হলুদের হরেকগুণহুরণ আজাদী মসলার জগতে হলুদের চাহিদা সর্বাধিক। নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলার মধ্যে অন্যতম হলুদ শুধুমাত্র মসলা হিসেবেই ব্যবহার হয় না বিভিন্ন প্রকার প্রসাধনী, রং শিল্পের কাঁচামাল, কবিরাজি এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এর প্রচুর ব্যবহার হয়ে থাকে। অনেক কবির কবিতার উপমাতেও উঠে এসেছে হলুদ যেমন- হলুদ হলুদ জ্যোৎস্না, হলুদ নদী, হলুদ পাতাঝরা সন্ধ্যা ইত্যাদি। দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি এবং অনুষ্ঠান পর্বেও সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের দেশে বিয়ের অনুষ্ঠান শুরম্ন হয় বর-কনের গায়ে হলুদ ছোঁয়ানোর মধ্যদিয়ে, এ ছাড়া যেন বিয়েই সম্পন্ন হয় না। হলুদের অনুষ্ঠান পর্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক কবি-সাহিত্যিক রচনা করেছেন বিখ্যাত সব গান এবং কাব্য। এর মধ্যে বহুল জনপ্রিয় একটি গান 'হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মৌ'। এ ছাড়া বহু রকমের হলুদের গান 'হলুদ উৎসবে' গাওয়া হয়ে থাকে।
আদা পরিবারের তরহমরনবৎধপবধব এক প্রকার গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের শিকড় বা মূল হলো হলুদ। বৈজ্ঞানিক নাম- ঈঁৎপঁসধ ষড়হমধ. এরা বহুবর্ষজীবী গাছ। ভারতবর্ষে প্রায় ২৫০০ বছর ধরে হলুদের ব্যবহার হয়ে আসছে। যা এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রাচীনকালে প্রথমদিকে শুধু কাপড়ে রঙিন ছাপানোর কাজে হলুদ ব্যবহার করা হতো। এরপর আস্ত্মে আস্ত্মে বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ঔষধি গুণের বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রকাশ পেতে থাকে। তখন থেকে রান্নার রং ও স্বাদ বাড়াতে এবং বিভিন্ন ধরনের রোগের ওষুধ হিসেবে হলুদের ব্যাপক ব্যবহার শুরম্ন হয়।
হলুদগাছ বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে। এই গাছ দেখতে অনেকটা কলাগাছের মতো, দেখলে মনে হয় ছোট জাতের কলাগাছ। কা-ের রং হালকা সবুজ এবং ৬-৭ ইঞ্চি লম্বা হতে পারে। হলুদের পাতা লম্বাটে, পাতার রং হালকা সবুজ। এর কা-ের মাঝখান থেকে ফুল বের হয়, একটা গাছে একগুচ্ছ ফুলই ফোটে। ফুল থেকে ফল বা বীজ হয় না। হলুদ অঙ্গজ-প্রজননের মাধ্যমে বংশবিস্ত্মার করে থাকে, এর প্রধান ব্যবহারযোগ্য অংশ হলো এর মূল। মূলের গায়ে শাখা মূল থাকে, দেখতে অনেকটা আদার মতো। হলুদের ওপরের গায়ের রং বাদামি ধূসর, ভেতরের রং কমলা মিশ্রিত হলুদ। কাঁচা অবস্থায় এটি নরম এবং রসালো থাকে। এর ফুল বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে, তার মধ্যে সাদা ফুলের হলুদগাছ বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া আরও আছে হালকা গোলাপি, লাল ও সাদার সঙ্গে গোলাপি লাল এবং অন্য রঙের মিশ্রণ।
বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায় হলুদ জন্মে। এর মধ্যে রাজশাহী, নওগাঁ, পাবনা, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, নীলফামারী, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য জেলাগুলোয় এর ব্যাপক চাষাবাদ হয়। আমাদের দেশে ফসলের জমিতে বা বসতবাড়ির আশপাশে হলুদের চাষ করা হয়ে থাকে। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই হলুদের চাষ করা যায়। কিন্তু এর চাষের জন্য উর্বর দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি বেশি উপযোগী। পানি জমে না এমন জমিতে এটি ভালো জন্মে, এই কারণে পাহাড়ি অঞ্চলে এর ব্যাপক ফলন হয়। হলুদ চাষের জন্য সমপরিমাণ আলো ছায়াযুক্ত স্থান ভালো। ছায়াযুক্ত স্থানেও হলুদ জন্মে, তবে ফলন কম হয়। উঁচু জমি এর চাষের জন্য ভালো। হলুদ চাষে ঝুঁকি কম, সেজন্য একবার শুধু লাগাতে পারলে বেশি যত্নের প্রয়োজন হয় না। আমাদের দেশে ডিমলা ও সিন্দুরী নামে দুটি উচ্চফলনশীল জাত রয়েছে। চৈত্র মাসের শেষ হতে বৈশাখ মাস পর্যন্ত্ম হলুদ রোপণ করার সময়। জমি খুব ভালো করে ২-৩ বার চাষ দিয়ে মাটি ঝুর ঝুরে করে হলুদ চাষের উপযোগী করতে হয়। উন্নতমানের বীজকন্দ বেছে নিতে হয় লাগানোর জন্য। সাধারণত হলুদ লাগানোর ৯-১০ মাস পর পাতা শুকিয়ে গেলে এটি সংগ্রহ করা হয়।
হলুদ তোলার পর পাতা, শিকড়, কা-, সব কেটে পরিষ্কার করে এর কন্দগুলো ৩-৪ বার পানি দিয়ে ধুয়ে আলাদা করতে হয়। এরপর যেখানে রোদ না লাগে এমন জায়গায় রেখে পাতা দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। এভাবে ২-৩ দিন হলুদের ঘেমে যাওয়া পানি ঝরানো হয়। এই পদ্ধতিকে হলুদের ঘাম ঝরানো বলা হয়ে থাকে। উঠানোর ৩-৪ দিনের মধ্য সিদ্ধ করতে হয়, তা না হলে এর কন্দ পচে যেতে পারে। হলুদের কন্দের আকারের ওপর নির্ভর করে কতক্ষণ সিদ্ধ করতে হবে। এই জন্য ভিন্ন ভিন্ন আকারের কন্দ বেছে আলাদা করে নিতে হয়, এবং কতক্ষণের মধ্যে সেগুলো সিদ্ধ হবে সেই সময় অনুযায়ী সিদ্ধ করা হয়। সাধারণত ১ থেকে ৩-৪ ঘণ্টাও লাগতে পারে সিদ্ধ করতে। মাটি বা লোহার পাত্র হলুদ সিদ্ধ করার জন্য বেশি উপযোগী। সিদ্ধ করার পরপরই ভালোভাবে রোদে শুকাতে হয় প্রায় দুই সপ্তাহ। এরপর হলুদ মসলা হিসেবে খাওয়ার উপযুক্ত হয়। পরের বছর লাগানোর জন্য এর সতেজ কন্দ বিভিন্ন উপায়ে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে।
ভেষজ ও পুষ্টিগুণে গুণান্বিত হলুদ। এর গুণাগুণ নিয়ে যুগ যুগ ধরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়ে আসছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া একটি বিশেষ তথ্য হলুদে 'কারকিউমিন' নামক বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদান অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিবায়োটিক যা বিভিন্ন অসুখের সংক্রমণকে দমন করার ক্ষমতা রাখে। 'কারকিউমিন' হলুদে বেশি আর আদায় স্বল্প পরিমাণে থাকে। প্রত্যেক মানুষের ত্বক আলাদা ধরনের। ত্বকের অধিকাংশ সমস্যা সমাধান করতে হলুদে থাকা কারকিউমিনের অবদানের তুলনা হয় না। যে কোনো ত্বকের সমস্যায় কাঁচা হলুদ বাটা বা শুকনো গুঁড়ো হলুদ বিভিন্ন দ্রব্য যেমন- চন্দন, চালের গুঁড়ো, ডালের গুঁড়ো, দুধের সর ইত্যাদির সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। ত্বকে কখনো সরাসরি হলুদ লাগানো উচিত নয়। কারণ, অনেকের হয়তো এতে অ্যালার্জি থাকতে পারে। সেই জন্য হাতে বা পায়ে সামান্য একটু লাগিয়ে পরীক্ষা করে নিলে ভালো হয়। হলুদে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে প্রচুর ক্যালসিয়াম, লৌহ, ক্যারোটিন, আমিষ, এবং চর্বি রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী নানা সংক্রামক রোগ দমন করতে হলুদ অন্যতম কার্যকর ও মঙ্গলকর প্রাকৃতিক উপাদান।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin