মঙ্গলবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৩, ১৯ আশ্বিন ১৪৩০
walton

নাগরপুরে সংসদ সদস্য ও আ'লীগ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে

স্টাফ রিপোর্টার, টাঙ্গাইল ও নাগরপুর প্রতিনিধি
  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০০:০০

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনের সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটু ও নাগরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটুর বিরুদ্ধে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা একাট্টা হয়েছেন। নাগরপুরের মাঠ-ঘাট, চা-স্টল, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ আওয়ামী রাজনৈতিক অঙ্গনের সবার মুখে মুখে 'নৌকার বিকল্প নাই/নাগরপুরের সন্তান চাই' স্স্নোগানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, নানা বিষয় নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চলছিল। কিন্তু নাগরপুর কলেজ মাঠে রোববার বিকালে জনসমাবেশের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটু ও উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটু নাগরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ব্যানারে ওই জনসমাবেশের আয়োজন করেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী ডক্টর মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং জেলার পাঁচজন দলীয় সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে ওই জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ওই দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকিরুল ইসলাম উইলিয়াম সমাবেশে সভাপতিত্ব করেননি। সাধারণ সম্পাদক কুদরত আলী সভা পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেননি। ওই জনসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের ৯ নম্বর সহ-সভাপতি আনিছুর রহমান আনিছ। সঞ্চালনা করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের ৩ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম দুলাল। ১ থেকে ৮ নম্বর সহ-সভাপতি এবং দু'জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও সমাবেশে অনুপস্থিত ছিলেন। তারা দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী।

সরেজমিন আওয়ামী লীগের স্থানীয় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানান, টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনের

সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটুর সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতাদের দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে। জনসমাবেশের মধ্য দিয়ে সেই দ্বন্দ্ব এখন 'তপ্ত কড়াইয়ে ঘি' ঢালার অবস্থা হয়েছে। সেই সঙ্গে এ আসনের দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি তারেক শামস খান হিমু ও ইনসাফ আলী ওসমানী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকিরুল ইসলাম উইলিয়ামের সঙ্গেও দ্বন্দ্ব রয়েছে। তারা সবাই একাট্টা হয়ে সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাদের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। এর মধ্যে আহসানুল ইসলাম টিটুর পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে। তিনি মাতুলালয়ের জন্মসূত্রে নাগরপুরের গয়হাটার বাসিন্দা। অন্যরা সবাই উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। এজন্যই উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা তৃণমূলে এমপি পদে 'নৌকার বিকল্প নাই/নাগরপুরের সন্তান চাই' স্স্নোগানটি ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন।

দুই পক্ষের ওই দ্বন্দ্বের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় দলীয় কর্মসূচি সংসদ সদস্য তার নিজের অনুসারীদের নিয়ে পালন করেন। অন্যরা উপজেলা আওয়ামী লীগের ব্যানারে আলাদাভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নাগরপুরে জনসমাবেশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সমাবেশ করার জন্য প্রস্তাব দেন। তারা এই প্রস্তাবের কথা আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী ডক্টর মো. আব্দুর রাজ্জাক ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের জানান। উপজেলা আওয়ামী লীগের ২ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নাজমুল হক তপন, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক বি এম এম জহুরুল আমিন, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক দিলদার আহাম্মেদ, দপ্তর সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহালম মিয়া, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক খালিদ হোসেন জানান, ওই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে স্থানীয় সংসদ সদস্য কৃষিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে ১৭ সেপ্টেম্বর সমাবেশের তারিখ নির্ধারণ করেন। তিনি কারও সঙ্গে সমন্বয় না করে একাই সমাবেশের প্রচারণা শুরু করেন। তখন অন্য সবাই এ সমাবেশ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেন।

সংসদ সদস্য ১৭ সেপ্টেম্বরের সমাবেশ সফল করার জন্য গত ৯ সেপ্টেম্বর নাগরপুর উপজেলা পরিষদের হলরুমে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এমপি ঘরানার স্বল্প সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায়ও উপজেলা আওয়ামী লীগের ৯ নম্বর সহ-সভাপতি সভাপতিত্ব করেন। তারপরও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ধারণা করেছিলেন- প্রস্তুতি সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সংসদ সদস্য উদ্ভূত পরিস্থিতির সুষ্ঠু সমাধান করবেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও গুঞ্জন উঠেছিল- সমাবেশকে কেন্দ্র করে নাগরপুরের উপজেলা আওয়ামী লীগ, সব মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা ও সংসদ সদস্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের অবসান হবে। সবাই একতাবদ্ধ হয়ে জনসমাবেশে অংশ নেবেন। কিন্তু তা না হয়ে সমাবেশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসে আরও তীব্র হলো।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুদরত আলী জানান, 'সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে রোববার যে সমাবেশ হয়েছে তার সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নেই। তিনি কারও সঙ্গে সমন্বয় করেননি। এমপি হওয়ার পর থেকে তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের এড়িয়ে চলতে থাকেন। তিনি বিএনপি ও জামায়াতের লোকদের বগলদাবা করে রাজনীতি করছেন। কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতাদের ম্যানেজ করে তিনি এই সমাবেশ করেছেন।' উপজেলা আওয়ামী লীগ পরে সমাবেশ করবেন বলেও তিনি জানান।

এ প্রসঙ্গে আহসানুল ইসলাম টিটুর অনুসারী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাহিদুল ইসলাম খান অপু জানান, রোববারের সমাবেশ যারা বয়কট করেছেন- তারা দলীয় শৃঙ্খলা মানেননি। সংসদ সদস্য সবাইকে নিয়ে রাজনীতি করতে চান। কিন্তু যারা সমাবেশে আসেননি, তারা কৃষিমন্ত্রী ডক্টর মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং জেলা আওয়ামী লীগকে অবজ্ঞা করেছেন।'

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকিরুল ইসলাম উইলিয়াম জানান, 'সংসদ সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো প্রকার সমন্বয় না করের সমাবেশ আহ্বান করেছেন। তাই তিনিসহ উপজেলা আওয়ামী লীগসহ অন্যান্যরা উপস্থিত হন নাই।'

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি তারেক শামস খান হিমু জানান, 'দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে আওয়ামী লীগ আর সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড চালাবে সংসদ সদস্য। কিন্তু আহসানুল ইসলাম টিটু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমন্বয় না করে ইচ্ছে মতো কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগকে পাশ কাটিয়ে সব কর্মকান্ড চালাচ্ছেন। রোববারের জনসমাবেশটিও উপজেলা আওয়ামী লীগকে পাশ কাটিয়ে আয়োজন করায় কৃষিমন্ত্রী উপস্থিত থাকার পরও তিনি এবং তারা সমাবেশ মঞ্চে বসতে পারেননি।'

টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনের সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটু জানান, 'তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সহযোগিতা চেয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের দেখভাল করে শরিক হতে বলেছেন। কিন্তু তিনি আশানুরূপ সাড়া পাননি।'

আহসানুল ইসলাম টিটুর দাবি, 'তিনি নাগরপুর-দেলদুয়ারের ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। অনেকগুলো উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। তাছাড়া উন্নয়ন কাজে দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেখান থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি অনৈতিক সুবিধার ঘোর বিরোধী হওয়ায় কিছুটা মতবিরোধ হয়েছে। তবে এখনো তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে চান।'

নাগরপুর সরকারি কলেজ মাঠে রোববার বিকালের সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী ডক্টর মো. আব্দুর রাজ্জাক এমপি।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম (ভিপি জোয়াহের) এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. ছানোয়ার হোসেন এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান ছোট মনির এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক খান আহমেদ শুভ এমপি, সদস্য মোহাম্মদ হাসান ইমান খান সোহেল হাজারি এমপি, সদস্য আতাউর রহমান খান এমপি, সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটু এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খন্দকার আশরাফুজ্জামান স্মৃতি, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জামিলুর রহমান, কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ মামুন, দেলদুয়ার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার ফজলুল হক প্রমুখ।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
shwapno

উপরে