logo
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৭ আশ্বিন ১৪২৭

  যাযাদি রিপোর্ট   ২১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

সিপিবি সমাবেশে বোমায় ১০ আসামির মৃতু্যদন্ড

সিপিবি সমাবেশে বোমায় ১০ আসামির মৃতু্যদন্ড
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সোমবার সিপিবির সমাবেশে হামলা মামলার রায় ঘোষণার পর এক আসামিকে কারাগারে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ -যাযাদি
প্রায় দুই দশক আগে ঢাকার পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার শেষে হরকাতুল জিহাদের (হুজি) ১০ জঙ্গির ফাঁসির রায় এসেছে।

ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম সোমবার এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলার জীবিত ১২ আসামির মধ্যে দুইজনকে খালাস দেন তিনি।

২০০১ সালে যে দিনটিতে বোমা হামলা চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছিল, ১৯ বছর পর সেই একই তারিখে রায় দিল আদালত।

সিপিবিকে নিশ্চিহ্ন করতে জঙ্গিরা ওই হামলা চালিয়েছিল। পর্যবেক্ষণ দিয়ে বিচারক তার রায়ে বলেন, 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার জন্য হরকাতুল জিহাদের এই জঙ্গিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত বলে এই আদালত মনে করে।'

হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানও ছিলেন এ মামলায় অভিযুক্ত আসামি। অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এ মামলার অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

মৃতু্যদন্ডপ্রাপ্ত ১০ আসামির মধ্যে মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ, আরিফ হাসান সুমন, সাব্বির আহমেদ, শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ রায়ের সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

আর জাহাঙ্গীর আলম বদর, মহিবুল মুত্তাকিন, আমিনুল মুরসালিন, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান ও নুর ইসলাম পলাতক।

এই ১০ আসামিকে সর্বোচ্চ সাজার পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে রায়ে। এ ছাড়া পলাতক দুই আসামি মো. মশিউর রহমান ও রফিকুল আলম মিরাজকে খালাস দিয়েছেন বিচারক।

এ রায়ের জন্য সোমবার সকাল থেকেই আদালতপাড়ায় নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তা। সবাইকে তলস্নাশি করে তারপর আদালতে ঢুকতে দেওয়া হয়।

১৯ বছরের অপেক্ষা

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবির লাল পতাকা সমাবেশে এই বোমা হামলা হয়েছিল। তাতে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা হিমাংশু মন্ডল, রূপসা উপজেলার সিপিবি নেতা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা আব্দুল মজিদ, ঢাকার ডেমরার লতিফ বাওয়ানি জুট মিলের শ্রমিক নেতা আবুল হাসেম ও মাদারীপুরের কর্মী মোক্তার হোসেন ঘটনাস্থলেই মারা যান।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ দিন পর মারা যান খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিপ্রদাস রায়। হামলায় আহত হয় শতাধিক।

ওই ঘটনায় সিপিবির তৎকালীন সভাপতি মনজুরুল আহসান খান মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে দুই বছর পর ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোমিন হোসেন। তিনি আদালতকে বলেন, তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সিপিবির সমাবেশে হামলার পর ওই বছরের ১৪ এপ্রিল রমনায় বর্ষবরণের উৎসবে একই ধরনের বোমা হামলা হয়। কিন্তু তখন জঙ্গিদের সন্দেহ করা হলেও তাদের তৎপরতার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর ছিল কম।

এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে একযোগে জঙ্গি হামলার সঙ্গে যোগসূত্র পেয়ে ২০০৫ সালে সিপিবির সমাবেশে হামলার মামলাটির তদন্ত পুনরায় শুরু হয় আদালতের আদেশে।

সাত তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক মৃণাল কান্তি সাহা ১৩ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন। ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সালাউদ্দিন হাওলাদার বলেন, রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১০৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৮ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। তবে আসামিপক্ষে কেউ সাফাই সাক্ষ্য দেননি।

গত বছরের ১ ডিসেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে এ মামলার রায়ের জন্য ২০ জানুয়ারি দিন ঠিক করে দেন বিচারক।

পর্যবেক্ষণ

১০৪ পৃষ্ঠার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, আসামিরা হুজির সদস্য এবং তাদের ধারণা, সিপিবির লোকেরা 'কাফের, বিধর্মী, নাস্তিক, ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী নয়'। ...সে কারণে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে 'নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে' তারা ওই বোমা হামলা ঘটায়।

বিচারক বলেন, 'ইসলাম শান্তির ধর্ম। কোনো জঙ্গি সংগঠনকে বা কোনো দলকে ধর্মের নামে নিরীহ ও নির্দোষ মানুষকে হত্যা করার অধিকার আলস্নাহ দেননি।'

কোরানের সুরা আল মায়েদাহর ৩২ নম্বর আয়াত থেকে উদ্ধৃত করে বিচারক বলেন, 'নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কোনো কারণে যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল, সে যেন দুনিয়ার সমস্ত মানুষকে হত্যা করল।'

যে কারণে দুজন খালাস

বিচারক তার রায়ে বলেন, আসামি আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আব্দুর রাজ্জাক ও মো. নূর ইসলাম সিপিবির সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে ঘটনাস্থলেই ২৩ জন ব্যক্তি গুরুতর আহত হন, যাদের অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন। আহত সবারই সেদিন নিহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ওই দুই আসামির বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০৭/৩২৪/৩২৬/৩৪ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।

এছাড়া সাক্ষ্য প্রমাণ পর্যালোচনায় আসামি মো. নূর ইসলাম ও আরিফ হোসেন সুমনের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০২/৩০৭/৩২৪/৩২৬/৩৪ ধারার এবং মুফতি হান্নান, মাওলানা সাব্বির আহম্মেদ, মাওলানা শওকত ওসমান, আরিফ হাসান সুমন, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর, নূর ইসলাম, মহিবুল মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন এর বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০২ ও ১২০ বি ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০২/১২০বি ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সিলেটের এক মামলায় ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল তার মৃতু্যদন্ড কার্যকর হয়েছে। তাই ২০১৭ সালের ১৩ জুন তাকে এ মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বিচারক বলেন, পলাতক আসামি মশিউর রহমান ও রফিকুল আলম মিরাজের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০২/১২০বি/৩৪ ধারার অভিযোগ আনা হলেও তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। আসামি মুফতি মঈন উদ্দিন ১৬৪ ধারায় যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, সেখানেও মশিউর বা রফিকুলের নাম আসেনি।

'প্রসিকিউশনের পক্ষ উপস্থাপিত কোনো সাক্ষীও এই আসামিদের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। তদন্ত কর্মকর্তারাও তাদের সম্পৃক্ত করে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি। যেহেতু আসামিদ্বয়ের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না, সেহেতু তাদের খালাস দেওয়া হলো।'

বাকি দশ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিচারক বলেন, 'হাই কোর্ট বিভাগ কর্তৃক মৃতু্যদন্ড বহাল রাখা সাপেক্ষে মৃতু্য না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের প্রত্যেককে গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হোক। সেই মর্মে আসামিদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ইসু্য করা হোক।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে