সাক্ষাৎকার

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদা পূরণে বিশ্বমানের হচ্ছে নৌ-ব্যবস্থাপনা -খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী

অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন আর সময়োপযোগী করে তোলা এবং বৈশ্বিক নৌপরিবহণকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নতি করার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। নৌপথের সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন নৌযান চলাচলকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দক্ষ ও সাশ্রয়ী নৌপরিবহণ সেবা দিয়ে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছে। বিষয়টি নিয়ে যায়যায়দিনের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী একান্তে কথা বলেছেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদা পূরণে বিশ্বমানের হচ্ছে নৌ-ব্যবস্থাপনা -খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী

যায়যায়দিন : ঢাকার চারপাশের নদী দখল-দূষণে নগরবাসী প্রায় অবরুদ্ধ। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আপনাদের উদ্ধার অভিযান চলছে। এ প্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছে এবং কী প্রভাব ফেলবে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : উদ্ধার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। নদীতীর রক্ষা এবং মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার জন্য মোট ১২শ' কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৩শ' কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। পরে আরও টেন্ডার হবে। এরই মধ্যে নদীতীরের জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করতে ও দূষণরোধে ঢাকা শহরের চারদিকে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু এবং তুরাগ নদের তীরভূমি থেকে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং প্রায় সাড়ে সাতশ' একর ভূমি উদ্ধার করা হয়। উচ্ছেদকৃত জায়গা পুনঃদখলরোধে দুই হাজার স্থায়ী ও টেকসই সীমানা পিলার নির্মাণ, ২৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে এবং শ্যামপুর ও খানপুরে দুটি ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়।

যাযাদি : জেটি ছাড়াও ছোট ছোট জাহাজ নদীতীরে নোঙ্গর করতে দেখা যায়। এতে নদীর পাড়সহ নানা ক্ষতি হচ্ছে। সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : এখন থেকে জেটির বাইরে জাহাজ ভিড়লেই জরিমানা হবে। জাহাজ যাতে জেটিতে ভিড়তে পারে সেজন্য পর্যাপ্ত জেটি তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর সদরঘাটে অত্যাধুনিক জেটি তৈরি করা হচ্ছে। যেখানে পার্কিং ব্যবস্থাও থাকবে। আগে সদরঘাটে কোনো পার্কিং ব্যবস্থা ছিল না। এখন তা করা হয়েছে। পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে। সদরঘাট আধুনিকায়ন করা হয়েছে। আগে মানুষ দায়ে পড়ে সদরঘাট যেত। এখন সেখানে ঘোড়ার জন্য যাচ্ছে। পানির দূষণ কমানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে মানুষ শান্তি পাবে। নদীও ভালো থাকবে।

যাযাদি : বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে অসংখ্য ডকইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। এতেও শহরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ আছে কী?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বুড়িগঙ্গার পাড়ে যেসব ডকইয়ার্ড রয়েছে তা সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের পরিলল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

যাযাদি : বড় লঞ্চের বর্জ্য রিসাইকেলিং ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের একটা উদ্যোগ ছিল। এখন কি অবস্থায় রয়েছে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : এই পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। পরীক্ষামূলক দু-তিনটা লঞ্চে চালু করা হয়েছে।

যাযাদি : অভ্যন্তরীণ নৌপথে নৌযান দুর্ঘটনার মাত্রা কমিয়ে আনার জন্য সরকার কি করছে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : অভ্যন্তরীণ নৌপথে নৌযান দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে নৌযানের সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি উন্নত করা হয়েছে। নৌযানের ডিজাইন অনুমোদন প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন ও অনলাইনে করা হয়েছে। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন ও কুতুবদিয়ার লাইটহাউসগুলো আধুনিক প্রযুক্তিসহ পুনর্নির্মাণ, নিঝুমদ্বীপ, চরকুকড়িমুকড়ি, কুয়াকাটা এবং দুবলারচরে নতুন লাইটহাউস, টাওয়ার ভবন ছাড়াও রেডিও স্টেশন করা হয়েছে।

যাযাদি : মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ সময় মতো শেষ করা সম্ভব হবে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদা পূরণে কক্সবাজার জেলার মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এখানে ১৬ মিটার গভীর এবং আট হাজার টিইইউস (বিশ ফুট দৈর্ঘের কন্টেইনার) ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন কন্টেইনার জাহাজ প্রবেশ সুবিধা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বন্দরটি উন্নয়নের প্রাথমিক কাজ ২০২৬ সালে শেষ হবে। এই লক্ষ্যেই মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ কাজ দ্রম্নতগতিতে এগিয়ে চলছে। আমাদের লক্ষ্য চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং ব্যাপকসংখ্যক জাহাজ এবং কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা।

যাযাদি : পায়রা সমুদ্রবন্দর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখবে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানির চাহিদা মেটাতে একবিংশ শতাব্দীর যুগোপযোগী, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠা করা সরকারের লক্ষ্য। এজন্য পটুয়াখালীতে দেশের তৃতীয় সমুদ্র পায়রা বন্দর নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারের মেগা প্রকল্প হিসেবে পায়রা বন্দরে একটি কন্টেইনার টার্মিনাল, একটি বাল্ক টার্মিনাল, একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, একটি প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট পস্নান্ট, বিদু্যৎ পস্নান্ট, মডার্ন সিটি, বিমান বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলাসহ ১৯টি কম্পোনেন্টের কাজ চলমান রয়েছে। আগামী ২০২৩ সালে পায়রা বন্দরকে বিশ্বমানের একটি আধুনিক বন্দর এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতির সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০১৩ সালে পায়রা সমুদ্র বন্দরের উদ্বোধনের পর থেকে ক্ষুদ্র আকারে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ২০১৬ থেকে পায়রা বন্দরে বহিঃনোঙ্গরে অপারেশনাল কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত ১০৪টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের অপারেশনাল কার্যক্রম সম্পন্ন করে ২৩৬ কোটি টাকা আয় হয়েছে। বন্দরের মূল চ্যানেলে ক্যাপিটাল ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের জন্য বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং কোম্পানি 'জান ডি নুল'র সঙ্গে সমঝোতা স্মারকপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে।

যাযাদি : প্রায় শোনা যায় নদীর নাব্য নেই। এ কারণে নৌযান চলাচলে যেমন সমস্য হয়, তেমনি বন্যা দেখা দেয়। এই সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ আছে কী?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : নৌপথ খনন ও নাব্য বজায় রাখার জন্য সরকারের গত দুই মেয়াদে ৩৪টি ড্রেজার সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমান মেয়াদে ৩৫টি ড্রেজার সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রায় দুই হাজার ৩৩২ কিলোমিটার নৌপথ খনন করা হয়েছে। ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের কাজ চলমান রয়েছে। নৌপথ খননে আরও ড্রেজার সংগ্রহ এবং ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যাত্রী ও যানবাহন চলাচল সহজ ও দ্রম্নততর করার লক্ষ্যে গত দুই মেয়াদে ১৭টি ফেরি নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ৩৫টি বাণিজ্যিক ও আটটি সহায়ক জলযান সংগ্রহ করা হবে। স্টিমার মডেলের ২টি বৃহৎ যাত্রীবাহী নৌযান 'এমভি বাঙালি' এবং 'এমভি মধুমতি' নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ২টি নির্মাণাধীন রয়েছে। নতুন নতুন ফেরিরুট চালু করা হচ্ছে।

যাযাদি : দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে হ্যান্ডলিং করা হয়ে থাকে। এ বন্দরকে আরও গতিশীল করতে কোনো উদ্যোগ আছে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বন্দর উন্নয়নে ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শিপিং জার্নাল 'লয়েডস লিস্ট'র জরিপে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০টি কন্টেইনার পোর্টের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ২০০৯ সালে ৯৮তম অবস্থানে ছিল। মাত্র ১১ বছরে ৪০ ধাপ এগিয়ে ২০২০ সালে ৫৮তম অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে বন্দরে যাতায়াতকারী ট্রাক-ট্রেইলার স্ক্যানিং করার জন্য দু'স্তরের গেট স্থাপন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে কন্টেইনার এবং জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

যাযাদি : মোংলা বন্দর নিয়ে কি ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে মোংলা বন্দর বর্তমানে আধুনিক বন্দরে রূপান্তরিত হয়েছে। এ বন্দরে বর্তমানে ৬টি নিজস্ব জেটি, ব্যক্তিমালিকানাধীন ৭টি জেটি এবং ২২টি এ্যাংকরেজের মাধ্যমে মোট ৩৫টি জাহাজ একসঙ্গে হ্যান্ডল করা সম্ভব। ২০০১-০৬ সালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে মোংলা বন্দর লোকসান করেছিল ১১ দশমিক ৫ কোটি টাকা। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে আয় করেছে ৩৩৮ কোটি টাকা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে