বৈশাখের অন্দরমহলে তাকানোনববর্ষ বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসব, এই উৎসবই তো নীরবে ঘোষণা করে আমরা সবাই যেন ভালো থাকি একটা বড় রঙিন ছাতার তলায়। নববর্ষ সবার জীবনে আনুক আনন্দ, আর সবার জীবনে আগামী বছরের জন্য পূর্ণতা, বিদ্বেষ নয়_ ভালোবাসাআবুল কালাম মনজুর মোরশেদ চৈত্রের শেষে ঝড় আর বৃষ্টিপাত বাংলাদেশের নিয়মিত একটা ঘটনা। এ সময়ের কালবৈশাখী গ্রামের টিনের বাড়ি ল-ভ- করে দেয়। ঝড় যদি একবার আঘাত করত তাহলে গ্রামের সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ঠিক করে নিতে পারত। কিন্তু বৈশাখ আসতে না আসতে রুদ্র কালবৈশাখী আবার বাড়ি-ঘরের ওপর আঘাত করে নিজের দম্ভ প্রকাশ করে আনন্দ অনুভব করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করত না। সমাজের প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে কালবৈশাখীর বোধহয় একটা শখ্যতা আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও চৈত্রের ওই ঝড়ের বর্ণনা দিয়েছেন।
বৈশাখের প্রচ- রুক্ষতা বাংলাদেশের একশ্রেণির মানুষের কাছে আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। একদিকে নতুন পোশাকের আভিজাত্য, অন্যদিকে রাস্তার বৃহৎ অংশজুড়ে বর্ণিল শোভাযাত্রা। নববর্ষের প্রথম দিনে নতুন জামা-কাপড় পরার মধ্যে একটা আনন্দ আর আদর্শের প্রতিফলন আছে। নতুন বছরকে নতুন পোশাক দিয়ে বরণ করার মধ্যে বারো বছরে জীবনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেন জ্বলমান থাকে_ তারই একটা প্রকাশ, একটা আন্তরিক অভিব্যক্তি আর আনন্দে থাকার ইচ্ছা মনের মধ্যে সঙ্গোপনে ধরে রাখা।
রাস্তায় বাজনা বাজিয়ে বিভিন্ন মূর্তি নিয়ে হেঁটে যাওয়ার মধ্যে একটা গোপন আনন্দের অভিব্যক্তি আছে। নিজেদের মানসিকতা বিভিন্নভাবে প্রকাশের এ আনন্দ-উচ্ছ্বাস সাধারণ মানুষও উপভোগ করতে দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু এই জৌলুসের সঙ্গে আপামর জনসাধারণের মনের অভিব্যক্তি থাকে না। রাস্তার এককোণে দাঁড়ানো একশ্রেণির খুবই সাধারণ মানুষ, আধধোয়া কিছুসংখ্যক শিশু ভাবে, আমাদের জীবনেও যদি এমন বর্ণোজ্জ্বল আনন্দ থাকত, থাকত গায়ে একটা নতুন জামা_ তাহলে আমরাও নববর্ষের এই আনন্দকে হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করতে পারতাম।
বৈশাখ আসে তার রুদ্রমূর্তি নিয়ে। তার জন্য বৈশাখ দায়ী নয়। দায়ী সম্রাট আকবরের সভাসদ, যিনি সম্রাটের আদেশে বাংলা বছর তৈরি করেছিলেন এই রুদ্র রূপকে সামনে রেখে। তারা নিজেদের প্রয়োজনে বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন আর তা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের জীবনে একটা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। সম্রাট আকবর বৈশাখ মাসে বাংলাদেশ থেকে খাজনা আদায়ের যে ব্যবস্থা করেছিলেন, তা বাংলাদেশের মানুষের জীবনেও পরবর্তীকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের টাকা লেনদেনের একটা স্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়।
পহেলা বৈশাখ বাংলায় নববর্ষ হিসেবে অনেক আগে থেকেই স্বীকৃতি পেয়েছে। এদেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের হাতে সব সময় প্রয়োজনীয় ১৭ পৃষ্ঠার পর
নগদ টাকা থাকত না, অথচ জীবন নির্বাহের প্রয়োজনে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় জিনিস দরকার। জীবনের অভাব পূরণের জন্য মানুষ ধারে জিনিসপত্র কিনে আনত আর মহাজন তার খাতায় জিনিসপত্রের দাম লিখে রাখত বাংলা তারিখ দিয়ে। এই প্রক্রিয়া অনেকাংশে আধুনিককালের ডেবিট-ক্রেডিটের মতো। সারাবছর মাঝে মাঝে ধারে কেনার পর এই ধার শোধ দেয়ার সময় আসত পহেলা জানুয়ারিতে। অনেকে সম্পূর্ণ ধার পরিশোধে অসমর্থ হলে নতুন বছরের খাতার প্রথম পৃষ্ঠায় নতুন করে লিখে রাখতে হতো। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী এই প্রথার ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেছিলেন, আমরা পুরনোর জের আবার নতুন করে লিখে রাখি। অর্থাৎ বাঙালির জীবনে প্রকৃত নববর্ষ কখনোই আসে না, পুরনোকে টেনে আনতে হয় নতুন খাতায়।
হালখাতার এই ব্যঙ্গ রূপ প্রকৃত হলেও এমন একটা সময় ছিল, যখন হালখাতাই নববর্ষের একটা প্রকৃত আনন্দময় রূপ ছিল। ব্যবসায়ীরাই তাদের খদ্দেরের কাছ থেকে শুধু ঋণকৃত অর্থই পেতেন না, মিষ্টিমুখ করিয়ে সম্ভবত বলতে চাইতেন, তোমাদের মুখ মিষ্টি করিয়ে দিলাম, আগামী বছর থেকে তা আর তেতো করো না। না, তা আর হয়নি। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক যেখানে দরিদ্র, সেখানে অসহায় মানুষের ছেঁড়া পকেট ভর্তি টাকা থাকা সম্ভব নয়।
বাংলা নববর্ষের দ্বিধারিক রূপ লক্ষ্য করা যায় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক। পৃথিবীর সব জাতির বর্ষ গণনা অনুপস্থিত বলে অন্য জাতির বর্ষ গোনার রীতি ধার করে ব্যবহার করতে হয়। এক সময় সমগ্র বাংলাদেশে বাংলায় বর্ষ গণনা রীতি প্রচলিত ছিল এবং জীবনের বহুক্ষেত্রে ধর্মীয় দিক থেকে, এমনকি সামাজিক দিক থেকেও ভালো দিন বিচার করা হতো। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকও ছিল গুরুত্বের অধিকারী। নববর্ষকে বরণ করে অনেক গ্রামে ও শহরে একদিন ধরে বা সপ্তাহব্যাপী মেলার আয়োজন করা হতো। মেলা অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বেচাকেনা। গ্রামের লোকরা সংগৃহীত অর্থ নিয়ে মেলায় যেতেন নিজেদের সাংবাৎসরিক প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে। কারণ তখন গ্রামে সার্বিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনার দোকান ছিল না। মেলা অনেকাংশে উৎসবে পরিণত হতো। নারী-পুরুষ সংসার ও নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখতেন। সাধারণ জিনিসের সঙ্গে সৌখিন জিনিসও পাওয়া যেত। গরমের হাত থেকে রক্ষার জন্য হাতপাখা ছিল গুরুত্বের অধিকারী। পাখার চারপাশে সুন্দর কাপড় দিয়ে মুড়ি দেয়া হতো। আর গায়ে থাকত বিভিন্ন রং দিয়ে নকশা আঁকা। মাটির পুতুল, কলসি ও নকশা দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হতো। এদেশের মৃৎশিল্প চিরদিন আদরের জিনিস ছিল। কোনো কোনো অঞ্চলের পুতুল ছিল এত আকর্ষণীয় যে প্রয়োজন না থাকলেও মানুষ কিনতে ভুলত না। পুতুল শিল্পের জন্য বিখ্যাত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর। এখানে এত ক্ষুদ্রাকার সুন্দর পুতুল তৈরি হতো, যা বাংলাদেশের আর কোথাও পাওয়া যেত না। তখন মানুষের ঘরে আলমারি থাকত না বলে শিল্পীরা মোটা সুতো দিয়ে তৈরি করতেন নানা রঙের প্রলেপে ঝোলানো শিকে। এখানেই একটার ওপর অনেক হাঁড়ি-বাসন রাখা হতো। দা, বঁটি, ছুরি কোনো কিছুরই অভাব ছিল না মেলায়। একদিক থেকে বিচার করে বলা যায় যে, গ্রামীণমেলা ছিল গ্রামীণ শিল্পীদের দক্ষতা প্রকাশের স্থান। এভাবেই গ্রামে তৈরি হতো বিভিন্ন ধরনের শিল্পী। গ্রামের নারীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করতেন নকশিকাঁথা, যা একসময় বিদেশিরাও কিনে নিয়ে গিয়ে দেয়ালে টানাতেন। বর্তমানে রাজশাহী ও যশোরে এই শিল্প আরও বিকাশ লাভ করেছে। সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে, মা-বাবার চেয়ে জীবনে বড় নেই, ভালোবাসা এক অমূল্য সম্পদ ছোট ছোট কাঁথার ওপর এ ধরনের অনেক মূল্যবান কথা রঙিন সুতো দিয়ে সেলাই করে আরও সুন্দররূপে ফুটিয়ে তোলা হতো।
জীবন আর জগতের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে মানুষের সুন্দর মনেরও। সেখানে আজ প্রবেশ করেছে অসুরীয় প্রবৃত্তির। তারই নমুনা পাওয়া যায় নববর্ষের মানুষের ঢলে একশ্রেণির মানুষের বিষাক্ত মনের। মানুষের ভিড়ে তারা ছোবল মারে নারীর সম্ভ্রমের ওপর। নারীর চোখের অশ্রু ঘোষণা করে, এই কী নববর্ষ, এই কী উৎসবের রূপ?
অতীতের নববর্ষ রাজধানী ও দেশের অন্যান্য শহরে বৃহৎ আকারে স্বতন্ত্ররূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এখন শহরে দেখা যাবে বড় বড় বিপণিকেন্দ্রের স্টল, আকর্ষণীয় দ্রব্যসামগ্রী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুঁটকি ভর্তা, ইলিশ মাছ আর পান্তাভাত। এ দেশে আগে ফ্রিজ ছিল না বলে গরমের দিনে রাতে ভাত বেঁচে গেলে পানি দিয়ে রাখা হতো, যাতে নষ্ট না হয়। সকালে পেঁয়াজ বা সামান্য সবজি দিয়ে পান্তাভাত ব্যবহৃত হতো প্রাতঃভোজনের জন্য। আজ পান্তাভাত ধনী ব্যক্তি, এমনকি পাঁচতারা হোটেলের সুদৃশ্য টেবিলে শোভা পেয়েছে। এদেশের দরিদ্র লোকের পান্তাভাত অন্তত মর্যাদা পেয়েছে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের টেবিলে। এভাবে যদি দরিদ্র মানুষের জীবনকে নববর্ষের দিনে তার মৌলিক আনন্দ দেয়া যেত, তাহলে হয়তো নববর্ষ সত্যিই নববর্ষের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করত। ছেঁড়া জামার পরিবর্তে গায়ে একটা নতুন জামা, থাকার জন্য একটা ঘর এই শ্রেণির মানুষ পেত, তাহলে তারাও তাদের ঘর সাজাতে পারত দুটি রঙিন বেলুন আর ছোট একটা পিরিচে চারটি রসগোল্লা দিয়ে। কারণ,
নববর্ষ বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসব, এই উৎসবই তো নীরবে ঘোষণা করে আমরা সবাই যেন ভালো থাকি একটা বড় রঙিন ছাতার তলায়। নববর্ষ সবার জীবনে আনুক আনন্দ, আর সবার জীবনে আগামী বছরের জন্য পূর্ণতা, বিদ্বেষ নয় ভালোবাসা।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close