চাকরিতে মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন প্রয়োজনদেশের বর্তমান চাকরির বাজারের অবস্থা উন্নতি করতে কারিগরি শিক্ষার দ্রম্নত বিস্ত্মারের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মেধা যাচাই পদ্ধতির সংস্কার সাধন করা জরম্নরি।অলোক আচার্য্য পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার করা হয়েছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্ন কাঠামো থেকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন তুলে দেয়া হয়েছে। জেএসসি পরীক্ষাতেও একই সিদ্ধান্ত্মের খবর পেয়েছি। বহুনির্বাচনী প্রশ্ন ফাঁস করা সহজ এটা একটা কারণ ছিল। তা ছাড়া পাঠ্যসূচিতেও বিভিন্ন বছর সংস্কার বা পরিমার্জন করা হয়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়। পরিবর্তন করার উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই তা হলো শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা। সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষাসহ দেশে বিভিন্ন শিক্ষা মাধ্যম চালু রয়েছে। এর মধ্যে কারিগরি শিক্ষাকে এখন সর্বাধিক উৎসাহ দেয়া হয়। আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষায় সুযোগ সৃষ্টি করা হলেও এখনো তা অপ্রতুল। চীনে ৫১ শতাংশ মানুষ কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত। চীন ছাড়া বিভিন্ন দেশেই এখন কারিগরি শিক্ষাকে পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কারণ একটাই- পড়ালেখা শেষ করে চাকরির বাজারে ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট না করে নিজের মেধা খাটিয়ে নিজেই কিছু একটা করতে পারে। আমরাও আজ অনেকটা সে ক্ষেত্রে সফল। কারিগরি শিক্ষার চাহিদা যেমন দেশের অভ্যন্ত্মরে রয়েছে তেমনি দেশের বাইরে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এর ঠিক বিপরীত অবস্থানে আছে সাধারণ শিক্ষা। কারণ এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বেশি কিন্তু ক্ষেত্র কম। কারিগরি শিক্ষায় উন্নতি করা সম্ভব হলে দেশের অভ্যন্ত্মরে যেমন প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর ব্যবহার করা সম্ভব হবে তেমনি নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। কারণ শিক্ষাজীবন শেষে সবাই কাজের খোঁজ করে। বলা যায় শিক্ষা গ্রহণের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে একটা ভালো চাকরি পেয়ে জীবন ও জীবিকা চালানো।
হশিক্ষাজীবন শেষ করেই একজন শিক্ষিত যুবক বেকার নাম ধারণ করে। যতক্ষণ না সে একটা চাকরি পাচ্ছে বা আয়ের কোনো ভালো উৎস বের করছে ততক্ষণ সে বেকার। আমাদের দেশে এখন বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। মানে শিক্ষাজীবন শেষ করে নিজের জন্য কোনো সংস্থান করতে পারছে না বেশিরভাগ শিক্ষিত যুবক। আর মূলত সে কারণেই কিন্তু জোর দেয়া হচ্ছে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে। ইতোমধ্যেই কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বহু বেকার যুবক নিজেই নিজের কর্মসংস্থান করে নিয়েছে। তা ছাড়া আইটি খাত প্রসারিত করার মাধ্যমে বেকার সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
কিন্তু তারপরেও বেকার সমস্যা বেড়েই চলেছে। শিক্ষাজীবন শেষ করে তাকে প্রতিনিয়ত চাকরির পরীক্ষায় বসতে হয়। শিক্ষাজীবন শেষ করতেই মানে মাস্টার্স পাস করতে করতেই একজনের ২৬-২৭ বছর পার হয়ে যায়। হাতে দু'তিন বছর বা সর্বোচ্চ চার বছর থাকে। চাকরির বাজারের যে অবস্থা তাতে খুব বেশি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে না নিতেই চাকরির বয়স পার হয়ে যায়। মাত্র কিছুদিন আগে পত্রিকায় সরকারি চাকরি না পেয়ে একজনে আত্মহত্যার খবর পেলাম। এটা কোনো সমাধান হতে পারে না। তবে সে নিশ্চিতভাবেই প্রচ- হতাশ ছিল। শুধু একজন নয় এরকম অগণিত যুবক চাকরি না পেয়ে বিশেষ করে সরকারি চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে ঘুরছে। আর এখানেই কারিগরি শিক্ষার প্রসারতা প্রযোজন। একজন বেকারকে এ দেশে চাকরি হোক বা না হোক কেবল পরীক্ষা দেয়ার জন্যই হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হয়। আমার মতে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এটা একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। একজন দরিদ্র পরিবারের বেকার যুবক বা যুবতীর এই চাকরির পরীক্ষার টাকা গোছাতেই সংগ্রাম করতে হয়। চাকরি হওয়া তো অনেক দূরের বিষয়। প্রথমত তাকে সেই চাকরিতে ব্যাংক ড্রাফট করতে হয় অথবা কোনো কম্পিউটারের দোকানে আবেদন ফি জমা দিয়ে আবেদন করতে হয় তারপর পরীক্ষা দেয়ার জন্য সেই স্থানে যাওয়া-আসার একটা খরচ থাকে। সব মিলিয়ে প্রতিটি পরীক্ষায় ভালোই খরচ করতে হয় এ দেশের বেকারকে। একমাসে একাধিক পরীক্ষা থাকলে তো রীতিমতো আর্থিক সংকটে পড়তে হয় অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারকে। তারপর আবার অধিকাংশ চাকরির পরীক্ষা রাজধানীকেন্দ্রিক। নূ্যনতম হলেও বিভাগীয় শহরে। মফস্বল অঞ্চল থেকে পরীক্ষা দিতে গেলে হোটেল খরচও যোগ করতে হয়।
সরকারি চাকরির যতদিন আবেদন করার বয়স থাকে ততদিন তাকে এই বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব ছাড়াও তাকে প্রচুর বইপত্র কিনতে হয়। কারণ একাডেমিক পরীক্ষায় সিলেবাসের নির্দিষ্টতা থাকলেও এখানে তা নেই। আমি হয়তো হিসাব রক্ষক পদের জন্য পরীক্ষা দিতে যাবো আর পরীক্ষায় আসবে উগান্ডার রাজধানীর নাম কি? আমাদের দেশে মেধা যাচাই পদ্ধতিটা এরকমই। সবকিছু জানতে হবে। কিন্তু যোগ্যতার মাপকাঠি কেবল মোটা মোটা চাকরির বা নামি-দামি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে অর্জন করতে হবে কেন। কেবল প্রচুর বই পড়ে বিশাল জ্ঞান অর্জন করে চাকরির লিখিত পরীক্ষায় টিকে চাকরি পাওয়াটা আজকাল আমাদের দেশের চাকরি পাওয়ার সিস্টেম হয়ে গেছে। কিন্তু চাকরিতে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কতটুকু তা যাচাই করে চাকরি দেয়ার সিস্টেম আজও আমাদের দেশে প্রচলিত হয়নি। পরীক্ষায় পাস করার জন্য যত লেখাপড়া করতে হয় আমাদের দেশে চাকরি পেতে গেলে তার থেকেও বেশি বই পড়তে হয় বা কোচিং করতে হয়। কিন্তু একজন ভালো ছাত্র ভালো শিক্ষক নাও হতে পারেন। তার প্রমাণ রয়েছে অজস্র। আবার একজন মোটামুটি মানের ছাত্রও খুব ভালো বক্তৃতা দিতে পারে। কোনো সম্পর্ক নেই এমন সাধারণ জ্ঞানও আমাদের দেশে না জানলে তার মেধা কম বলে ধরা হয়। আর আবেদনের যোগ্যতা দিন দিন কেবল একাডেমিক পরীক্ষায় যারা ভালো ফলাফল করছে তাদের জন্য করা হচ্ছে। তুলনামূলক খারাপ ফল অর্জনকারীরা আবেদনের সুযোগই পান না। আমাদের মেধা যাচাই পদ্ধতিটাই এরকম। অথচ গুগল মাইক্রোসফটের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানে আমাদের এই দেশ থেকে যারা কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তাদের বর্ণনায় দেখা যায় তাদের নিয়োগ পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের মেধা যাচাই ভিন্ন। তারা সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে বেশি গুরম্নত্ব দেয়। কে কত দক্ষ তার জন্য বিষয়ের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হয় না। কারণ মেধা ওই জিপিএর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। চাকরিতে নিয়োগের আগে পরীক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্য তার মেধা যাচাই করা। এতকিছুর সংস্কার করা হচ্ছে কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে মেধা মূল্যায়ন পদ্ধতিটা সংস্কারের দাবি রাখে বলে মনে হয়। প্রতিটা চাকরির ক্ষেত্র আলাদা। আর কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার সুযোগও আলাদা আলাদা। সমস্যা সমাধানের জায়গাতে আরও একটু জোর দিলে ভালো হয়। সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক লেখাপড়ার গুরম্নত্ব বৃদ্ধি পাবে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখলাম ভারতের জম্মু কাশ্মির রাজ্যের সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) পরীক্ষায় একটি প্রবেশপত্রে একটি গাধার ছবি বের হয়। গাধাটির একটি নাম ছিল। তার জন্মসাল ছিল এবং উপস্থিত হওয়ার সময়ও ছিল। এর আগে একটি গরম্নর নামে প্রবেশপত্র দেয়ার ঘটনা ঘটেছিল। বোঝাই যাচ্ছে বিষয়টি নিতান্ত্মই প্রযুক্তির অনিচ্ছাকৃত একটি ভুল। তবে বিষয়টি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যাই হোক সত্যি কথা বলতে একটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র পাওয়ার পর থেকেই একজন পরীক্ষার্থীর মনে নানা চিন্ত্মার জন্ম নিয়ে থাকে। সেটা যেমন পরীক্ষাসংক্রান্ত্ম তেমনি সেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যাবতীয় বিষয়। আগেই বলেছি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চাকরির পরীক্ষা দেয়ার জন্য নিজের বসবাসের স্থান থেকে বহু দূরে যেতে হয়। আর এ ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়। তাই
দেশের বর্তমান চাকরির বাজারের অবস্থা উন্নতি করতে কারিগরি শিক্ষার দ্রম্নত বিস্ত্মারের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মেধা যাচাই পদ্ধতির সংস্কার সাধন করা জরম্নরি।

অলোক আচার্য্য: কলাম লেখক
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close