বজ্রঝড়ে রেকর্ড ভাঙার শঙ্কা!

বজ্রপাত-শিলাবৃষ্টি দিয়ে শুরু কালবৈশাখী

প্রকাশ | ২৫ মার্চ ২০২৪, ০০:০০

আলতাব হোসেন


বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু প্রবেশের আগে কালবৈশাখী শুরু হয়। সাধারণত মার্চের শেষ থেকে শুরু করে মে মাস পর্যন্ত চলে এ বজ্রঝড়। জলবায়ুর প্রভাবে এবার আগ বাড়িয়ে এসেছে কালবৈশাখী। শনিবার সন্ধ্যা থেকে শেষ রাত পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ এলাকায় কালবৈশাখীর সঙ্গে বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, ঠাকুরগাঁও, যশোর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় বেশি বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। গাজীপুর ও যশোরে ৩০০ গ্রাম ওজনের শিলাবৃষ্টি হয়েছে। কয়েক স্থানে বজ্রপাতের খবরও পাওয়া গেছে। শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। এর আগে বুধবার রাতে বছরের প্রথম আগাম কালবৈশাখী আঘাত হানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এবার কালবৈশাখী ও বজ্রপাত আগের সব রেকর্ড ভাঙার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে, চৈত্রের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি দেখল রাজধানীসহ দেশের বেশিরভাগ এলাকার মানুষ। শনিবার রাত ২টার দিকে ঢাকায় ঘন ঘন বজ্রপাতের সঙ্গে শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। শিলাবৃষ্টিতে টিনের ঘরের চাল, সড়কে গাড়ির গøাস ভেঙে গেছে। এ ছাড়া একাধিক স্থানে গাছ ও সড়কের ওপর তোরণ ভেঙে পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। আজও (সোমবার) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়-শিলাবৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
সাধারণত কালবৈশাখীর সময় বেশি বজ্রপাত ঘটে। বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান ও বায়ুদূষণ। একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে ভারত মহাসাগর। উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল। রয়েছে হিমালয়। সাধারণত বর্ষা আসার আগে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এ সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায়। সাগর থেকে আসে গরম বাতাস, আর      

হিমালয় থেকে আসে ঠান্ডা বাতাস। একসঙ্গে দুই রকমের বাতাসের সংমিশ্রণে বজ্রমেঘের আবহ তৈরি হয়। এ রকম একটি মেঘের সঙ্গে আরেকটি মেঘের ঘর্ষণে বজ্রপাত ঘটে। 
বছরের এ সময়টায় দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বজ্রপাতের আশঙ্কা ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি, অধিক ধাতব পদার্থের ব্যবহার, মোবাইল ফোন ব্যবহারের আধিক্য এবং এর টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি, বনভ‚মি ও উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, জলাভ‚মি ভরাট ও নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ৯৮ শতাংশই ঘটেছে বাইরে খোলা আকাশের নিচে থাকার কারণে। 
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মার্চ মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ছাড়াও মাসের শেষদিকে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া তীব্র কালবৈশাখী ঝড় হওয়ার আভাস রয়েছে। দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে একাধিক মাঝারি বা তীব্র কালবৈশাখী ঝড় হতে পারে। দেশের অন্য অঞ্চলে দু-তিনদিন বজ্র ও শিলাবৃষ্টিসহ হালকা বা মাঝারি ধরনের কালবৈশাখী হতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, খনার বচনে আছে- ‘আমের বছরে বান-কাঁঠালের বছরে ধান’। এবার সারাদেশে আমের ফুল বেশি দেখা যাচ্ছে। তাই অনেকে আশঙ্কা করছেন এবার বেশিমাত্রায় কালবৈশাখী, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ তারিকুল নেওয়াজ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বেশি বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ ঝড় গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে হয় গভীর সমুদ্রে নিম্নচাপসহ নানা কারণে। এসব ঝড়ের সময় বিদ্যুৎ নাও চমকাতে পারে বা বজ্রপাত নাও হতে পারে। কিন্তু কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকায় এবং বজ্রপাত হয়। এ ধরনের ঝড়ে সাইক্লোন বা টর্নেডোর মতো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি না হলেও যে এলাকায় এটি হয় সেখানে গাছপালা মানুষের বড় ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই কালবৈশাখী হয়। এর স্থায়িত্বকাল হয় অল্প। একটি কালবৈশাখী ঝড় তৈরি হয়ে পূর্ণতা লাভের পর ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত এর তীব্রতা থাকে। পরে তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত শেষ বিকালে এবং সন্ধ্যার দিকে কালবৈশাখী হয়।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. অধ্যাপক সামসুল আলম বলেন, বজ্রপাতের সঙ্গে কালবৈশাখীর সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বাতাসে সিসার পরিমাণ বাড়া, অধিক ধাতব পদার্থের ব্যবহার, মোবাইল ফোন ব্যবহার ও মোবাইল ফোনের টাওয়ারের সংখ্যার আধিক্য, বনভূমি বা গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, জলাভ‚মি ভরাট ও নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ছে। 
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ভারতীয় আবহাওয়া অফিস ও জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্য বলছে, বন্যা, খরা কালবৈশাখী ও ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী। এর মধ্যে নতুন দুর্যোগ বজ্রপাত ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। বজ্রপাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বাংলাদেশে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বজ্রপাতের ডেড জোন এখন বাংলাদেশ। 
বাংলাদেশে বর্ষা আসার আগমুহূর্তে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এতে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা আর্দ্র বায়ু আর উত্তরে হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে কালবৈশাখী বয়ে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ঝড়ের সময় বেশি বজ্রপাত ঘটে। বজ্রপাতে মৃত্যুর ৯৩ শতাংশই ঘটে গ্রামাঞ্চলে। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশের হয় মৃত্যু উন্মুক্ত স্থানে। এ ছাড়া বাড়ি ফেরার পথে ৬ শতাংশ এবং গোসল করা ও মাছ ধরার সময় ৮ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। যা বিশ্বে বজ্রপাতের ডেড জোন হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে দেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়- দেশের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর। এসব জেলাকে বজ্রপাতের জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বজ্রপাত দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বে বছরে বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যাচ্ছে, অর্ধেকই বাংলাদেশে। 
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে। বজ্রপাতে মৃত্যুও চেয়ে দশগুণ বেশি মানুষ আহত হচ্ছেন। বজ্রপাতে আহতদের চিকিৎসা বা ওষুধ নেই দেশের হাসপাতালগুলোতে। আহতদের পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়। বজ্রপাতকে আবহাওয়া সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে গড়ে বছরে আড়াই হাজার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে বেশি মৃত্যুর জন্য সচেতনতার অভাবকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ নেচার কনজার্ভেশন ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. এস.এম. মনজুরুল হান্নান খান বলেন, বজ্র্রপাত থেকে রক্ষা পেতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বজ্রপাত সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট স্থায়ী হয়। এ সময় ঘরে বা বাসাবাড়িতে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। রাবারের জুতা পরা, বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, মাঠ অথবা উঁচু স্থানে না থাকা। এ সময় ধান ক্ষতে বা খোলা মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি পায়ের আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙ্গুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকা। বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে যতদ্রæত গাছপালা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার বা ধাতব খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে নদী, পুকুর ডোবা বা জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতর অবস্থান করলে, গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ ঘটাবেন না, সম্ভব হলে গাড়িটি নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি ও বারান্দায় থাকা যাবে না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতরে বৈদু্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করা যাবে না। এ সময় শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন এবং নিজেরাও বিরত থাকুন। বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে যাওয়া যাবে না, তবে এ সময় সমুদ্র বা নদীতে থাকলে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করতে হবে। বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। খোলা স্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালে বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যাওয়া। কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে থাকা ভালো। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হাটার দূরত্ব বেঁধে ইটের অস্থায়ী ঘর তৈরি করতে হবে। যেখানে কৃষক ও মাঠে কাজ করা মানুষ কিছু সময় সুরক্ষার জন্য দাঁড়াতে পারেন। বজ্রঝড় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের বেশি সময় থাকে না। মাঠে যারা কাজ করেন তারা যদি ওই সময়টা পাকা ঘরে আশ্রয় নিতে পারেন তাহলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হবে। দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ৯৮ শতাংশই ঘটেছে বাইরে থাকার কারণে। সচেতনতাই পারে এ মৃত্যু ঠেকাতে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানায়, বজ্রপাত ঠেকাতে ১০ কোটি তাল গাছ লাগানোর প্রকল্প নিয়েছিল সরকার। এর মধ্যে ১০ বছরে ৩৮ লাখ তালগাছ লাগানোর পর দেখা যায়, দেখভাল ও যতেœর অভাবে তালগাছ মারা যাচ্ছে। আর একটি তালগাছ বড় হতে ৩০ থেকে ৪০ বছর সময় লাগে। তাই এ প্রকল্প বাতিল করে দিয়েছে সরকার।