পূর্ববর্তী সংবাদ
জন্মদিনের কথাতবু কাজ করি। কথা বলি। ঘরোয়া বৈঠকে আলোচনার আয়োজন করি। অবাক হই, বাঙলা নিয়ে যারা পটর পটর কথা বলেন, তারাও মুখ খোলেন না বৈঠকে বসলে। তাদের কি সত্যিই কিছু বলার নেই? নাকি বাঙলা বানানের সমস্যা নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা নেই? 'ব্যবহারিক বাঙলা ব্যাকরণ' বই লেখা শেশ হলেও প্রেসে দিতে পারিনি। এই সব নিয়ে অনেক কাজের কথা আমার। কিন্তু মানুশ যা ভাবে আর যা কিছু চায়, তার কতটা পায়? ওপরওয়ালার এক ফুঁয়ে সব তুলোর মতো উড়ে যায় কোথায় কে জানে?বেগম জাহান আরা জিবনের পথ পর্যটনের আজ ৮০ বছর পূর্ণ হলো। দেশেই থাকার কথা; কিন্তু আছি সাত সমুদ্র পারের দেশ জার্মানির পোস্টডাম শহরে। এবারের জন্মদিন পালনের কিছু পরিকল্পনা ছিলো মনে মনে। বিরাট কিছু না, কিছু বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বসা আর আমার 'প্রমিত বাঙলা বানান' সম্পর্কিত কাজ নিয়ে একটা কর্মশালার আয়োজন করা। কিন্তু হলো না। মস্ত একটা বিপদ এলো পরিবারে। সব ফেলে উড়ে এলাম এখানে। মানুশ তো মানুশের বিপদে তেমন কিছু করতে পারে না, শুধু সঙ্গ দিয়ে কিছুটা ভার নেয়ার চেশটা করে মাত্র। কথা বলে সময়ের যাতনাকে সহনিয় করতে চেষ্টা করে।
প্রায় তিন মাস প্রস্তুতির পরে আমি আসতে পেরেছি জার্মানিতে। এটা এমনই দেশ। ইচ্ছে করলেই আসা যায় না। প্রস্তুতির তিন মাস আমি প্রতিদিন মেজো নাতি প্রকাশের সাথে দিনে প্রায় ১৫/২০ বার ফোনে কথা বলেছি। অপারেশনের পরদিন ও আমাকে বলেছিলো, 'দিদি দোয়া করো'। ঘুম ঘুম জড়ানো কথা। সেই তিনটা শব্দ তো কথা নয়, যেনো মায়ার বোমা। বুকটা আমার ফেটে গিয়েছিলো। ছলকে উঠছিলো রক্ত। মনে হলো, তখনই উড়ে চলে যাই ওর কাছে। না পেরে কেঁদে কেঁদে সময় কাটিয়েছি আর নামাজ রোজা করে পার করেছি কঠিন সময়। অবাক হয়েছি, এই সময়ে আমাকে সবচেয়ে কাছের মানুশও দু-একজন ছাড়া সাহস বা সান্ত্বনা দেয়নি।
এখন ওর কাছে বসে থাকি আর মন দিয়ে শুসে নেয়ার চেশটা করি ওর কশট। ভুলেই গেছি আমার জন্মদিনের কথা। জানি না শেশ বয়সে কেনো আমার এই পরীক্ষা? পরিবারের কেউ কেউ বলে, নাতির জন্য এতো মায়া কেনো? উত্তর নেই কোনো। মানুশের তো নিজের ছেলেমেয়ের মধ্যেও ভালোবাসাবাসির কম বেশি থাকে। হয়তো ওর জন্য আমার কিছু বেশি টান। প্রথম কারণ ওর মা নেই। আমার সামনে দিয়েই পুতুলটা চলে গেছে। এই জার্মানিতেই। দিতীয় কারণ, আমার কোলে পিঠে বড় হয়েছে ও। ছোটোবেলায় আমি দেশ থেকে কোথাও গেলে ওর অসুখ হয়ে যেতো কাঁদতে কাঁদতে। আরও আরও কারণ আছে, যা বলতে ইচ্ছে করছে না। শুধু জানি, আমাকে ওর কাছে থাকতে হবে।
ঢাকায় কয়েকটা পত্রিকায় উপসম্পাদকিয় লেখতাম। চিন্তাটা গাঢ় করেছিলাম রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার সরকার, বিশেশ করে নোবেল বিজয়ি সুচির কাছে একটা খোলা চিঠি লেখবো। বাঙলাদেশে আগত রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন নিয়েও লেখবো কিছু ধারাবাহিকভাবে। শরনার্থির ব্যথাটা আমরা তো ভুলিনি। তবে ত্রিতিয় বিশ্বের যে কোনো সমস্যাই দ্রুত জটিল হয়ে দাঁড়ায়। কারণও আছে অনেক। শিশু আয়লানের ম্রিত্যুকে কেন্দ্র করে জার্মানিতে হুড় হুড় করে শরনার্থি আসার সময়ও আমি ছিলাম এই দেশে। এখানে শুধু খাওয়া আর পড়ার কোনো রকম ব্যবস্থা নয়, মানবিক সামাজিক এবং সাংস্ক্রিতিক পুনর্বাসনের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়। এদের টাকা আছে, শিক্ষা আছে, পরিকল্পনা আছে, সর্বোপরি একটা দর্শন আছে, তাই এরা পরিকল্পনা করে কাজ করতে পারে। এসব নিয়েও কিছু লিখতে চেয়েছিলাম; কিন্তু হয়নি।
আর আমার নিজস্ব কাজ বাঙলা বানান নিয়ে লেখা তো আছেই। যদিও কেউ কেউ বলেন, বানানের লেখা হলো মৌসুমি লেখা। মানে, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসের বিশয় ওটা। কিছুতেই কাউকে বোঝাতে পারি না যে, বাঙলা ভাশার বিশয়টা লেখাটা মৌসুমি বিশয় না। বাঙলা বানান বা উচ্চারণ নিয়ে কথা বলাটাও মৌসুমি নয়। বাঙলা আমাদের বারোমেসে বিশয়। আমাদের অস্তিত্বের বিশয়। বাঙলা নিয়ে গর্ব করি আমরা। কিন্তু বাঙলা নিয়ে ভাবতে চাই না। বাঙলা গেলো গেলো বলে বিলাপ করি, কিন্তু কি গেলো বা কেন গেল, তা বোঝার চেশটা করি না। আমরা যে কোনোদিন প্রমিত বাঙলা বানানে বাঙলা লেখিনি, বাঙলা বানান যে সংস্ক্রিত বানানের হিজাবে ঢাকা, সে কথা বলেই যাচ্ছি। এমন কি কোনো চেশটা ছাড়াই বাঙলা বানানের যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে আমজনতার হাতে, সেটাও যেন কিছু নয়। ব্যাপারটা এমন যে, কেউ বাঙলা বানান বা উচ্চারণ নিয়ে কিছু বলতেই পারবে না। কেমন এক বুদ্ধিব্রিত্তিক মৌলবাদি আচরণে অতিতের সংস্কারকে আগলে রাখার চেশটায় মগ্ন থাকতে হবে সবাইকে। আমি বিশ্বাস করি, আমার বানান সম্পর্কিত লেখাগুলো একদিন মানুশ খুঁজবে। জানতে চাইবে, কি বলেছিলাম আমি?
আমিই প্রথমে বাঙলা সরবর্নের তালিকা থেকে ঋ-কে বাদ দিয়েছিলাম। আমিই প্রথম প্রমিত বাঙলা উচ্চারণের ক্যাসেট করেছিলাম। আমিই প্রথম মুর্ধা-ণ আর মুর্ধা-ষ লেখা বাদ দিয়েছিলাম। আমিই প্রথম সংস্ক্রিত ভাশাকে বিদেশি ভাশা জ্ঞান করে ততসম বানানেও হ্রস্ব ই এবং হ্রস্ব উ-কার দিয়ে লেখেছিলাম, আমিই প্রথম বাঙলা ক্রিয়াপদের বানানের রূপ্তাতি্বক বানান লেখেছিলাম, আমিই প্রথম বলেছিলাম যে বাঙলা শব্দ কাঠামোতে মধ্যপ্রত্যয় আছে, বলেছিলাম যে রবীন্দ্রনাথের ক্রিয়া সম্পর্কিত প্রবন্ধে ক্রিয়ামুলই লেখতে জানেননি উনি, বলেছিলাম প্রমিত বাঙলা বানান সংস্ক্রিতের হিজাবে ঢাকা; এবং আরও অনেক কিছু বলেছি, লেখেও গেছি। বই আকারে তা প্রকাশিতও হয়েছে। মোত ৯৫টা প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে বাঙলা ভাশা নিয়ে লেখা বই দুই ডজনের ওপরে। যাঁকেই পড়তে দিয়েছি, তাঁরই বাকরোধ হয়েছে। বই পড়ে কিছুই বলেননি। মনে মনে হেসেছি মানুশের অসুয়া কাতরতা দেখে।
তবু কাজ করি। কথা বলি। ঘরোয়া বৈঠকে আলোচনার আয়োজন করি। অবাক হই, বাঙলা নিয়ে যারা পটর পটর কথা বলেন, তারাও মুখ খোলেন না বৈঠকে বসলে। তাদের কি সত্যিই কিছু বলার নেই? নাকি বাঙলা বানানের সমস্যা নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা নেই? 'ব্যবহারিক বাঙলা ব্যাকরণ' বই লেখা শেশ হলেও প্রেসে দিতে পারিনি। এই সব নিয়ে অনেক কাজের কথা আমার। কিন্তু মানুশ যা ভাবে আর যা কিছু চায়, তার কতটা পায়? ওপরওয়ালার এক ফুঁয়ে সব তুলোর মতো উড়ে যায় কোথায় কে জানে?
বাবা বলতেন, জিবন অনেক ছোটো, কিন্তু জিবনের পথ অনেক লম্বা এবং জটিল। সুন্দর পথ বা রাজপথই শুধু চলার পথ নয়। নিবনের পথে অলি গলি আছে অসংখ্য। আছে কানা গলি, ঘশা গলি, ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার গলি। সব মেনে নিয়েই মানুশকে এগিয়ে যেতেই হয়। লম্বা জিবনের বিচিত্র পথে চলার কিছু কিছু অভিজ্ঞতা আমাকে বিস্মিত এবং চরম বেদনা দিয়েছে। সে কথা বার বার মনে পড়ছে আজ। পেয়েছি অনেক, আবার হারিয়েছিও অনেক। দেখেছি, ভালোবাসার কাঙালপনায় একান্ত কাছের মানুশ কি পরিমাণ অমানুশ হয়ে যায়। রক্তের সম্পর্ক বিশিয়ে যায় শুধুমাত্র অসুয়ার জন্য। এ তো গেলো ভেতরের জগত। বাইরের জগতে নতুন গবেশনালব্ধ কাজের জন্য মাথা তুললে বন্ধুরা তো বটেই, শিক্ষকরাও উতসাহী ছাত্র সদ্রিশ মানুশ হলেও তার মাথা চেপে ধরেন। দেখেছি, কেউ কাউকে আলোর পথে যেতে দিতে চান না। আর সেই কর্মপ্রবণ মানুশ যদি হয় মহিলা, যদি হয় সুর্যমুখির মতো আলোর পিয়াসি, তাহলে তার ভোগান্তি হয় চরম। ঘরে বাইরে সবাই তাকে করে দেয় একান্ত একা। মনে করিয়ে দেয়, মহিলাদের মনে এত আকাঙ্ক্ষা থাকতে নেই। মহিলাদের মাথা এত উঁচু ভালো দেখায় না। কি যে কশট পেয়েছি এই বৈরী পরিবেশে। তা বলার ভাশা নেই আমার। বুক ভরা কশট নিয়ে তবু এগিয়ে যেতেই চেয়েছি।
কথা কি, ইতিবাচক পরিবেশে যেভাবে এগিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, নেতিবাচক পরিবেশে তা হয় আরো অনেক গুন কঠিন এবং আঘাত সঙ্কুল। একে আমার বিধিলিপি বলে মানতে কশট হলেও মানতে হয়েছে। আর যা মানা যায় না তাকে মেনে নেয়াও নিজের অস্তিত্বের বিরিদ্ধে মর্মান্তিক এবং নিরন্তর এক যুদ্ধ। তাই করলাম সারাটা জিবন। হায় বিধাতা! অনেক কাজ করার খমতা এবং যোগ্যতা দিয়েছিলে। তা সত্বেও বার বার নিচের দিকের টানে পড়ে গেছি। তবে পড়ে আমি থাকিনি কোনোদিন। জিবধর্মের অদম্য প্রাণ শক্তিতে আবার আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। বার বার নিজেকে বলেছি, পরাজয়ের জন্য আমি জন্মাইনি। জিততে পারি আর না পারি, আমাকে যেতেই হবে এগিয়ে। শংসপ্তকের ভুমিকায় আমি স্থিত থাকবোই।
শেশ কথা বলি, জিবন অনেক সুন্দর। এই বিশ্ব চরাচরে চারদিকে সুন্দরের ছড়াছড়ি। আমরা তুলে নিতে জানি না তাই কাঙালপনায় কাতর হই। জিবনের মোহনায় এসে দেখি, আমার জিবন নদির শাখা-প্রশাখা অনেক ছড়িয়েছে। রক্তের সম্পর্ক প্রজন্ম গড়িয়ে বিস্তিরিত হয়েছে অনেক এলাকাজুড়ে। মনে হয়, প্রথম প্রজন্মের ভালোবাসা সরে গেছে অনেক দূরে। হয়েছে শিথিল অনেকখানি। লম্বা জিবনে হয়তো এই রকমটাই হয়। বেড়েছে নাতি-পুতিদের প্রতি অনেক টান। বয়সিরা বলেন, এটাও নাকি খুব সাভাবিক। আমারও মনে হয় কথাটা ঠিক। তাইতো সারা প্রিথিবি একদিকে আর আমি একদিকে বসে থাকি নাতির কাছে। নাতবউ আর পুতিনের কাছে। ভরে থাকে মন। জানিনা এই প্রিথিবির পর্যটন শেশ হবে কবে? তবে একটাই প্রার্থনা তোমার কাছে হে বিধাতা, একটানে কাছে টেনে নিও। যেমন করে নিয়েছো আমার সোনার পুতুলটাকে। তোমার কাছে যাওয়ার জন্য কোনো আয়োজন যেনো আমার না লাগে হে বিশ্বপ্রতিপালক। অতি সাধারণ এই জিবন যেনো আতি চুপচাপে নিবে যায়। জিবনের যতো বন্ধু সজন প্রিয়জন, সবাইকে জানাই অফুরান ভালোবাসা।

[প্রমিত বাঙলা বানানের দায় লেখকের]

বেগম জাহান আরা : সাহিত্যিক ও অধ্যাপক
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin