শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

আগামী বছর মহাসংকটের

বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা, চাষাবাদের অনুরোধ হ বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে হ ইলেকশন করুক, কার কোথায় কতটুকু যোগ্যতা আছে হ আমি চাই নতুন নেতৃত্ব আসুক
ম যাযাদি রিপোর্ট
  ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার গণভবনে যুক্তরাজ্যের প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্যানুষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন -ফোকাস বাংলা
আগামী বছর বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'এ নিয়ে সবাই আতঙ্কিত ও শঙ্কিত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশবাসীকে নিজ নিজ জমিতে চাষাবাদ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী একটা আশঙ্কা, আগামী বছর একটা মহাসংকটের বছর হবে। সেই জন্য আগ থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টা বেশি বিবেচনা করা দরকার।' বৃহস্পতিবার গণভবনে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তার সফরের বিস্তারিত তুলে ধরার পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমরা চাই সব দল আসুক। ইলেকশন করুক, কার কোথায় কতটুকু যোগ্যতা আছে দেখা যাবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কখনও ভোট চুরি করে ক্ষমতায় আসেনি। আসবেও না। আওয়ামী লীগ কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছে।' নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে চায়ের আমন্ত্রণ জানাবেন কি না- এই প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, 'করোনার সময়ে আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণ একটু কমই দেখা যাচ্ছে। করোনা হচ্ছে। সাংবাদিকদের ঢুকতে দিত না। তারপরও আমি আমার অফিসে একটু জোর করেই... কতদিন আর দূরে থাকা যায়। সেই জন্য। তবে করোনার কারণে এবার একটু চিন্তা করতে হবে। অনেকে আসতেও পারবে না। নির্বাচন হলে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত কে আসবে কে আসবে না। সেখানে আমরা তো আর চাপিয়ে দিতে পারি না। রাজনীতি করতে হলে দলগুলো নিজে সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা চাই সব দল অংশগ্রহণ করুক।' প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'গতবার যখন নির্বাচনে এলো, ৩০০ আসনে নমিনেশন দিয়ে হেরে গেল। তখন সব দোষ কার? আমাদের! জনগণের কাজ করে, জনগণের মন জয় করে, জনগণের ভোট নিয়েই কিন্তু বারবার ক্ষমতায় এসেছে। আওয়ামী লীগ কিন্তু কখনও কোনো ডিকটেটরের পকেট থেকে বের হয়ে আসেনি বা ইমার্জেন্সি দিয়ে কারও ক্ষমতা দখল করে ক্ষমতায় আসেনি। আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় এসেছে, ভোটের মাধ্যমেই এসেছে। নির্বাচনের মাধ্যমেই এসেছে।' তিনি বলেন, 'এ দেশে নির্বাচনের যতটুকু উন্নতি, যতটুকু সংস্কার, এটা কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং মহাজোট করে সবাইকে নিয়েই করে দিয়েছি। এরপর যদি কেউ না আসে সেখানে আমাদের কী করণীয়। হারার ভয়ে আসব না। আর একেবারে সবাইকে লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে হবে। জিতিয়ে দিতে হবে তবে আসব, এটা তো আর হয় না।' মিলিটারি ডিকটেটররা ওভাবেই করেছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, 'যাদের ওটাই অভ্যাস তারা তো জনগণের কাছে যেতে ভয় পায়। জনগণের সামনে ভোট চাইতে ভয় পায়, এটাই বাস্তবতা। অগ্নিসন্ত্রাস করে যারা মানুষ হত্যা করেছে তাদের কি মানুষ ভোট দেবে? কখনও দিতে পারে না। কারণ, সেই পোড়া ঘা তো এখনও সবার শুকায়নি। এখনও মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। গ্রেনেড হামলায় যারা আহত। যারা লুটপাট করে খেয়েছে। সেই কথাগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। তবে আমরা তো চাই সবাই নির্বাচনে আসুক। অন্তত আওয়ামী লীগ ভোট চুরি করে তো ক্ষমতায় আসে না, আসেও নাই। আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটেই ক্ষমতায় এসেছে।' আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, 'ডিসেম্বর মাসে আমরা দলের সম্মেলন করব। দল সিদ্ধান্ত নেবে আর পরবর্তী বছরই নির্বাচন। নির্বাচনের প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি। আর দলের প্রত্যেকটা বিষয়ে গঠনতন্ত্র মেনে আমরা সিদ্ধান্ত নিই। প্রত্যেকবার আমরা কী কী অঙ্গীকার করেছিলাম, কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি তার হিসাব করি। আগামীতে আমরা কী করব সেটাও সেভাবে তৈরি করি।' শেখ হাসিনা বলেন, 'যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই দেশের মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, গণহত্যা, লুটপাট করেছে পঁচাত্তরের পরে তারাই ক্ষমতায় এসেছে। তাদের সঙ্গে যারা হাত মেলাতে পারে আর জাতির পিতাকে হত্যা করতে পারে, সেই দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রাখা কত দুরূহ, কত কঠিন সেটা নিশ্চয় সবাই বুঝতে পারেন।' আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে সরকার গঠন করার পরে দেশে নানা ধরনের সংকট সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'জনগণের সমর্থন ছিল বলেই প্রতিটি সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি। যখন বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলছিল, বাংলাদেশে শুধু একটি ঘটনাই ঘটেছিল (হোলি আর্টিজান), তাও কিন্তু ১২ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করেছি। এরপর থেকে তেমন কোনো ঘটনা ঘটতে আমরা দেইনি।' শেখ হাসিনা বলেন, 'করোনাভাইরাস, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সরকার সক্ষম হয়েছে। আমাদের রিজার্ভ যথেষ্ট। যদি কোনো সংকট আসে তাহলে পাঁচ মাসের খাদ্য কেনার মতো সক্ষমতা আছে কি না সেটা দেখা হয়। আমাদের তা আছে। বাংলাদেশ কখনও ঋণখেলাপি ছিল না।' সংকট মোকাবিলায় জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমাদের কিছু কিছু পত্রিকা সারা জীবনই বাংলাদেশের খারাপ কথাটা বলতে পারলেই স্বস্তি পায়। এটা আমি যুগ যুগ ধরে দেখছি। এরকম এক ধরনের মানুষ থাকে। সবসময় নেতিবাচক চিন্তা অথবা পরশ্রীকাতরতায় ভোগে। মানুষ যতই ভালো করুক, তাদের চোখে ভালো হওয়া যাবে না। তবে সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, চিন্তাও করি না। জনগণের ওপর আমার আস্থা ও বিশ্বাস আছে। সরকারপ্রধান বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন, সংগ্রামের হুমকি, অনেক কিছু পাওয়া যাচ্ছে। সেটা তো তাদের কাজ। করতেই হবে। না হলে বিরোধী দল কী? বিরোধী দল যদি শক্তিশালী হতো, তাহলে অনেক কিছুই হতো।' দেশের অর্থনীতির জন্য সরকার স্বল্প, মধ্য ও দ্রম্নত মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেকোনো ক্ষেত্রে দেশের ঝুঁকি নেই, এটুকু আমি কথা দিতে পারি। রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি নিজেও আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব চাই। আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিলরও যদি বলে আমাকে চায় না, আমি কোনোদিনও থাকব না। যেদিন আমার অবর্তমানে আমাকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট করেছিল তখন থেকেই এই সত্যটা মেনে যাচ্ছি। এটা ঠিক দীর্ঘদিন হয়ে যাচ্ছে। আমি চাই নতুন নেতৃত্ব আসুক। নেতৃত্ব কাউন্সিলররা নির্বাচিত করেন। তাদের সিদ্ধান্তটাই চূড়ান্ত। আর আমার তো আসলে সময় হয়ে গেছে।' আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে এনেছেন উলেস্নখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আমরা গণতন্ত্র উদ্ধার করি। আমরা একটানা তিনবার ২০০৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় আছি, গণতান্ত্রিক ধারা বাংলাদেশে অব্যাহত আছে। এর বাইরে অনেক চড়াই-উতরাই, খুন-খারাবি, অগ্নিসংযোগ, অগ্নিসন্ত্রাস অনেক কিছু হয়েছে। এরপরেও আমরা ক্ষমতায় ছিলাম বলে আজ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। এখন বিদায় নেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত। সামগ্রিক বিবেচনায় জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সফল উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ সব সভায় অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। এসব সভায় উঠে আসে নারীর ক্ষমতায়ন ও রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়গুলো। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের অবহিত করা হয়েছে। এ সংকট সমাধানে পাঁচটি প্রস্তাবও তুলে ধরেছি। তিনি বলেন, এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সব সভায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে, যা বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান যেমন সুদৃঢ় করেছে, তেমনি বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করবে। ব্রিটেনের প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে প্রথমে যুক্তরাজ্য সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৭৭তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেন। যুক্তরাজ্য সফর প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ১৮ সেপ্টেম্বর আমি এবং আমার ছোটবোন শেখ রেহানা বার্কিংহাম প্যালেসে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সম্মানে যুক্তরাজ্যের রাজার এক সংবর্ধনায় যোগ দেই। ওয়েস্ট মিনস্টার প্যালেসের হলে শবাধারে সংরক্ষিত প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করি। পরে ল্যাঙ্কাস্টার হাউসে রাখা শোক বইতে বাংলায় লিখি, 'আমি বাংলাদেশের জনগণ, আমার পরিবার এবং আমার ছোটবোন শেখ রেহানার পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।' আর শোক বইয়ে রেহানা লেখেন 'তিনি আমাদের হৃদয়ের রানী এবং সব সময় থাকবেন।' ১৯ সেপ্টেম্বর ওয়েস্ট মিনস্টার অ্যাবেতে দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্যে যোগদানের বিষয়টি উলেস্নখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁসহ বিশ্বের কয়েকশ বিশিষ্ট ব্যক্তি শেষকৃত্যে যোগ দেন। এর আগে কনফেডারেশন অব ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রির (সিবিআই) প্রেসিডেন্ট চেলসির লর্ড করণ বিলিমোরিয়া, লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমার, মেরিলেবোনের লর্ড স্বরাজ পালের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি উলেস্নখ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে নিউ ইয়র্কে গিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মোট নয়টি উচ্চ পর্যায়ের সভা ও সাইড ইভেন্টে অংশ নেওয়ার কথা উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর আমি জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত ট্রান্সফর্মিং এডুকেশন সামিটে ভার্চুয়ালি অংশ নেই। ২০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনের সভাপতি সাবা করোসির আমন্ত্রণে বিশ্বের নারী নেতাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সভায় আমি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীসমাজের অবদানের কথা তুলে ধরি। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে নারীর সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারী নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করি। এছাড়া লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে বিশ্ব নেতাদের জানাই। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ, বতসোয়ানা, স্স্নোভাক প্রজাতন্ত্র এবং ইউএন হ্যাবিট্যাটের যৌথ আয়োজনে টেকসই আবাসন বিষয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের সাইড ইভেন্ট ও গেস্নাবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রম্নপের (জিসিআরজি) চ্যাম্পিয়ন হিসেবে একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় যোগ দেই। সেদিন সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমন্ত্রণে অভ্যর্থনা সভায় আমি অংশগ্রহণ করি। এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাই।' ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিতর্ক পর্বে বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ফলে সৃষ্ট খাদ্য ও জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির জন্য অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক পারস্পরিক সংহতি প্রদর্শন করার প্রতি গুরুত্বারোপ করি। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পাল্টা-নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে আলোচনার মাধ্যমে সংকট ও বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। চলমান সংকট নিরসনে জাতির পিতার শান্তি ও উন্নয়ন ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরি।' ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বরাবরের মতো এবারও সমর্থন জানানোর বিষয়টি উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বিশ্বশান্তি অর্জনের লক্ষ্যে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণ কার্যক্রমে বাংলাদেশের অঙ্গীকার এবং অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেছি। মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করি।' যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে মার্কিন ব্যবসায়ী নেতাদের আহ্বান জানানোর কথা উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, অটোমোবাইলস, ফার্মাসিউটিক্যালস, চিকিৎসা শিল্প, সামুদ্রিক শিল্প, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বেশ কয়েকটি হাই-টেক পার্কসহ বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল বিনিয়োগের জন্য মার্কিন ব্যবসায়ী নেতাদের আমন্ত্রণ জানাই।' রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ প্রস্তাব ২২ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে যোগ দেওয়ার কথা জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, গাম্বিয়া এবং বাংলাদেশ যৌথভাবে এই সাইড ইভেন্টের আয়োজন করে। এ সময় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো- ১. রোহিঙ্গা ইসু্যতে রাজনৈতিক সমর্থন ও মানবিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা। ২. আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, জাতীয় আদালত এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলায় সমর্থন দেওয়া। ৩. জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহত দমন-পীড়ন বন্ধে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। ৪. আসিয়ানের ৫ দফা মতৈক্যে মিয়ানমারের অঙ্গীকার এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করা। ৫. মিয়ানমারে জাতিসংঘসহ মানবিক সহায়তাকারীদের নির্বিঘ্নে প্রবেশ নিশ্চিত করা। শেখ হাসিনা বলেন, ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গারা যেন সম্মানের সঙ্গে ও নিরাপদে তাদের নিজ দেশে ফিরতে পারে সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। এবারের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন চলাকালে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হলো স্স্নোভেনিয়ার রাষ্ট্রপতি, ইকুয়েডরের রাষ্ট্রপতি, কসোভোর রাষ্ট্রপতি, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর, ইউএন হ্যাবিট্যাটের নির্বাহী পরিচালক, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালক, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক। এদিকে বৃহস্পতিবার গণভবনে 'জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল'-এর সভায় সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, 'সাইবার অপরাধ সব দেশেই মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। এটা একটা বিরাট সমস্যা। এখানে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা অথবা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের বিকাশ নানা ধরনের ঘটনা কিন্তু ঘটে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এ বিষয়ে আমাদের নিরাপত্তার দিকটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।' তিনি বলেন, 'বিশ্ব এখন একটি ''গেস্নাবাল ভিলেজে'' পরিণত হয়েছে এবং এখানে কেউ একা চলতে পারবে না। সবাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল, সেটা আমরা খুব ভালোভাবে টের পেয়েছি এক হলো করোনার সময়, দ্বিতীয় হলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময়। ওই যুদ্ধ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোকেও আর্থসামাজিকভাবে প্রভাবিত করেছে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদেরকে চলতে হচ্ছে খুব কঠিন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে। হয়তো ভবিষ্যতে আরও খারাপ সময় আসতে পারে। তবে আমাদের যেটা সব থেকে বেশি প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে নিরাপত্তা।' প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বাংলাদেশে যখন চারদিকে সন্ত্রাসের একটা প্রভাব শুরু হয়েছিল, আমরা কিন্তু খুব সফলভাবে সেটা দমন করে রাখতে পেরেছিলাম। আমরা সেটাকে জিরো টলারেন্স ঘোষণা দিয়ে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি। "কিন্তু তারপরও আজকে প্রযুক্তির প্রভাব এখন এত বেশি, আর এটা বিশ্বকে আরও কাছে নিয়ে আসে। এর যেমন ভালো দিক আছে, খারাপ দিকও আছে। সেই দিকে আমরা লক্ষ্য রেখেই এই ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলটা গঠন করা হয়েছে। আমাদের দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যারা কাজ করেন, তাদেরও এ বিষয় সম্পর্কে আরও জানা প্রয়োজন আছে এবং ভবিষ্যতে আমাদের কি করণীয়, আর এ ক্ষেত্রে কাদের সঙ্গে আমরা সমঝোতা করতে পারি, সম্পৃক্ত থাকতে পারি বা কাদের কাছ থেকে আমরা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারি বা কীভাবে আমরা তা কাজে লাগাতে পারি- সে বিষয়গুলোও আমাদের ভাবতে হবে।' দেশের মানুষের মাঝেও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সাইবার ক্রাইম করাটা যে কতটা ক্ষতিকর, একটা সমাজের জন্য, ব্যক্তিজীবন থেকে নিয়ে পরিবার, সমাজ এবং দেশ, রাষ্ট্র সবার জন্যই যে ক্ষতিকারক, সেই সম্পর্কে একটা সচেতনতা কীভাবে আমরা সৃষ্টি করতে পারি আমাদের মানুষের মধ্যে সেই দিকটাও আমাদের দেখতে হবে। পাশাপাশি 'বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞানের ওপর গবেষণা- এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর গবেষণা ছাড়া আসলে কোনো জাতি কিন্তু উন্নত হতে পারে না।'
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে