মৃতু্য আলাদা করল প্রিয় দুই বান্ধবীকে

পাঁচ বছর আগে সোনিয়া ও কচির পরিচয়। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। এরপর দুজনের একসঙ্গে পথচলা শুরু। কচির মা-বাবা কেউ-ই বেঁচে নেই। সোনিয়ার মা-বাবাকেই তিনি মা-বাবা বলে ডাকতেন
মৃতু্য আলাদা করল প্রিয় দুই বান্ধবীকে
সোনিয়া কচি

পাঁচ বছর আগে সোনিয়া (৩০) ও দুলদানা আক্তার কচির (৩২) পরিচয়। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। এরপর দুজনের একসঙ্গে পথচলা শুরু। রাজধানীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন তারা। কচির মা-বাবা কেউ-ই বেঁচে নেই। সোনিয়ার মা-বাবাকেই তিনি মা-বাবা বলে ডাকতেন। এর মধ্যে সোনিয়ার নয় মাস আগে ভারতে এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে হয়। সেখানেই ছিলেন সোনিয়া। ছুটিতে বাবা-মা ও ভাই-বোনের সঙ্গে সময় কাটাতে দেশে আসেন। একমাস ধরে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। বান্ধবী কচির স্কুটিতে ঢাকার বিভিন্ন পুরানো বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে কচির স্কুটি করে বনানীতে তাদের এক সিনিয়র বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলেন সোনিয়া। সেখান থেকে বাসায় ফেরার সময় গাড়ি চাপায় দুই বান্ধবী নিহত হন। মৃতু্যই আলাদা করল তাদের দুজনকে।

বুধবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে দেখা গেছে সনিয়ার মা মনোয়ারা বেগম, নানি, দুই ভাই, এক খালা, তার বোন এবং ভাইয়ের স্ত্রী বসে আছেন। তখন মর্গে সোনিয়ার ময়নাতদন্ত চলছিল।

সোনিয়ার গ্রামের বাড়ি ভোলা সদরের মাছবেদুরিয়া এলাকায়। তার বাবার নাম রুহুল আমিন। মঙ্গলবার রাতে (২৫ ডিসেম্বর) সড়কে সোনিয়ার মৃতু্যর পর তার মোবাইল ফোন থেকে পরিবারের নম্বর পেয়ে বাসায় ফোন দেয় পুলিশ। তাদের মৃতু্য সংবাদ জানানো হয় স্বজনদের। তবে কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বারবার হাসপাতালে আসতে বলার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে মেয়ের লাশ পান মনোয়ারা বেগম।

তিনি বলেন, 'মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে আমি সোনিয়াকে ফোন দিই। বাসায় কয়েক প্যাকেট বিরিয়ানি আনিয়েছিলাম। তাই সোনিয়াকে ফোন দিয়েছিলাম, যাতে দ্রম্নত বাসায় আসে। তখন সোনিয়া ফোন ধরে বলে, মা আমি বনানী মিনু আপার বাসায়। আমার সঙ্গে কচিও আছে। আমরা একটু পরে বাসায় আসছি। এরপর আমার সঙ্গে আর কথা হয়নি।'

মনোয়ারা বেগম তার মেয়ের বিভিন্ন স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সোনিয়ার ভাই মো. ফারুক বলেন, 'আমাদের গ্রামের বাড়ি ভোলাতে হলেও আমরা দীর্ঘদিন ধরে শাহআলী এলাকায় বসবাস করছি। এখানেই আমাদের বেড়ে ওঠা। সনিয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। কচি তার বান্ধবী। তারা একসঙ্গে চাকরি করতেন। ভারত থেকে আমদানি করা কসমেটিক্সের দোকানে চাকরি করতেন সনিয়া। সেখানে চাকরি করার সময় সৈয়দ মহসিন নামে ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার সঙ্গে ৯ মাস আগে ভারতেই বিয়ে হয়। বিয়ের পর সে ছুটিতে বেড়াতে এসেছিল। তার স্বামীরও আসার কথা ছিল।'

এদিকে দুলদানা আক্তার কচির বাবার নাম সৈয়দ ফজলুল হক, মা রেখা আক্তার। তার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর এলাকায়। তারা দুই বোন। বড়বোন চুমকি গ্রামে শ্বশুরবাড়ি থাকেন। তবে বাড়িতে বেশি একটা যান না কচি।

কচির মামা নুরুল ইসলাম বলেন, 'কচি ও সনিয়া কল্যাণপুরের একটি একরুমের বাসায় ভাড়া থাকত। তার বাবা-মা কেউ নেই। আপন বলতে তার বড়বোন। কচি পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি কোম্পানির ট্যারিটরি ম্যানেজার ছিল। তবে আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে সে কাজ করত, আমরা তা জানি না। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ বাড়িতে নিয়ে এসেছি।'

মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে রাজধানীর বনানীতে সেতু ভবনের সামনে স্কুটার আরোহী সনিয়া ও কচিকে চাপা দেয় একটি গাড়ি। পরবর্তীতে পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চিকিৎসকরা রাত দেড়টার দিকে দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বনানী থানায় দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে। তবে চাপা দেওয়া গাড়িটি এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আযম মিয়া বলেন, 'ঘটনার পরপরই আমরা ঘাতক গাড়িটি শনাক্তে কাজ করছি। ওই এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। ফুটেজ দেখে ঘাতক গাড়িটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।'

কচি ও সনিয়ার ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ বলেন, 'দুজনের শরীরে আঘাত রয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনাজনিত আঘাত বলে মনে হচ্ছে। তারপরও আমরা তাদের ভিসেরা সংগ্রহ করেছি। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এলে বোঝা যাবে তাদের কীভাবে মৃতু্য হয়েছে।'

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে