদের সুইংসহ অন্যান্য প্রোডাকশন লাইন কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে।

একদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে কাঁচামালের দামও বেড়েছে। ফলে পোশাক খাত উভয়মুখী সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে গার্মেন্ট শিল্প টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ সামলানোর আগেই গ্যাস-বিদু্যতের সংকট এ খাতে নতুন বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইতোমধ্যে 'টার্গেট' ও 'ওয়ালমার্ট' তাদের কনফার্ম করা অর্ডার বাতিল করেছে। এ দুই খুচরা বিক্রেতার কাছেই প্রচুর অবিক্রীত পণ্য রয়ে গেছে বলে বস্নুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো কার্যাদেশ বাতিলের খবর জানায়নি।

আরএম গ্রম্নপের কর্ণধার রাজীব আহমেদ জানান, তার একাধিক বায়ার তৈরি পোশাকের কনফার্ম অর্ডার স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন। বায়ারদের দাবি, তাদের আগের ইম্পোর্টেড পণ্যের বড় অংশ এখনও স্টকে রয়ে গেছে। ক্রেতার অভাবে তারা এসব পণ্য আগের গতিতে বিক্রি করতে পারছেন না। তাই নতুন কার্যাদেশের পণ্য উৎপাদন করতে কিছুটা বিলম্ব করতে বলছেন। বায়াররা জানিয়েছেন, স্টক শেষ হওয়ার আগেই তারা নতুন অর্ডারগুলো কনফার্ম করবেন।

একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন সিজিএস নামের আরও একটি বায়িং হাউজ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল আলম জানান, তার বায়ার কনফার্ম অর্ডার আপাতত স্থগিত করেছেন। বায়ারদের ভাষ্য, ক্রেতাদের একটি বড় অংশ বেশ কিছু দিন পোশাক না কিনে খাদ্য ক্রয়ের দিকেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। যদিও এখন এ ধারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে আগের মতো গতিশীল হয়নি। তাই নতুন মাল কিনে স্টক করতে তারা দেরি করছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে নতুন অর্ডার কনফার্ম করার পরিবর্তে বাতিল করা হতে পারে বলেও আগাম আভাস দিয়েছেন তারা।

এ পরিস্থিতি তৈরি হলে গার্মেন্ট রপ্তানির টার্গেট কোনোভাবেই পূরণ করা যাবে না বলে শিল্প মালিকরা মনে করছেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এ প্রসঙ্গে যায়যায়দিনকে বলেন, 'চলতি অর্থবছরে শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকেই ৪৬.৮ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও এই লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যা পূরণ করা কঠিন হতো না। বরং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই খাত থেকে বেশি আয় করার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস-বিদু্যৎ সংকটের কারণে উৎপাদন যেভাবে ব্যাহত হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে টার্গেট পূরণ করা একেবারেই অসম্ভব।'

মোহাম্মদ হাতেম জানান, জ্বালানি সংকট নিয়ে তারা অতি সম্প্রতি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা এ খাতে রিজার্ভ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার কথা বলেছেন। এর পরিবর্তে তারা অতিরিক্ত ১৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেওয়ার প্রতিশ্রম্নতি দেন। সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও গত মাসে তারা ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি করেছেন বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, বিদায়ী অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। যা বিগত অর্থবছরের চেয়ে ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই খাত থেকে আয় বেশি এসেছে ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ। যার মধ্যে নিট পোশাক থেকে এসেছে ২৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। নিট পোশাকে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি এসেছে ১৯ শতাংশ। ওভেন পোশাক থেকে এসেছে ১৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। এক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয় হয়েছে ২৪ দশমিক ১২ শতাংশ।

তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই প্রেক্ষাপট দ্রম্নত পাল্টে যেতে শুরু করেছে। অনেক গার্মেন্টে জুলাই মাসে কাজ থাকলেও আগস্টের জন্য কোনো বিদেশি বায়ারের কোনো ক্রয়াদেশ নেই। বেশকিছু গার্মেন্টে মধ্য সেপ্টেম্বরের পর উৎপাদনের জন্য কোনো অর্ডার পায়নি। যদিও স্বল্পসংখ্যক গার্মেন্ট মালিক জানিয়েছেন, তাদের আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যাদেশ রয়েছে। বেগতিক কোনো পরিস্থিতি তৈনি না হলে এর মধ্যে তারা নতুন কাজের অর্ডার পাবেন বলে আশা করছেন।

আশুলিয়ার আল্পস অ্যাপারেলসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কারখানাটিতে মাত্র দেড় মাসের নিট পোশাক উৎপাদনের ক্রয়াদেশ আছে। তারপর উৎপাদন চালানোর মতো কোনো অর্ডার এখনও পাননি। তবে একই মালিকানাধীন ফ্যাশন ডটকমে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত উৎপাদনের মতো ক্রয়াদেশ আছে বলে জানা গেছে।

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রম্নপ কর্তৃপক্ষ জানায়, জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গার্মেন্টের ক্রয়াদেশ আসার হার কমেছে। আবার দামও কমেছে ৮ থেকে ১০ শতাংশ।

শুধু এই দু'টি প্রতিষ্ঠানই নয়, তাদের মতো অনেক রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশ কমে আসছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদু্যতের সংকট। বিদু্যতের লোডশেডিংয়ের কারণে খরচ বাড়ছে পোশাক কারখানায়। আর গ্যাস-সংকটে অনেক বস্ত্রকলের উৎপাদন ৫০ শতাংশের মতো ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সময়মতো সুতা ও কাপড় সরবরাহ পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা।

গার্মেন্ট মালিকরা জানান, বর্তমানে কারখানাগুলোতে শীতের পোশাক তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী বসন্ত ও গ্রীষ্মের ক্রয়াদেশ আসার সময়ও এখন। গত বছর করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর ক্রয়াদেশ এসেছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ থেকে পোশাকের ক্রয়াদেশ কম আসছে। আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে। এ পরিস্থিতিতে গার্মেন্ট রপ্তানির টার্গেট পূরণের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে জানান এ খাতের উদ্যোক্তারা।

রপ্তানি বাজারের জন্য পোশাক তৈরির কাঁচামাল আমদানি করতে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) সনদ দেয় তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। ফলে ইউডির সংখ্যা দিয়ে পোশাকের ক্রয়াদেশ কম নাকি বেশি সেটি বোঝা যায়। বিজিএমইএ'র নেতারা জানান, গত মে-জুন মাসে ইউডি নেওয়ার সংখ্যা ২০২১ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে একই সময়ে বিকেএমইএ থেকে ইউডি নেওয়ার সংখ্যা ১০ শতাংশ কমেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে