পূর্ববর্তী সংবাদ
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও উপন্যাসের সৃজনশাহমুব জুয়েল নৃশংস হায়েনার ছোবল মুহূর্তে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সম্প্রীতির তৃণভূমিখ্যাত বাঙালির স্বদেশ। বাঙালি প্রতিবাদমুখর হয়ে হায়েনার ওপর ছুড়ে মারে প্রাণস্পন্দন অস্ত্র। তাদের ভাষা, তাদের গতি প্রকৃতি পরিবেশ, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা এক ও অভিন্ন। তবে যাদের সাম্প্রদায়িক সীমাবদ্ধতা ছিল। তারা পাকিস্ত্মানবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতার বিষবৃক্ষে বিকশিত ছিলেন। সে মূল থেকে তারা এবং তাদের দোসররা উঠে আসতে পারেনি। ভাষা ও স্বদেশ জাগরিত করার নিমিত্তে সৃষ্টিশীল লেখকের ভূমিকা ছিল তীব্র ও প্রখর।
১৯৪৭ দেশ বিভাগ হলো। মানচিত্র ছিঁড়ে গেল প্রাক-ভারত এবং প্রাক-পাকিস্ত্মান দুটিই বিচ্ছিন্ন পাতা। কেবল একটি নয়। এবার দাঙ্গাটা বিঁধলো নিজেদের বৈঠকখানায়। বৈঠকখানাটি পূর্ব-পশ্চিম। পশ্চিমারা উর্দুতে, পূর্বদিকরা বাংলায় কথা বলে। তারা তাদের অধিকারে উন্মুখ। তা কী আ-মরি বাংলা ভাষা। মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা। এবার কী হবে, দাঙ্গা কী নিয়ে, ভাষা নিয়ে। ভাষা, যা ইতিহাসে বিরল। ভাষা যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার। তা নিয়ে তৈরি হয় দুটো মতাদর্শ। নরমপন্থী ও চরমপন্থী। উর্দু ভাষা সেটিকে বরণ করায় সম্ভব নয় বলে তখন প্রচুর আরবি, ফারসি তথা উর্দু শব্দের আমদানি করা হয়। বাংলাকে উর্দুর সমপর্যায় টেনে নেয়ার প্রচেষ্টা তুঙ্গে ওঠে। যা চরমপন্থীদের কাজ। আর নরমপন্থীরা মনে করে আমরা যেহেতু পাকিস্ত্মান অর্জনে সফলকাম হয়েছি তখন পূর্বপাকিস্ত্মানের ভাষা ও সাহিত্যে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তবে তা আজই নয় ধীরে ধীরে। সময় থেমে থাকল না। এলো '৫২ সাল। অধিকারের প্রশ্নে পাল্টাপাল্টি অ্যাটাক। ভাষাগত দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছলো। বাংলা হবে রাষ্ট্রভাষা, রঞ্জিত হলো রাজপথ। ভাষা বাংলা হয়ে উঠল, প্রাণ ফিরে পেল। ভাষাকে অনুষঙ্গ মনে করে সৃষ্ট হলো সাহিত্য। পাকিস্ত্মানি শোষণ ধীরে ধীরে ছেদ পড়তে শুরম্ন করল পদছায়ায়। বঙ্গবন্ধুর বজ্রধ্বনি তার সহচর ও আমজনতা গর্জে উঠল। বাকি ছিল দোসর। দোসররা কাঁধ মেলালো কিন্তু দাবানো গেল না। দীর্ঘ নয় মাস দহনের পর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র তৈরি হলো। বিজয় পতাকা উড্ডীন হলো বাংলার সুদূরে। সমকালীন সাহিত্যের অনুষঙ্গ হলো মুক্তিযুদ্ধ। স্রোতে গা ভাসাতে লাগলেন ঔপন্যাসিক শ্রেণি। তারা হলেন- আনোয়ার পাশা, শওকত ওসমান, সেলিনা হোসেন, হুমায়ুন আহমদ রিজিয়া রহমান, রশীদ করিম, রশীদ হায়দার, আমজাদ হোসেন, মাহমুদুল হক, রাবেয়া খাতুন, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ।
অসুস্থ রাজনীতির কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট সাহিত্যে দরিদ্র হয়ে ওঠে। কারও দ্বারা পঙ্গুত্বও বরণ করে। সে ইতিহাসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে প্রগতিশীল লেখকের নিরলস শ্রম দিতে হয়। কিন্তু ঘরকুনোদের দ্বারা বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়। সংযোগ ঘটে নানাজনের।
কেউ কেউ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য খোলস বদলে নিজেকে সাময়িক পরিবর্তন করেন। পক্ষ, বিপক্ষ সুবিধাপক্ষীয় রেখায়িতপক্ষ হিসেবেও যায়।
তাতে একটি গল্পের অবতারণা প্রাসঙ্গিক হতে পারে বটে। না হলে এই অংশটুকু টেনে যান- তাতে আপত্তি নেই। ফুটবল খেলা চলছে বল একটি। সেটি নিয়ে মাঠে প্রত্যেকেই দৌড়াচ্ছেন। রেফারিও পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছেন। একজন দর্শক খুব খেয়াল করলেন। হঠাৎ মাঠের মাঝখানে এসে বললেন। আরে রেফারি প্রত্যেককে একটি করে বল দিয়ে দাও না। তাহলেই তো কাড়াকাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। তাতে কী হবে কে জানে।
তো যেটি বলা দরকার। বাংলাদেশ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। এমন গল্পভাষ্যের নিরিখে কী হতে পারে। তা জানা নেই।
বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের প্রধান স্রোতের পাশে সৃষ্ট সাহিত্য স্রোত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। যুদ্ধকালীন সময় ও উপন্যাসিকের বাস্ত্মব অভিজ্ঞতা চেতনার গলগ্রহে উঠে আসে। উপন্যাসিক বাস্ত্মতার ওপর ভর করে চারপাশে নেত্র মেলেন। দেখেন, ভেসে যাওয়া লাশ, ছিটকে পড়ে থাকা লাশের গন্ধ, মাতৃহারা সন্ত্মানের আকুতি, মা-হারা শিশুর হাহাকার, বৃদ্ধজনের ডেকুর। ঔপন্যাসিক ধারণ করেন চিত্রঅন্বেষীর মতো তুলির ক্যানভাসে। গড়ে তোলেন যুদ্ধকালীন ইতিহাসের চালচিত্র। সে নিরিখে বাংলাভাষায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস-
রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭৩) লেখক আনোয়ার পাশা। উপন্যাসে ঘটনা ছেয়ে গেছে '৭১ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত্ম। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ভয়াল ২৫ মার্চ রাত থেকে ২৮ মার্চ রাত পর্যন্ত্ম। কী হয়েছিল সেদিন। লেখকের কলমে কী তুলে ধরা হলো। বর্ণনা প্রসূনে আঁতকে উঠতে হয় হয়তো। এখনো ওঠেন। সেদিন গভীর রাত- পাকিস্ত্মানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পৈশাচিক হামলা। সে প্রেক্ষাপটকে লালন করে উপন্যাসে দুটো ধারা প্রবাহিত হয়েছে। একদিকে ব্যক্তিচরিত্রের সংঘাত অন্যদিকে সেই সংঘাতের ভেতরে নির্মম বাস্ত্মব নিরীক্ষণ। এ ধারাকে টানটান করে লেখক সৃজন করেন ঔপন্যাসিক বাস্ত্মবতায়।
উপন্যাসের আখ্যান ভাগ বিশেস্নষণ করলে দেখা যায়। কেন্দ্রীয় চরিত্র সুদীপ্ত শাহীন। পেশা শিক্ষকতা, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্ত্মানি সৈন্যদের ভয়াবহ হামলা। প্রাণ বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার ছেড়ে স্ত্রী-কন্যাসহ আশ্রয় নিয়েছেন তার বন্ধু আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা ফিরোজ শাহের বাড়ি। যেখানে দুদিন অবরম্নদ্ধ ছিলেন। এ থাকাটা অনিরাপদ ছিল। তাই আবার বেরিয়ে পড়েন আশ্রয়ের খোঁজে। অপরিচিত বাড়িতে আশ্রয় প্রার্থনা ও রাত্রিযাপন করেন।
সুদীপ্ত শাহীন উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে ছিল উদার ও অসাম্প্রদায়িক কিন্তু মধ্যবিত্তের চাকা তাকে চেপে ধরেছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের এত বড় ঘটনা তার চেতনাকে নাড়া দিলেও সাহসী করেনি।
সুদীপ্ত চরিত্রের পাশাপাশি বেশকিছু অপ্রধান নারী পুরম্নষ চরিত্র রয়েছে। সুদীপ্ত শাহীনের বন্ধু ফিরোজ যে আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা। মালেক ও খালেক হলো বুদ্ধিজীবী। সুদীপ্তের স্ত্রী আমিনা ও ফিরোেেজর স্ত্রী বুলা স্বল্পসময়ের উপস্থিতি পাঠককে মুগ্ধ করেছে।
সাহসী প্রতিচ্ছবি হাশেম শেখ ফিরোজের ভাগ্নে তিনি পুলিশে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চে রাজারবাগে ইপিআর বাহিনীতে থেকে পাক-সেনাদের সশস্ত্র হামলার মোকাবেলা করেন। কিন্তু হাশেম কি শিক্ষিত ছিলেন। না। তবে তার মধ্যে উপলব্ধি ছিল। তাই প্রাণপণে প্রতিরোধের নিরন্ত্মর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তাই মামা ফিরোজের উদ্দেশ্যে হাশেম শেখ বলেন-
'আপনারও এখানে থাকা চলবে না মামা। জামায়াতে ইসলাম ও মুসলিম লীগের সঙ্গে সেনাবাহিনীর শলাপরামর্শ চলছে শুনলাম।... চার শ্রেণির মানুষকে ওরা দেশ থেকে নির্মূল করবে... বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী লীগার, কমিউনিস্ট ও হিন্দু।'
এ উক্তির মধ্যদিয়ে হাশেম শেখের পাকিস্ত্মানি শাসক শ্রেণির মনোভাব ঔপন্যাসিক সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। ফলে চরিত্রটি হয়েছে বাস্ত্মব ও ঐতিহাসিক।
ভয়াল ২৫ মার্চ। হায়েনার ছোবল এদেশীয় শকুনের তীব্রনখর নির্মম বাস্ত্মব দৃশ্য। বুকপেটে চৌচির। কিনারাহীন মাতৃপীঠ। ঝর্ণার মতো জল গড়িয়ে পড়ছে। অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে মায়ের আঁচল। মাতৃদুগ্ধ শিশু বোধহীন মায়ের স্ত্মনে মুখ বুলাচ্ছে। আর্তচিৎকারে প্রকম্পিত হয়েছে। দালালরা হই-হুলেস্নাড় করছে। নদী কান্না করছে লাশের বোঝায়। বন হয়েছে নিঃশ্বাসশূন্য। তখনো মিটিমিটি হাসছে আলখালস্না দালাল।
ঔপন্যাসিক আনোয়ার পাশা সে দৃশ্যের অবতারণা করতে গিয়ে ঢাকা শহরের চিত্র শৈল্পিক ধারাভাষ্যে নিখুঁত শৈলীতে এঁকেছেন। ভাগ্য বড়ই নিষ্ঠুর... ১৪ ডিসেম্বর দেশীয়দের যোগসাজশে পাকবাহিনী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আহ! আমরা কী পেলাম। আরও কত কী চেয়েছিলাম, ভাগ্য বিড়ম্বিত।
শওকত ওসমানের 'জাহান্নাম হইতে বিদায়' (১৯৭১)। এ উপন্যাসটি একাত্তরের সেপ্টেম্বরের দিকে লেখা। 'দেশ' পত্রিকার সম্পাদক- শ্রী সাগরময় ঘোষ-এর অনুরোধে লেখা হয় এ উপন্যাস। উপন্যাসের মূল চরিত্র গাজী রহমান প্রাণভয়ে পার্শবর্তী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। যা যুদ্ধকালীন বাংলাদেশেরই চিত্র। আর ২৫ মার্চ পরবর্তী বাংলাদেশে পাক-সেনাদের আক্রমণে যে বিধ্বস্ত্ম অবস্থা তৈরি হয়েছিল তা জাহান্নামেরই চিত্রস্বরূপ। তাদের আক্রমণে অসহায় নিরস্ত্র বাঙালি কতটা বিপদগ্রস্ত্ম হয়েছিল তা বলার অতীত। সব ঢাকানগরী তৈরি হয়েছিল মৃতু্যপুরীতে। গাজী রহমান নরসিংদী ছাত্রের বাসায় পালিয়ে আসা অনেকের মতোই একজন। অনিরাপদ মনে করে স্থানান্ত্মরিত হওয়া। তার বন্ধু রেজা আলী বিশ্বস্ত্ম লোক মারফত ভারতে নিয়ে আসেন। এ চিত্র বন্ধুপ্রতিম পার্শবর্তী রাষ্ট্র ভারতের সহায়তার দৃষ্টান্ত্ম। যা বাস্ত্মবমুখর ছিল। যুদ্ধ ছিল নয় মাস। এ উপন্যাসের কাহিনীপ্রবাহ দেড়মাস। এ স্বল্পসময়ের অস্থিরতা যুদ্ধপীড়িত বাংলাদেশের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে লেখকের শক্তিমত্তার পরিচয় বহমান। যা উপন্যাসের গতিপ্রকৃতিতে দৃশ্যমান। উপন্যাসে কেবল গাজী রহমান নয়- আরও বেশকিছু চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আজিমগঞ্জবাসী মজিদ দর্জি। যিনি আহত বিচ্ছিন ১৫ জনের সাথেরই একজন। গুলি লেগেছে উরম্নতে। তবু অদম্য সাহস সঞ্চয় করে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে...
'বাঁচুম না তো বুঝছেন। এক কাম করেন। আমাকে উঁচু টিবির গাছের গুঁড়ির লগে বসাইয়া দ্যান আমি লড়াই দেখুম। দেখুম আমার দেশের মানুষ কেমন লড়ে তয় মরণেও সুখ'।
এখানে গ্রামবাসীর বীরত্ব, অকুতোভয় মানসিকতার প্রকাশ। দৃপ্ত দেশপ্রেম যা দেশের প্রতি মমতার ইঙ্গিতস্বরূপ। যা শওকত ওসমানের আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারে সাধারণ বাঙালির স্বদেশপ্রীতি উঠে এসেছে।
যুদ্ধকালীন লুটেরা, বেইমান শ্রেণি, যারা পাকিস্ত্মানিদের সহযোগী। যা শুনে বৃদ্ধ চকিত হয়েছে।
'আমাগো মুজিবুর রহমান যে কইছে পশ্চিম পাকিস্ত্মান গোশত খায় আর আমরা তার হাড় চুষি।'
উপন্যাসের কাহিনী পড়ে বোঝা যায়। সত্যিকারের দেশপ্রেমী, ঠিক থাকা বড় দায়। লেখক শব্দে, বচনে ইঙ্গিতধর্মিতায় যুদ্ধকালীন বিষয় খুঁড়ে খুঁড়ে চোখের সামনে দৃশ্যমান করেছেন। বাস্ত্মবদৃশ্যে হতবম্ব হতে হয় কাঁদতে হয় ঘৃণাও জন্মে। অস্বস্ত্মিকর আত্মকথন দন্ত্ম অসুরিক চিৎকার, রাক্ষুসে বিনাষ্টি মনোভাব তাড়া করে। যা এখনো করে। প্রকরণে যা বিবচনার অতীত হলেও বলা চলে লেখকের চিন্ত্মা মননশৈলী কালোত্তীর্ণ হয়েছে। তার উপন্যাসিক কৃতিত্ব অনন্য। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের ধারাবাহিকতায় তা লক্ষণীয়। তার অন্যান্য উপন্যাস- দুই সৈনিক (১৯৭৩), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩)। নেকড়ে অরণ্য উপন্যাসের ধারাভাষ্য এতটা মর্মস্পর্শী যা ফুটে ওঠে- তার বর্ণনায়- 'গুদামের পোস্ত্মার ওপর শত শত বস্ত্মা সারি সারি সাজানো থাকত কদিন পূর্বে। আজ সারি সারি মানুষ শুয়ে আছে। একদম। সিমেন্টের ওপর, যাদের মানুষ বললাম তারা শুয়ে আছে মানুষের মধ্যে যাদের মানবী বলা হয়। কেউ সটার্ন। কেউ কুঁকড়ে গেছে কুকুরের মতো।...এখানে অস্ত্মিত্ব আছে এই কথাটাই বড়'।
মুক্তিযুদ্ধ সময়কালে পাকিস্ত্মানি সেনা কর্তৃক সংঘবদ্ধভাবে বাঙালি নারী ধর্ষণ, পাশবিক নির্যাতন ও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে তা তিনি তুলিতে চিত্রাঙ্কন করেছেন। এখানে ভেদাভেদহীন প্রশ্ন অবান্ত্মর। এখানে আছে তনিমার মতো শিক্ষিতা মহিলা, হিন্দু আমোদিনী, রশিদা বিবি, সকিনা, জায়েদা চাষি বউ আরও অনেক। এখানে খবর স্থির, ধর্ষণ অস্থির। লালসায় জীবন বেগতিক। চোখে-মুখে গুলি নিয়ত আগুনে শরীর পুড়ছে। বিপন্ন মানবিকতা বিপন্ন বাংলাদেশ। বিনষ্ট নারীর মান-সম্মান এবং জীবন। লেখক প্রত্যক্ষ করলেন। তাদের পাশে দাঁড় করালেন তনিমা, সকিনা, আমোদিনীকে। যারা আত্মহত্যা করেও প্রতিরোধের সংগ্রামী চেতনা রেখে গেলেন। যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতনের শিকারে পিছু না হটে প্রতিবাদী হোন তারা। যা এখনো জননীর বুকে তাকালে হৃদয় প্রকম্পিত হয়। শিহরণ হয় শিরা-উপশিরায়। এখানে লেখকের দরদ ছিল মসৃন, সৃজন ছিল বোধগম্য।
আমার যত গস্নানি (১৯৭৩) : ঔপন্যাসিক রশীদ করিম। উপন্যাসের কাহিনী শুরম্ন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব থেকে শেষ হয়েছে ২৫ মার্চের পাকিস্ত্মানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ দিয়ে। এ উপন্যাসের কেন্দ্রিক চরিত্র এরফান চৌধুরী। যে বিলাসী লিবিড ক্রিয়া ও আত্মসুখসন্ধানী মানুষ। যার প্রধান কাজ মদপান আড্ডা, নারীলিপ্সু ও আয়েসী জীবনযাপন করা। কিন্তু তার মধ্যেও বাইরে রাজনৈতিক উত্তাপ, শেখ মুজিব ও তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। দুদিকে সাঁটানো হচ্ছে জিন্নাহ ও মুজিবের ছবি। ক্ষমতা হস্ত্মান্ত্মরে অস্বীকৃতি জানায় জিন্নাহ। ৭ মার্চের ভাষণ। মুহুর্মুহু মিছিল রেসকোর্সের দিকে। এরফানের কাছে সে মিছিল-
'মিছিলটা দেখে আমারও মনে হচ্ছে, আজ বুঝি অন্ধেরও চোখ ফুটেছে। যে ছিল খোড়া, তার পায়ে এসেছে চলৎশক্তি; যারা স্বার্থপর চিন্ত্মার ফাঁকে আকণ্ঠ ডুবেছিল, তারাও আজ সুচিস্নাত; যারা দেশপরিহিতের ডাকে এতদিন ছিলেন বধির, আজ তারাও সাড়া দিয়েছে। কবর থেকে যেন উঠে এসেছে মরা লাশগুলো'।
এরফান চৌধুরীর মধ্যে ত্যাগ বা সাধনা নেই। কিন্তু আবেগ অনুভূতি প্রবল ছিল যা এখানে বিবৃত হয়েছে। নাড়া দিয়েছে বাঙালির জাগ্রত সত্তাকে। উঠে এসেছে বাস্ত্মবিক দৃশ্য।
জলাঙ্গী- (১৯৭৪) লেখক শওকত ওসমান। মেঘনা তীরবর্তী অঞ্চলে বাঁকাজলে গ্রাম। সে গ্রাম অবস্থাসম্পন্ন কৃষক তার সন্ত্মান জামিরালি। সে ঢাকায় পড়াশোনা করে। গোলযোগ শুরম্ন হলে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। জামিরালি বাঁকাজলে ফেরে। কিন্তু কী দেখে এখানে গোলযোগ দেখে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন, একাত্তরের মার্চ, উত্তাল সময়। সে উত্তাপ গ্রামকেও স্পর্শ করেছে। জামিরালি গ্রামে ফিরে দৃশ্য দেখে। মনে হয়ে সর্বত্র পরিবর্তনের হাওয়া।
অবেলার অসময় (১৯৭৪) ঔপন্যাসিক আমজাদ হোসেন। যাদের তাড়া করে পাক-বাহিনীর দুঃসহ স্মৃতি। তাই নারী, পুরম্নষ, পত্নী, শিশু, বৃদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান, খ্রিস্টান সবাই পালোনোর চেষ্টা করছে। নৌকায় গাদাগাদি হয়ে বসেছে সেখানে কোনো ভেদভেদ নেই। বাঁচার লড়াই। বিপদসীমা অতিক্রম করার অনিশ্চিত চেষ্টা। যা ফুটে উঠেছে 'বেলা অবেলায়'।
- 'গ্রামকে গ্রাম নিঃশব্দ। খাঁ খাঁ এ তলস্নাটে মিলিটারির ভয়ে কোনো লোকজন নেই। সব বাড়ি-ঘর জায়গা-জমি পুরনো সংসার ফেলে পালিয়েছে। একটা পাখি পর্যন্ত্ম নেই গ্রামে। একটা কুকুর-বেড়ালের শব্দ হয় না কখনও'। ফেরারি সূর্য (১৯৭৪) কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের লেখা। সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উলেস্নখযোগ্য উপন্যাস। এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় অবরম্নদ্ধ ঢাকায় লুটপাট রাজাকারের সহযোগিতা, বিহারিদের লুটপাট আন্ত্মর্জাতিক শক্তি ও সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততার অশুভ সময় চলছে। পীড়িত বাঙালিরা সঙ্গবদ্ধ। তারা বাঁচতে, বাঁচাতে যোগ দিয়েছে মুক্তিবাহিনীতে। গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধি করছে। যা মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত্ম প্রবাহিত হয়েছে। সে নিরিখে বলা চলে উপন্যাসটি সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস।
এ উপন্যাসে একটি বড় পরিবার রয়েছে। যে পরিবারে কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। আবার চাকরির কারণে কেউ কেউ পাকিস্ত্মানিদের পক্ষও নেয়। খালিদের পাকিস্ত্মানপ্রীতি সেদিন নিশ্ছিন্ন হলো। যেদিন পাকসেনারা তার স্ত্রীকে তুলে নেয় এবং ধর্ষণ করে। পক্ষেই ছিল। উপলব্ধি করল বাঙালির আনুগত্য ও বিশ্বস্ত্মতা কীভাবে পরিশোধ করল পাকসেনা। হতবম্ব হয়ে পড়ল সে।
অন্যদিকে উপন্যাসে শেষে দেখি ছড়িয়ে পড়ে খালেদের ছোট বোনের সন্ত্মান জন্ম দেয়ার খবর। যা রক্তাক্ত নতুন জাতির জন্ম ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভু্যদয়ের ইঙ্গিত বহন করে।
'খাঁচায়' (১৯৭৫) কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দারের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৩ দিনের ঘটনাবলি স্থান পেয়েছে। চরিত্রের ভূমিকায় একটি টিয়া পাখি। যুদ্ধকবলিত বাংলাদেশ তথা ঢাকা শহর খাঁচা সদৃশ। চারদিকে বন্দি মানুষ বাঁচতে চায়। কিন্তু মুহুর্মুহু গুলি গ্রেনেড সাইরেন তাদের দম বন্ধ হয়ে আসে। রেডিও আকাশবাণীর চারপাশে কান পেতে গভীর আগ্রহে শোনে। এভাবেই তাদের দিনাতিপাত হয়। খবরে কিছুটা স্বস্ত্মি পায়। সময়ে অসময়ে গোলাবারম্নদের শব্দ ভেসে আসে। এখানে উলেস্নখযোগ্য চরিত্র জাফর। অবরম্নদ্ধ বাঙালির জীবন খাঁচার পাখির মতো ছটপট করে। ধীরে ধীরে অন্ধকার কেটে যায়। জাফররা নিশ্চিত হয়, বিজয় সমাগত। খাঁচা অবমুক্ত হতে যাচ্ছে। রাস্ত্মায় বিদেশি সাংবাদিকের মুখে শোনা যায় জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করতে প্রস্ত্মুত। পাক-সেনা স্বদেশে ফিরে যাচ্ছে। ভারবাহী পশুর মতো ক্লান্ত্মদেহে হাঁটছে। আশপাশে তাকায় না। তাদের পিঠে মারণাস্ত্রের ছোবল। তাদের চেহারায় অসহায়ের চিহ্ন। এবার জাফর পাখিটি মুক্ত করে দেয়। অবরম্নদ্ধ থেকে মুক্ত হয় বাঙালি ও বাংলাদেশ। খাঁচার পাখির সঙ্গে প্রতীকী চরিত্রের বর্ণনা নান্দনিক হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রা করেছে নতুন সম্ভ্ভাবনায়।
শ্যামলছায়া (১৯৭৬) লেখক হুমায়ুন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধের খ-িত রূপায়ন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা কায়দায় হানাদার পাকিস্ত্মানি সৈন্যবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থানা আক্রমণের গল্প। চার যুবক- জাফর, হুমায়ুন আহমদ, আনিস, মফিজ। তাদের পথপ্রদর্শক হাসন আলী। পথে নানা ঘটনার মিশ্রণে। নৌকায় করে তাদের নিয়ে যাচ্ছে। উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক বর্ণনা তাদের অন্ত্মর্ময়তা, অনুভূতি উন্মোচনের পাশাপাশি যুদ্ধকালীন বহির্বাস্ত্মবতা ও সীমিতভাবে উঠে এসেছে।
হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬) লেখক কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। লেখক বাস্ত্মব ও কল্পনার সংমিশ্রণে গঠিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উলেস্নখযোগ্য উপন্যাস। উপন্যাসটি ১৯৭১-এ যুদ্ধকালীন গ্রামীণ জনপদের চিত্র। হাঙর হলো পাকবাহিনী যারা নির্বিচারে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বাঙালির বুকে। মূল চরিত্র বুড়ি। যার স্মৃতিচারণে সমকালকে বোঝা যায়-'
যুদ্ধ কি? যুদ্ধ কখনো দেখিনি বুড়ি। গফুরের সঙ্গে বিয়ের কদিন পর শুনেছিল দেশ স্বাধীন হয়েছে।'
বুড়ি অক্ষম। কিন্তু তবুও তার মনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের তীব্র দহন রয়েছে। বোবা ছেলে রইস। মিলিটারির আগমনে রইসকে রাইফেল হাতে বের করে দেয়। হঠাৎ বিকট শব্দ আসে। বুঝতে বাকি থাকে না, পাক সেনারা তার প্রাণটা নিয়ে চলে গেছে। হঁ্যা, বাইরে নেমে দেখে কলিমের জারম্নল গাছের নিছে রইসের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। বুড়িকে মান্য করত হলদী গাঁয়ের ছেলেরা তাই যুদ্ধের আগে বুড়ির কাছে দোয়া নিতে আসে। একদিন সন্ত্মানহারা বুড়ি গাঁয়ের সব ছেলের মা হয়ে ওঠে।
যাত্রা (১৯৭৬) লেখক শওকত আলী। এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর কিনার হয়ে পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামের স্কুল ঘরে।
যাত্রা উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের বাস্ত্মবচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। উৎকণ্ঠা, মৃতু্যভয়, রেডিও-তে খবর শোনা, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যাত্রা কিন্তু শেষের দিকে স্কুল ঘরের সবাই পালিয়ে গেলেও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা হাসান ও লীলা নদীর এপারে শত্রম্নর প্রতীক্ষায়-
জখম শরীর, একহাতে রাইফেল জানালা দিয়ে দেখে নদীর ওপারে তুমুল গুলি হচ্ছে গ্রাম পুড়ছে, হাট জ্বলছে, খামার বাড়ি জ্বলে ছারখার। দুজনের চোখে লেলিহান শিখা, ধোঁয়াশে এবং আত্মচিৎকারে গগনে বিবর্ণ সূর্যোদয়।
সে সূর্যোদয় হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ।
জীবন আমার বোন (১৯৭৬)। লেখক মাহমুদুল হক। আমজাদ হোসেনের- অস্থির পাখিরা ( ১৯৭৬) রিজিয়া রহমানের- রক্তের অক্ষর (১৯৭৮)। সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান (১৯৯০), নীল দংশন। সৈয়দ শামসুল হক সে ধরনের ্তঔপন্যাসিক যার প্রতিটি উপন্যাসে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চালচিত্র উঠে এসেছে। তা থেকে বোঝার অবসর থাকে না যে তিনি বঙ্গবন্ধু ও স্বদেশকে কতটা বুকে ধারণ করতেন, লালন করতেন। সত্যিই তা পাঠ না করলে আদৌ জানা সম্ভবপর নয়। শুধু অনুধাবনীয়।
সত্তর দশকে উলিস্নখিত উপন্যাস ছাড়াও সাময়িক পত্রিকা সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও লিটলম্যাগ আলোচনায় বেশকিছু মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের সন্ধান মেলে।
রাজনীতি ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অভিন্ন কিছু নয়। মতভেদন চিহ্ন। বাংলাসাহিত্যের অবিভক্ত অংশ। এটিকে যতই কাটাছেঁড়া করা হোক ইতিহাসের মুখে যে আগুন তা সময়ের রেখায় জ্বলে উঠবেই। তা কেউ নেভাতে পারবে না তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি কলমযন্ত্র। তুলিতে অঙ্কিত হয়েছে সাহিত্যের অন্যতম শাখা উপন্যাস। সত্তর দশকে রক্তাক্ত সময়, সমাজবাস্ত্মবতা, যুদ্ধের অন্ধকার অবস্থা, সাধারণ মানুষের মধ্যে নানারকম ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। মানসচিন্ত্মায় ক্রিয়াশীল হয়ে এগিয়ে চলছে সাহিত্যের শাখা-প্রশাখা। এখনো গুলির শব্দ ছোটে, পোড়া গন্ধ ভাসে, দালালরা ওঁৎ পাতে পতাকার রং খসে, ধোঁয়াটে পরিবেশ তৈরি করে চেতনার বাতিঘরে। সজাগ থাকতে হবে সময়ের উচ্ছ্বাসে।
বস্তুত, চেতনার মন্ত্রধ্বনিতে উজ্জীবিত হয়ে সেদিন যে কলম বন্দুকের চেয়ে মারমুখী ছিল, তাতে উপন্যাস ছাড়া প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার গ্রন্থ রচিত হয়। আজ প্রজন্ম উচ্ছ্বাসে উপন্যাসসহ তার চেয়েও বেশি লেখনী শক্তিমত্তার পরিচয় বহন করা উচিত। তবেই সাহিত্যে নতুনমাত্রা তৈরি হয়ে যূথবদ্ধ হবে বাঙালি উৎসজাত হিসেবে- বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। খুলে যাবে প্রজন্ম তোরণ।
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close