রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯

সোনাঝরা গৌরবদীপ্ত মাস ডিসেম্বর শুরু

যাযাদি ডেস্ক
  ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
শুরু হলো বাঙালির বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী বাঙালির হৃদয়ে বৈজয়ন্তী উড়িয়ে এসেছিল সোনাঝরা গৌরবের এই মাস। বাংলাদেশের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ঘটনা হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির হাজার বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বপ্নসাধ পূরণ হয় এই মাসেই। বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় গৌরবদীপ্ত চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বর। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতি পায় স্বাধীনতার স্বাদ। বাংলার আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার লাল সূর্য। শত্রম্নমুক্ত হয় বাংলার মাটি। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ডাক দিয়েছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' ঐতিহাসিক সেই ভাষণে উদ্দীপ্ত বাঙালি জাতি সেদিন দৃঢ় শপথ নিয়েছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার পরিচালনা করে মুক্তিযুদ্ধ। বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিবেশী ভারত এসে দাঁড়িয়েছিল মুক্তিকামী বাঙালির পাশে। এক সাগর রক্ত, ৩০ লাখ প্রাণ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময় বীর বাঙালি গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরে রচিত হয়েছিল অনন্য এক গাঁথা। পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করে অর্জিত এই বিজয় আনন্দ ও গৌরবের। একই সঙ্গে প্রিয়জন হারানো শোকের। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ নিরস্ত্র নিরপরাধ মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে জাতি হারিয়েছে তাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদেরও। ১৪ ডিসেম্বর পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা সেসব দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র জুগিয়েছিল মুক্তির লড়াইয়ের অনিঃশেষ প্রেরণা। সে সময়ের গানে গানে বিধৃত (ধারণ করা) আছে লাঞ্ছিত-নিপীড়িত, মুক্তিপাগল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণের উচ্ছ্বাস, ত্যাগ, লড়াই ও মুক্তির মন্ত্র। ২৫ মার্চের নির্মম নৃশংস হত্যাকান্ডের পর আপামর বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিল শোষণের বিরুদ্ধে। তবে এই মাসের প্রতিটি দিনই ছিল ঘটনাবহুল। একাত্তর সালের ডিসেম্বরের শুরু থেকেই বাঙালি বীর সন্তানদের সঙ্গে যুদ্ধে একের পর এক পরাজিত হতে থাকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ আর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর জল, স্থল ও আকাশপথে সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ক্রমাগত পরাজিত হতে থাকে তারা। হয়ে পড়ে দিশেহারা। ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভেতর গেরিলা আক্রমণ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশে সেনাবাহিনী আরও ভয়াবহভাবে নিরীহ জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পারে জিঞ্জিরায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে এক দিনেই হত্যা করা হয় ৮৭ জনকে। বাঙালির জন্মভূমি শত্রম্নমুক্ত করার লড়াইকে আড়ালে রাখতে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে বেতারে ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। কিন্তু সেদিন তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই বাঙালিকে বিজয় অর্জন থেকে পিছিয়ে দিতে পারেনি। মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করতে তারা মরণপণ লড়াই চালিয়ে যান। বিজয়ের মাসের প্রথম দিন আজ ১ ডিসেম্বর পালিত হবে মুক্তিযোদ্ধা দিবস। রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনের সর্বত্র মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা, অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করার দাবিতে মুক্তিযোদ্ধা দিবস উত্থাপন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি দেশব্যাপী দিবসটি পালন করবে। ১৯৭১ সালের এই দিনে সিলেটের কানাইঘাটে লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর হাতে ৩০ পাকসেনা ও রাজাকার নিহত হয়। জুড়ি ও বড়লেখা এলাকা থেকে পাকবাহিনী কামান সরিয়ে ফেলে আর মুক্তিবাহিনীর হাতে পাকসেনারা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়ে কুলাউড়ায় পালিয়ে যায়। এদিন মুক্তিবাহিনী কুষ্টিয়ার দর্শনা ও সিলেটের শমসেরনগর আক্রমণ করে। কুষ্টিয়ার কাছে মুন্সীগঞ্জ ও আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের মধ্যে মুক্তিসেনারা মাইন বিস্ফোরণের মধ্যে পাক সৈন্যবাহী ট্রেন বিধ্বস্ত করে। এতে বহু পাকসেনা হতাহত হয়। সিলেটের ছাতক শহরে মুক্তিবাহিনী ও পাকসেনাদের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ৬৫ জন রাজাকার নিহত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা সুনামগঞ্জ মৌলভীবাজার মুক্ত করে সামনে এগিয়ে যায়। কুমিলস্নার কসবা রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর হাতে ৬০ জনের বেশি পাকসেনা নিহত হয়। সিলেটের শমসেরনগর ও কুষ্টিয়ার দর্শনা দখল লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে। এদিন রাতে কর্নেল শফিউলস্নাহ, দ্বিতীয় বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার মেজর মঈন, ১১ বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার মেজর নাসিমের নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেরানী, সিঙ্গারাইল, গৈরালসানী, রাজাপুর ও আজমপুর এলাকা শত্রম্নমুক্ত করে। যুদ্ধে মুজিব বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন খাঁ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) শহীদ হন, আর ২৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পাকিস্তানি হানাদাররা বীর বাঙালির কাছে আত্মসমর্পণের পথ খুঁজতে থাকে। বাংলাদেশ দ্রম্নত মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে সেই রেসকোর্স ময়দানেই পাকিস্তানি বাহিনী নতিস্বীকারে বাধ্য হয়। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পথ বেয়ে আসে পরম কাঙ্ক্ষিত বিজয়। ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময় অর্জিত স্বাধীনতার সাক্ষর এবারের বিজয়ের মাস বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হবে। মাসব্যাপী উৎসাহ-উদ্দীপনায় এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিজয়ের ৫১ বছর উদযাপন করবেন দেশের মানুষ। ১ ডিসেম্বরকে 'মুক্তিযোদ্ধা দিবস' ঘোষণার দাবি বাঙালির মহান বিজয়ের মাসের প্রথম দিন ১ ডিসেম্বরকে 'মুক্তিযোদ্ধা দিবস' ঘোষণার দাবি জানিয়েছে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ' ৭১। ফোরামের কার্যনির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল আলম ও মহাসচিব হারুন হাবীব এক বিবৃতিতে এই দাবি জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, সেক্টর কমান্ডারস্‌ ফোরামসহ অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বহু বছর ধরে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করে আসছে। জাতীয় সংসদের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে দিনটিকে 'মুক্তিযোদ্ধা দিবস' হিসেবে ঘোষণার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জোর সুপারিশ করেছে। কিন্তু এখনো এ-সংক্রান্ত কোনো সরকারি ঘোষণা আসেনি। তারা মনে করেন, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতির উদ্দেশে একটি দিবস পালনের যৌক্তিকতা রয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে