বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
walton1

সুরক্ষা আইন ঝুলে থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় সাক্ষীরা

নিরাপত্তা না থাকায় অনেক চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষীকে হাজির করতে পারছে না। আর আসামিরা প্রভাবশালী হলে তো কথাই নেই
গাফফার খান চৌধুরী
  ০১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
২০১১ সালের ৯ ফেব্রম্নয়ারি আইন কমিশন 'সাক্ষী সুরক্ষা' আইন প্রণয়নের জন্য সরকারের কাছে সাক্ষীর নিরাপত্তাসহ ১৯টি সুপারিশ পাঠিয়েছিল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রায় একযুগ পার হতে চললেও তা আজও আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নে সরকারকে তাগিদ দেন হাইকোর্ট। স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলেও এখনো আইন প্রণয়নের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। প্রায় একযুগ পার হলেও সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর না হওয়ায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বিভিন্ন মামলার সাক্ষীরা। প্রায়ই সাক্ষীদের ওপর হামলা, হুমকি-ধমকি এবং এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে মামলায় সাক্ষী সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে অনেক মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষই। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৮৭২ সালে অর্থাৎ দেড়শ' বছর আগে তৈরি হয়েছে সাক্ষ্য আইন। অদ্যাবধি সাক্ষ্য আইন সংস্কার করা হয়নি। সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ার কারণে বিচারকাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যা আদালতে মামলাজট সৃষ্টি করছে। নানাভাবে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। সাক্ষ্য আইন মামলার বিচারকাজে এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ার কারণে প্রায়ই সাক্ষীদের ওপর মারাত্মক হামলার ঘটনা ঘটছে। যার মধ্যে উলেস্নখযোগ্য ছিল বহুল আলোচিত পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎ দাশ হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী রিকশাচালক রিপন সরদার। তিনি ওই হত্যা মামলায় সাক্ষী দিতে ২০১৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় আসেন। ঢাকার সদরঘাট পৌঁছার পর তার ওপর মারাত্মক হামলা হয়। তাকে বেধড়ক মারপিট করার ঘটনা ঘটে। আঘাতের যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে পড়লে হামলাকারীরা সাক্ষী মারা গেছেন ভেবে ফেলে পালিয়ে যায়। আলোচিত হত্যা মামলার সাক্ষীদের ওপর হামলা হয়। আর সাধারণ মামলার বা কম আলোচিত মামলার সাক্ষীদের ওপর হামলা, হত্যাচেষ্টা ও হুমকি-ধমকির তো কথাই নেই। এমনকি যুদ্ধাপরাধ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের একাধিক সাক্ষীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুদ্ধাপরাধ মামলায় গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যলালের ৪২টি মামলার রায়ে ৭০ জনের মৃতু্যদন্ড ও ১০৩ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন আদালত। রায়কৃত মামলায় সাক্ষী ছিলেন ৮৫৩ জন। এর মধ্যে নারী সাক্ষী ১৫৩ জন ও সরাসরি ভুক্তভোগী ২২০ জন। তাদের নিরাপত্তায়ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন নেই। দেশে সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় পুরনো সাক্ষ্য আইন দিয়ে মামলার বিচারকাজ চলছে। আইনজীবীরা জানান, সাক্ষীরা হচ্ছেন মামলার প্রাণ। বিশেষ করে প্রত্যক্ষদর্শী হলে তো কথাই নেই। সাক্ষীর সাক্ষ্য ও অন্য প্রয়োজনীয় আলামত মামলায় আনীত অভিযোগ সত্য না মিথ্যা তা প্রমাণ করা খুবই সহজ হয়। রাষ্ট্রের উচিত দায়িত্ব সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য নানা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থা নেই। সাক্ষীদের জন্য অবশ্যই আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন। আইনজীবীরা আরও জানান, আসামিদের জামিন থেকে বেরিয়ে সাক্ষীদের ওপর হামলা, চড়াও হওয়া, মারধর করা, কৌশলে আর্থিক ও সামাজিকসহ নানাভাবে হেনস্তা করার রেকর্ড সবচেয়ে বেশি। নিরাপত্তা না থাকায় অনেক চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষীকে হাজির করতে পারছে না। আর আসামিরা প্রভাবশালী হলে তো কথাই নেই। সাক্ষীদের আর খুঁজেও পাওয়া যায় না। যদিও এটিই যৌক্তিক। কারণ সাক্ষী যে সাক্ষী দিয়ে বাড়ি যেতে পারবেন, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। যে কারণে ন্যায়বিচার লংঘিত হয়। অনায়াসে আইনের ফাঁক-ফোকর গলে বেরিয়ে যায় দাগী অপরাধীরাও। সাক্ষীদের অনুপস্থিতিতে অনেক ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। যে কারণে অনেক সময়ই মামলার প্রকৃত আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। মামলার কার্যক্রমও বিলম্বিত হয়। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাইফুদ্দীন খালেদ বলেন, বিচারকার্যকে ত্বরান্বিত ও প্রসারিত করার উদ্দেশ্যই সাক্ষ্য আইনের সৃষ্টি। গণতান্ত্রিক দেশে বিচার বিভাগের দায়িত্ব যদি ঠিকভাবে পালন করতে হয়, তাহলে ভিকটিম ও সাক্ষী সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। সাক্ষী সুরক্ষা আইন না হওয়ার কারণে বহু মামলায় সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। হামলা, হুমকি-ধমকি ছাড়াও সাক্ষীর জীবননাশের ঘটনাও ঘটেছে। সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে