সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯
walton1

একদিনে ডলার বিক্রিতে রেকর্ড

'কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও প্রকট করবে'
যাযাদি রিপোর্ট
  ২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০
ব্যাংকগুলোর আমদানি দায় মেটার সহায়তা করতে এক দিনে রেকর্ড পরিমাণ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক কয়েকটি ব্যাংকের কাছে সোমবার ৫ কোটি ডলার বিক্রি করেছে সাংস্থাটি। যা এক দিনের বিক্রিতে রেকর্ড। এর ফলে রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়ার পরও রিজার্ভ ৩২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চলতি অর্থবছরের ৭ মাসে ব্যাংকিং খাতে ৮ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করেছিল সংস্থাটি। এর আগে পুরো অর্থবছরেও রিজার্ভ থেকে এত ডলার কখনোই বিক্রি হয়নি। অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা, এক্সচেঞ্জ রেট ও ঋণের হারের সীমা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান অটুট থাকলে মার্কিন ডলার বিক্রির এই গতিও অব্যাহত থাকবে, এমনকি তা আরও বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে আমদানি খরচ বেড়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রম্নত হ্রাস পেয়ে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বাজারকে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার নির্ধারণ করতে না দেয় এবং ঋণের ওপর ৯ শতাংশ সুদের হারের সীমা তুলে না নেয়, তাহলে রিজার্ভ আরও কমতে পারে। এদিকে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে যা ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি দেশকে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। জানা গেছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আমদানির জন্য এলসি খোলা কমলেও এখনো আগের আমদানি দায় নিষ্পত্তির জন্য কোনো কোনো ব্যাংকে ডলারের সংকট আছে। এ সংকট মেটাতে এবং টাকা-ডলার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। বিশেষত সরকারের বিভিন্ন আমদানিতে সংকট হলে সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অস্থির ডলারের বাজার সুস্থির করতে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৬ মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) না পেরোতেই ৮৫০ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে ৭৬২ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তার আগের অর্থবছরে ডলারের সরবরাহ বেড়ে হ পৃষ্ঠা ১৫ কলাম ১ যাওয়ায় বাজার থেকে উল্টো প্রায় ৮০০ কোটি ডলার ক্রয় করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনীয় ডলার বিক্রি করলেও গত তিন মাস ধরে শুধু সরকারি কেনাকাটা ও জ্বালানি তেল, সারসহ অন্যান্য অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য এলসি বা ঋণপত্র খুলতে রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংকের কাছে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে ডলার কিনে আমদানি খরচ মেটাচ্ছে। জানা যায়, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির দর আরও ১ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন ১০০ টাকা দরে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করা হয়েছে। সোমবার এই দরেই রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংকের কাছে ৫ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা। তবে সব ব্যাংক এই দরে ডলার পাচ্ছে না। সরকারের প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংকের কাছে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে ডলার কিনে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এদিন আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের সর্বোচ্চ দর ছিল ১০৭ টাকা। এক বছর আগে রিজার্ভ থেকে ৮৬ টাকা দরে ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন অবশ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কাছেও ডলার বিক্রি করা হতো। সব ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী ডলার বিক্রি করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সঞ্চিত রিজার্ভ আরও কমে যাবে। সে জন্য সরকারের প্রয়োজনেই এখন শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার ছাড়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, 'সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমদানি কিছুটা কমে যাওয়ায় চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বাজারভিত্তিক এক্সচেঞ্জের অনুমতি দেওয়া হলে স্থানীয় মুদ্রার আরও অবমূল্যায়ন হবে, যা চাহিদা কমাতে সহায়ক হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে অবস্থান নিয়েছে তা এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও প্রকট করবে। বাজারভিত্তিক এক্সচেঞ্জ রেট চালু না করলে বাজারে বিপুল পরিমাণ ডলার বিনিয়োগ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।' তিনি বলেন, 'অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ যে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল তাতে বাজার থেকে ডলার কেনার অবদান ছিল। আবার এখন যে রিজার্ভ কমছে তাতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি একটি বড় কারণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদের হার সমন্বয় করা। তা না হলে মানুষ কেন তাদের অর্থ বাংলাদেশে আনবে?' বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, 'বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক বিনিময় হার প্রত্যাহারে ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি বাজারভিত্তিক এক্সচেঞ্জ রেটের অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে তা বাজারে অস্থিতিশীলতা কমাতে সহায়তা করবে।'
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে