আখের বাম্পার ফলন দামেও খুশি চাষিরা

আখের বাম্পার ফলন দামেও খুশি চাষিরা

'আখের ফাঁকে তেল মসলা ডাল চাষ/ আসে ঘরে ভাত কাপড় মিটাই আশ'- বচনটি টাঙ্গাইলের আখ চাষিদের মুখে মুখে। টাঙ্গাইলের কৃষকরা এ সময়ে আখ বা ইক্ষুর জমিতে সাথী ফসল হিসেবে তেল-মসলা ও ডালজাতীয় ফসল চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছেন। এ বছর টাঙ্গাইলে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আখের ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে আখের চাহিদা থাকায় কৃষকরা ভালো দামও পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে আখ চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বেলে ও বেলে-দোআঁশ মাটি আখ চাষের জন্য উপযোগী। ৭ থেকে ৮ মাসের মধ্যে আখের ফলন পাওয়া যায়। এক মৌসুমে আখ উৎপাদনে দুই মৌসুমের ধানের সময় লাগে-তারপরও সাথী ফসল হওয়ায় সার্বিকভাবে আখ চাষে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। আখ উঁচু ও নিচু জমিতেও চাষ করা যায়। আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণের কারণে আশানুরূপ ফলন ও বাজারে বেশ চাহিদা থাকায় দিন দিন আখ চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। আখের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে তিল, তিসি, সরিষা, বাদাম, মিষ্টি কুমড়া, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মটরশুটি, ছোলা, মসুর, মুগ ইত্যাদি চাষ করা যায়।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ৫শ হেক্টর জমিতে ২৩ হাজার ৬শ মেট্রিক টন আখ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ৩৮৮ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ২৫০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ১৬০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছে। গত মৌসুমে জেলায় ৪২২ হেক্টর জমিতে ২০ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন আখ উৎপাদন হয়েছিল।

আখ চাষিরা জানান, আখের সঙ্গে সাথী ফসল বিনা সেচে শুধুমাত্র বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে চাষ করা যায়। ফলে এককভাবে আখ চাষের চেয়ে আখের সঙ্গে সাথী ফসল চাষ করলে অনেক বেশি লাভজনক হওয়া যায়। সাথী ফসল হিসেবে ডালজাতীয় ফসল চাষে জমির উর্বরতা শক্তি অনেকাংশে বেড়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আখ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সাথী ফসল থেকে আংশিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। পেঁয়াজ ও রসুনের পাতায় তীব্র ঝাঁঝ থাকায় সাথী ফসল হিসেবে চাষ করলে আখ ক্ষেতে পোকামাকড়ের উপদ্রব কম হয়। আখের সঙ্গে সাথী ফসল চাষ করলে জমিতে আগাছা কম হওয়ায় মূল ফসলের ফলন অনেকাংশে বেড়ে যায়। কৃষকরা মনে করেন- সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারা অধিক হারে পতিত জমিতে আখ চাষ করে আবাদ আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

সরেজমিন টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ধরেরবাড়ী, পিচুরিয়া, কৃষ্ণপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, আখের প্রতিটি জমিতেই হলুদ ও লাল রঙের আখ। দেখতে আকর্ষণীয় ও খেতে

বেশ সুস্বাদু। আখের ঔষধি গুণও রয়েছে। ৮ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার প্রতিটি আখ খুচরা ১০ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ঢাকাসহ অন্য জেলায়ও এখানকার আখ সরবরাহ করা হচ্ছে।

পিচুরিয়া গ্রামের আখ চাষি লুৎফর রহমান জানান, তিনি চলতি মৌসুমে ৪২ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছেন। এতে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি প্রায় এক মাস আগে ৭৫ হাজার টাকায় তার ক্ষেতের আখ বিক্রি করেছেন। এখন বিক্রি করলে লাখ টাকার উপরে বিক্রি করতে পারতেন। সঙ্গে সাথী ফসলের সুবিধা তো রয়েছেই। তাদের গ্রামের সবারই আখের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো দাম পেয়ে তারা খুব খুশি।

ধরেরবাড়ী গ্রামের চাষি রকিবুল ইসলাম জানান, তার ৬৫ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকার আখ তিনি বিক্রি করেছেন। এছাড়া আখের ফাঁকে ফাঁকে আলু, মিষ্টি কুমড়া ও পেঁয়াজের চাষ করেছেন।

কৃষ্ণপুর গ্রামের আখ চাষি হারেজ আলী মিয়া জানান, এক সময় এ মৌসুমে তিনি আমন ধান চাষ করতেন। তাতে কোনো রকমে খরচ উঠতো। তিন বছর ধরে আমন ধানের আবাদ ছেড়ে আখ চাষ করছেন। এতে লভ্যাংশের পরিমাণ বাড়ছে। এ বছর ২৮ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করে তার খরচ বাদ দিয়ে ৩০ হাজার টাকার বেশি লাভ হয়েছে। তবে গত বছর তাদের গ্রামের অনেক আখ ক্ষেত বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পচে নষ্ট হয়েছিল।

ধরেরবাড়ী হাটে এ মৌসুমে ব্যাপক পরিমাণ আখ কেনাবেচা হয়। ওই হাটে আখ কিনতে আসা এরশাদ মিয়া জানান, আখ শক্ত মানের রসযুক্ত মিষ্টি জাতের খাবার। আখ চিবিয়ে রস চুষে খেলে দাঁতের রোগ হয় না। খেতে সুস্বাদু ও মিষ্টি হওয়ায় তিনি ৩টি সাধারণ মানের আখ ১০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আহসানুল বাসার জানান, টাঙ্গাইলে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি ঈশ্বরদী-৪১ ও ঈশ্বরদী-৪২ সহ নতুন কিছু উন্নত জাতের আখ চাষ করা হচ্ছে। গত বছর বন্যায় যেসব চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তারা অনেকেই এবার আখ চাষ করেননি। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় আখের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। বাজরে দাম ভালো থাকায় অনেকেই আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে