রাজরাজধানীতে ১৫ হাটের ইজারা পেলেন যারা

রাজরাজধানীতে ১৫ হাটের ইজারা পেলেন যারা

প্রতি বছর ঈদুল আজহা এলে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসানোর কার্যক্রম হাতে নেয় দুই সিটি করপোরেশন। হাটগুলোর ইজারা দেয়া হয়। একসময় হাট ইজারা নিয়ে টেন্ডার আহ্বান করলে অনেক ব্যবসায়ীকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যেত। তবে গেল কয়েক বছর ধরে হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যেই আটকে আছে হাটের ইজারা। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের হাতে প্রতি বছরই যাচ্ছে পশুর হাটের ইজারা।

চলতি বছর রাজধানীতে কোরবানির পশুর হাট বসছে ১৮টি। আর দুটি হলো স্থায়ী হাট। একটি উত্তর সিটি করপোরেশনের, আরেকটি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে। সব মিলিয়ে ২০টি হাট রয়েছে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে। এই হাটগুলোর মধ্যে ১৫টি হাটের ইজারা নিশ্চিত হয়েছে এ পর্যন্ত। সবই পেয়েছেন বর্তমান সরকারদলীয় ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা।

'বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং আফতাবনগর বস্নক ই থেকে এইচ পর্যন্ত এলাকা' পশুর হাট গত চার বছর সরকারদলীয় কর্মীদের হাতেই রয়েছে। ২০১৮ সালে সাবেক উত্তর ছাত্রলীগ নেতা রায়হান, ২০১৯ সালে সাবেক ছাত্র নেতা আকাশ, ২০২০ সালে স্থানীয় কমিশনারের বোন জামাই শিমুল, ২০২১ সালে আবার সাবেক ছাত্র নেতা রায়হান ও চলতি বছর হাট পেয়েছেন মিজানুর রহমান ধনু। তিনিও ২১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ঘুরে ফিরে এদের হাতেই আটকে আছে হাটের ইজারা।

দুই সিটি করপোরেশনের ইজারা তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৫টি হাটের ইজারা পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরী আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা রয়েছেন। তা ছাড়া জাতীয় পার্টি, স্থানীয় এমপি ও কাউন্সিলরদের ঘনিষ্ঠজনরাই হাটের ইজারা পেয়েছেন। এবার ঢাকায় ২০টি অস্থায়ী হাট বসছে।

ডিএনসিসির ১০ অস্থায়ী হাট : ৮টি অস্থায়ী হাট বসানোর জন্য দরপত্র আহ্বান করে ডিএনসিসি। এর মধ্যে ৫টি হাটের ইজারা চূড়ান্ত হয়েছে। এই ৫টি হাটের ৪টিরই ইজারা পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। একটি হাটের ইজারা পেয়েছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা। কাওলা শিয়ালডাঙ্গা হাটটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন তৌফিকুর রহমান। তিনি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈমের ব্যক্তিগত সহকারী এবং দক্ষিণখান থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি।

উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টর বৃন্দাবন থেকে উত্তর দিকে বিজিএমইএ পর্যন্ত খালি জায়গা হাটটি ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মো. নুর হোসেন। তিনি তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক। ভাটারা (সাইদনগর) হাট ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মো. সুরুজ্জামান। তিনি ভাটারা থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।

'বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং আফতাবনগর বস্নক ই থেকে এইচ পর্যন্ত এলাকা' হাটটি ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন মিজানুর রহমান ধনু। তিনি ২১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। 'মোহাম্মদপুর বছিলার ৪০ ফুট রাস্তাসংলগ্ন খালি জায়গা' হাট ২৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন মেসার্স শাহীন ইন্টারন্যাশনাল। এই কোম্পানির মালিক মো. আমজাদ হোসেন দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য।

৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের ৩০০ ফুট সড়কসংলগ্ন খালি জায়গা, মিরপুর সেকশন-৬-এর খালি জায়গা এবং ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁচপুরা বেপারীপাড়ার রহমান নগর আবাসিক প্রকল্প এলাকার হাটগুলোর ইজারা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এগুলোর জন্য তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করেছে সংস্থাটি। তা ছাড়া তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল খেলার মাঠ ও এর আশপাশের খালি জায়গা এবং মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মোড় খেলার মাঠে হাট বসাতে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলররা আবেদন করেছেন। সে হিসাবে ডিএনসিসি এলাকায়ও ১০টি অস্থায়ী হাট বসতে পারে।

ডিএসসিসির ১০ অস্থায়ী হাট : ডিএসসিসির ১০টি হাটের মধ্যে ৯টির ইজারা পেয়েছেন আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার নেতাকর্মীরা। একটি হাটের ইজারা পেয়েছেন জাতীয় পার্টির একজন সংসদ সদস্যের ভাগ্নে। উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘ ক্লাব মাঠের হাটটি ১ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন এএসএম এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. আব্দুল লতিফ। তিনি শাহজাহানপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

হাজারীবাগ ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজ হাটটি ৩ কোটি ৪১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৫ টাকায় ইজারা পেয়েছেন অহিদুর রহমান ওয়াকিব। তিনি ঢাকা-৭ আসনের সরকারদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। তা ছাড়া হাজারীবাগ রোড ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি তিনি। পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গার হাট ২ কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মঈন উদ্দিন চিশতী।

মেরাদিয়া বাজারসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা হাট ১ কোটি ৯০ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মো. আওরঙ্গজেব টিটু। তিনি ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক। লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাবসংলগ্ন খালি জায়গা ও কমলাপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গা হাটটি ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন খান ট্রেডার্সের মালিক গোলাম কিবরিয়া রাজা খান। তিনি ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

যাত্রাবাড়ী দনিয়া কলেজসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা হাট ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন গিয়াস উদ্দিন গেসু। তিনি ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালসংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা হাটটি ৪ কোটি ৫ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

লালবাগ রহমতগঞ্জ ক্লাবসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা হাট ৫০ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন ঢাকা-৭ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের বড় ছেলে সোলায়মান সেলিম। তিনি গত সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। শ্যামপুর কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ডসংলগ্ন খালি জায়গা হাট ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন মাসুক রহমান। তিনি ঢাকা-৪ আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য সৈয়দ আবুল হোসেন বাবলার ভাগ্নে। আমুলিয়া মডেল টাউনের আশপাশের খালি জায়গা হাটটি ৩৫ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছে স্থানীয় যুবলীগ নেতা নওশের আলী।

ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ডক্টর মাহে আলম বলেন, ইজারা প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ দরদাতাকেই হাটের ইজারা দেওয়া হয়েছে।

ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে বলেছেন, ইজারা প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। শতভাগ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দরপত্র সাবার জন্য উন্মুক্ত। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা ইজারায় অংশ নিতে পারবে না, এমন কোনো নিয়ম নেই। আমরা দেখেছি কে সর্বোচ্চ দর দিয়েছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে