পূর্ববর্তী সংবাদ
কণ্ঠে তার ভাষার দাবিভাষাসংগ্রামী ড. শরীফা খাতুন, ৫২'র ভাষা আন্দোলনে তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল ভাষার দাবি। ভাষার প্রতি মমতায় ছাত্র অবস্থায় ছুটে গিয়েছিলেন অগ্নিঝরা মিছিলে। চলুন, তার কণ্ঠেই শুনি, সে সময়কার ভাষা আন্দোলন নিয়ে সংগ্রামের কথা।সুমাইয়া সরকার ভাষাসংগ্রামী ড. শরীফা খাতুনপাকিস্ত্মানের সে সময়ের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন '৫২-এর ২৭ জানুয়ারি জিন্নাহর ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন। অনেক ভাষাসংগ্রামী আমাকে বলেছেন, এই ঘোষণাই মূলত একুশের পরিবেশ তৈরি করে।
খাজা নাজিমুদ্দিন কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের চাপে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে গণপরিষদে কথা বলবেন কথা দিয়েছিলেন। তিনি তার প্রতিশ্রম্নতি রাখলেন না। ছাত্ররা প্রতিবাদে ফেটে পড়ল। সে প্রতিবাদের প্রভাব আমাদের হোস্টেলে এসে পড়ল। আমরা বিস্ত্মারিত জানলাম। তখন ছাত্ররা ধর্মঘট ডাকল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট আহ্বান করে। ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ঢাকা বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভা হয়। সভায় ২১ ফেব্রম্নয়ারি প্রদেশব্যাপী অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্ত্মানে হরতালের ডাক দেয়া হয়। গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।
ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সভা ডাকে। আমরা ইডেন গার্লস কলেজের ছাত্রীরা সে সভায় অংশগ্রহণ করেছি। আগেই বলেছি তার আগেও তো সচেতন ছিলাম। সব খবর রাখতাম আমরা হোস্টেলের মেয়েরা। ওই সময় চিঠির যে খাম ছিল তাতে উর্দু এবং ইংরেজি লেখা ছিল। কোনো বাংলা লেখা ছিল না। খুব খারাপ লাগত। ৪ ফেব্রম্নয়ারি যে মিটিং হয় সেখানে আমি গিয়েছি।
সে সময় আমার সঙ্গে ছিলেন ইডেন কলেজের জিএস মনোয়ারা বেগম। আরও ছিলেন মতি আপা, জেবুন্নেসা, লুৎফুন্নেসা, শাহাদত আরা, আমিরম্নন্নেসা, রওশন জাহান হেনা, ফিরোজী বেগম, সুফিয়া খাতুন, রাহাত আরা, শহর বানু। আরও অনেকের নাম এখন আর মনে নেই।
অধ্যাপক শরীফা বলেন, মিটিংয়ে যাওয়া ছাড়া আমরা আন্দোলনের পক্ষে পোস্টার লিখে দেয়ালে সাঁটাতাম। সবার মুখে একটাই আলোচনা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। রাষ্ট্রভাষা সংবলিত ব্যাচ বিলির কাজ করেছি। আমাদের আরেকটি দায়িত্ব দেয়া হলো যে, মেয়েদের বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে বোঝাতে হবে। ঢাকা শহরে যে ক'টা স্কুল ছিল, সেগুলোতে প্রচার চালানোর দায়িত্ব পড়ল আমাদের ওপর। আমরা কয়েকজন ছাত্রী মুসলিম গার্লস স্কুলে গেলাম। আমার সঙ্গে গেল আমার বান্ধবী রওশন জাহান হেনা ও শহর বানুসহ পাঁচ-ছয়জন। মুসলিম স্কুলে দারোয়ান আমাদের ঢুকতে দিল না। আমরা বললাম, কয়েকজন ছাত্রীকে ডেকে দেন। দারোয়ান ডেকে দিল। আমরা ছাত্রীদের ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচির কথা জানাই। ২১ তারিখের কর্মসূচির কথা তারা আগে থেকেই কিছুটা জানত।
এই ভাষাসংগ্রামী জানান, তার পর তো ২০ ফেব্রম্নয়ারি চলে এল। বিকেলে হঠাৎ করে শুনি মাইকিং হচ্ছে যে, পরদিন ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। আর তা করেছে সরকারই।
সরকারের লোকেরাই সবাইকে সতর্ক করে মাইকিং করে। আমরা সবাই চিন্ত্মায় পড়ে গেলাম, কী হবে। রাত ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের ছাত্র নেতারা ইডেন কলেজের গেটে এসে আমাদের জিএস আপাকে জানালেন, ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। আমাদের সবাইকে যেতে হবে। ২১ তারিখ সকালে ৯টার দিকে আমরা নাস্ত্মা করে আমতলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। সকালে ইডেনের গেট বন্ধ ছিল। আমরা কেউ কেউ গাছ বেয়ে দেয়াল পার হলাম। আমি আবার গ্রামে বড় হয়েছি। গাছে মোটামুটি উঠতে পারতাম। তো আমরা আমতলার দিকে চললাম।
সেদিন হোস্টেল থেকে আমরা ৩০ জনের মতো ছাত্রী গিয়েছিলাম। সঙ্গে ব্যানার ছিল। ১৪৪ ধারা তো- আমরা কয়েকজন কয়েকজন করে গিয়েছি। সবাই একসঙ্গে যাইনি। রাস্ত্মায় পুলিশ দেখতে পেলাম- হাফপ্যান্ট পরা, হাতে লাঠি। আমতলায় গিয়ে দেখি অনেক লোকজন। মুসলিম স্কুল থেকেও মেয়েরা এসেছে। কামরম্নন্নেসা স্কুলের ছাত্রীরাও ছিল। শ'খানেক মেয়ে ছিল মনে হয়। আমরা আমতলার একপাশে বসলাম। একটা ডায়াচ ছিল। বোধহয় ১২টার দিকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ডায়াচে বসলেন। মিটিং শুরম্ন হলো। সভায় গাজিউল হক সভাপতি ছিলেন। আগের রাতেই তাদের সিদ্ধান্ত্ম ছিল- ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে।
১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য হয়। শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে ছিলেন। তবে বেশির ভাগ নেতাই এর পক্ষে ছিলেন। তার পর সাড়ে ১২টা বা ১টার দিকে বোধহয় সভা শেষ হলো। তখন পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে বর্তমান জগন্নাথ হলে অধিবেশন হচ্ছিল। সেখানে গিয়ে রাষ্ট্রভাষার গুরম্নত্ব তুলে ধরার জন্য সবাই তৈরি হয়। শান্ত্মিপূর্ণভাবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত্মই ছিল সবার। ইট-পাটকেল নিক্ষেপের কারও কোনো চিন্ত্মা ছিল না। ১০ জন ১০ জন করে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত্ম হলো। প্রতিটি দলে একজন ছাত্রী থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ছাত্ররা আগে যাবে। প্রক্টর অফিসের গেটের সামনে থেকে আমরা লাইনে দাঁড়ালাম। কয়েকটি দল বের হলো। এর পর আর মিছিল হচ্ছে না। পুলিশ বাধা দিল। ইট-পাটকেলের প্রচ- শব্দ শুনলাম। পুলিশ লাঠিচার্জ শুরম্ন করল। প্রথমে যারা বের হয়েছে তাদের অনেকেই আহত হলো। গাজিউল হকও আহত হন।
উনি অজ্ঞানই হয়ে যান। আমরা তো সবাই আতঙ্কিত। এর আগে তো লাঠিচার্জ-টিয়ার গ্যাসের শেলের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। পুলিশ অনেককে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। টিয়ার শেলে আমাদের চোখ জ্বলছে। কে যেন পানি এনে দিল। চোখে পানি দিলাম।
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বোধ হয় ৩টার দিকে গুলির শব্দ শুনলাম। কে বা কারা নিহত তা জানতে পারেনি। কলাভবন ও মেডিকেল কলেজের মাঝখানে একটা দেয়াল ছিল। দেয়ালটা ভাঙা হলো। আমার বান্ধবী রওশন জাহান হেনার ভাই জাহাঙ্গীর মেডিকেলে পড়তেন। তিনি আমাদের নিরাপদে হোস্টেলে পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নিলেন। ডা. জাহাঙ্গীর পরে '৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কুমিলস্না ক্যান্টনমেন্টে শহীদ হন। আমরা তার সহযোগিতায় হোস্টেলে নিরাপদেই এলাম। বিকেল ৫টার দিকে শুনি অনেকে নিহত হয়েছেন। আহতরা হাসপাতালে। কয়েকজন ছাত্রীও আহত হন। কে কে নিহত হয়েছেন তা জানতে পারিনি।
খবর আসছে- লাশ গুম করা হয়েছে। হোস্টেল থেকে আমরা কয়েকজন ঢাকা মেডিকেলে আহতদের দেখতে গেলাম। ছাত্ররা আহত। চারদিকে হাহাকার।
পরে বরকত, জব্বার, শফিউলরা শহীদ হয়েছেন সে খবর পেলাম। পরদিনও মিছিল-মিটিং হয়েছে।
এর পর ২৩ তারিখ রাতে লুকিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হলো। ভোরে উদ্বোধন করা হয়। আমরা উদ্বোধনের পরে সকালের দিকেই সেখানে গিয়েছি।
ভাষা আন্দোলনে নারী শুধু সক্রিয়ভাবে অংশই নেননি বরং নিজের গায়ের গয়না এবং টাকা দিয়ে সাহায্যও করেছেন। এমনকি ইডেন কলেজে আমরা একদিন রান্না করে জেলখানায় পাঠিয়েছি।
এরপর তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হলো। আমাদের কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। হোস্টেল থেকে চলে যেতে বলা হলো। আমি ট্রেনে করে আখাউড়া আমার বান্ধবি শহর বানুর বাবার বাসায় গিয়ে রইলাম। আমার বাবা সিলেট থেকে এসে আমাকে নিয়ে যায়।
ভাষা আন্দোলন চলে ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়ার আগ পর্যন্ত্ম এবং ২১ ফেব্রম্নয়ারির পর ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত্ম আন্দোলনেও নারীদের ভূমিকা ছিল।
আমি ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হই। তখনো আন্দোলন-সংগ্রাম চলছিল। ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রম্নয়ারি আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে। অনেক ছাত্রী গ্রেপ্তার হয়। অনেককেই সেদিন ১৪৪ ধারা ভাঙার দায়ে পুলিশ ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। সেদিন গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ২০-২১ জন। কুমিলস্না ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রথম নারী অধ্যাপক লায়লা নূরও ছিলেন। লায়লা আপা আমার পরিচিত। উনি আমার সিনিয়র ছিলেন। লায়লা আপার সঙ্গে আমিও মিছিল-মিটিংয়ে গিয়েছি।
'৫৫-এর ২১ ফেব্রম্নয়ারি ছাত্রীরা গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সরকারের কিছুটা টনক নড়ে। পরের বছর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। পাকিস্ত্মান ৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়।
এই ভাষাসংগ্রামী সংগ্রামমুখর জীবনে কর্মজীবনের শুরম্নতে ফেনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৫৮ সালে। ১৯৬৩ সালে ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা শুরম্ন করেন ১৯৬৫-৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শিক্ষায় পিএইচডি লাভ করেন। ২০০১ সালে অবসর নেন।
১৯৫২ সালে শরিফা খাতুন ইডেন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়তেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র নেতারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ইডেন কলেজের ছাত্রীদের সংগঠিত করার জন্য সেখানে সমাবেশের আয়োজন করেন শরিফা খাতুন তাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে অংশগ্রহণ করেন। ভাষাসংগ্রামী অধ্যাপক শরিফা খাতুন বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন।
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close