মুষ্টির চালে গড়ে ওঠা সমিতি জুঁইঘটনার শুরম্ন মুষ্টির চাল দিয়ে। সেখান থেকে গড়ে উঠেছে আজকের স্বনির্ভর কৃষাণি সমিতি। তিল তিল করে জমানো মুষ্টির চালের টাকায় কিনেছেন আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। যা ব্যবহারের মাধ্যমে পাল্টে গেছে গ্রামের কৃষি ও আর্থ-সামাজিক চিত্র...তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) অকৃষি পতিত জমিতে সবজি চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হচ্ছেন কালীগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের নারীরা। বাড়ির পাশে পতিত অকৃষি জমিতে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাতেও সরবরাহ করে থাকে তারা। প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার গ্রামের শতাধিক মহিলা জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত মৌসুমি সবজি ও বিভিন্ন ফসল সমিতির নির্ধারিত স্থানে জমা করে। পরে সেগুলো ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। সবজি বিক্রির টাকায় অল্পদিনেই বদলে গেছে এই এলাকার কৃষি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা। অনুকরণীয় এই গ্রামটি হচ্ছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মোস্ত্মবাপুর। আর স্বনির্ভর উন্নত কৃষি গ্রাম গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একই গ্রামের কৃষাণি মনোয়ারা বেগম। তিনি উপজেলার ৪নং নিয়ামপুর ইউনিয়নের আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী ও নিয়ামতপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের ইউপি সদস্য। তারই নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে কৃষাণি সমবায় সমিতি জুঁই। ঘটনার শুরম্ন মুষ্টির চাল দিয়ে। সেখান থেকে গড়ে উঠেছে আজকের স্বনির্ভর কৃষাণি সমিতি। তিল তিল করে জমানো মুষ্টির চালের টাকায় কিনেছেন আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। যা ব্যবহারের মাধ্যমে পাল্টে গেছে গ্রামের কৃষি ও আর্থ-সামাজিক চিত্র।
২০০২ সালের কথা। জাপানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড মোস্ত্মবাপুর গ্রামে কাজ শুরম্ন করে। হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের ইনচার্জ এসএম শাহিন হোসেনের সহযোগিতায় মনোয়ারা বেগম গ্রামের কৃষাণিদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন জুঁই নামের একটি মহিলা সমবায় সমিতি। প্রথমে মুষ্টির চাল তুলে এক জায়গায় জমানোর সিদ্ধান্ত্ম হয়। এরপর মাত্র দু'বছরে তাদের জমানো চালের টাকা দিয়ে কিনে ফেলেন পাওয়ার টিলার, সিডার মেশিনসহ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। যা সদস্যরা নিজেদের কৃষি কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি অন্যর কাজ করে পয়সা রোজগার করছেন। আর গ্রামের হতদরিদ্র কৃষক চি?িহ্নত করে তাদের চাষে সহযোগিতা করেন। বর্তমানে এই সমিতির সদস্য ৪০ নারী। তাদের এখন নিজস্ব প্রায় লক্ষাধিক টাকা সমিতির সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা আছে যা তারা গরম্ন, ছাগল, হাঁস ও মুরগিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে বিনিয়োগ করেছেন।
সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি উৎপাদন, সম্প্রসারণ ও বাজারজাতসহ এলাকায় কর্মসংস্থানে অবদান রাখায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে কৃষিতে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন মোস্ত্মবাপুর গ্রামের এই কৃষাণি মনোয়ারা। গত ১৬ জানুয়ারি তার হাতে জাতীয় সবজি মেলা ২০১৮ বিশেষ অনুষ্ঠানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আবদুলস্নাহ।
ইউপি সদস্য ও নারী সংগঠক মনোয়ারা বেগম জানান, প্রতিদিন বিকালে প্রত্যেকে এক মুষ্টি (এক মুঠো) করে চাল মনোয়ারার বাড়িতে রেখে সঞ্চয় করবেন। সিদ্ধান্ত্ম মোতাবেক কাজ শুরম্ন হলে প্রথম মাসেই ২৫ জন কৃষাণি মুষ্টির চালের সমিতিতে সদস্য হয়ে যান। এভাবে ৩ বছর শেষে ২০০৫ সালের শেষের দিকে তারা ৪৩ হাজার টাকার চাল বিক্রি করেন। এ টাকায় তিনটি গরম্ন কিনে অর্ধেক ভাগ লাভ দেয়ার চুক্তিতে সমিতির ৩ সদস্যের মধ্যে বিতরণ করেন। ২০০৭ সালে গরম্ন তিনটি বিক্রি করে লাভের অর্ধেক হিসেবে ২৭ হাজার টাকা সমিতিতে আসে। সমিতির অর্থায়নে সমিতিকে অর্ধেক লাভ দেয়ার চুক্তিতে ৩০ জন সদস্যের বাড়িতে ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) তৈরি শুরম্ন করেন। ফলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পাল্টে যায়। তিনি আরও জানান, একা উন্নতি করলে সমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই গ্রামের সবাইকে নিয়ে কৃষি উন্নত গ্রাম হিসেবে নিজেদের গ্রামকে গড়ে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সমিতির সদস্য রাজিয়া বেগম জানান, তাদের গ্রামটি সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর। কৃষি অর্থনীতিকে মজবুত করতে তাদের মহিলা সমিতি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সমিতির সভানেত্রী মনোয়ারা বেগমই প্রধান সংগঠক হয়ে গ্রামের কৃষাণিদের সংগঠিত করেন। গ্রামের কৃষিতে অবদান রাখার কারণে ২০০৪ সালের ইউপি নির্বাচনে গ্রামবাসীরা তাকে মহিলা মেম্বর নির্বাচিত করেন। এরপর সবার সহযোগিতায় নিয়ামতপুর ইউনিয়নের মধ্যে তাদের গ্রামটিকে প্রথম শতভাগ স্যানিটেশনের গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলে পুরস্কার লাভ করেন। ফলে তার সমাজ সেবামূলক এসব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জয়িতার সম্মাননা পান।
মোস্ত্মবাপুর গ্রামের কৃষক নুরম্নল ইসলাম জানান, তাদের গ্রামের সফল কৃষাণি মনোয়ারা বেগম কৃষাণিদের সংগঠিত করে গ্রামের কৃষি চাষপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। তার নেতৃত্বে কৃষাণিরা গ্রামের পতিত জমিতে চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ফলে তাদের এমন কর্মকা-ে সমাজে নারীদের নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তাদের এখন অনেক সম্মান করে।
হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের ইনচার্জ এসএম শাহিন হোসেন জানান, আমরা ২০০২ সালে মোস্ত্মবাপুর গ্রামের শতভাগ স্যানিটেশনের আওতায় আনতে কাজ শুরম্ন করি। পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে কৃষি নিয়ে কাজ করি। সে সময় গ্রামের নারী সংগঠক মনোয়ারাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের নারীদের সংগঠিত করা হয়। তখন থেকেই তারা তাদের ভাগ্য উন্নয়নে চেষ্টা করছে এবং তারা সফল হয়েছে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close