ব্যাংকিং খাতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ঝুঁকি দূরীকরণে আরও মনোযোগী হতে হবেতথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) কারণে দেশে প্রথাগত ব্যাংকিং মাধ্যমের লেনদেনকে ছাড়িয়ে গেছে অনলাইনভিত্তিক লেনদেন। এর ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে এই খাতের মুনাফা বৃদ্ধিতে তা গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নির্ভুল লেনদেনের মাধ্যমে গ্রাহকের সন্তুষ্টি বাড়াতেও আইসিটির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।রেজাউল করিম খোকন বাংলাদেশের ব্যাংকব্যবস্থায় উলেস্নখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে গত কয়েক দশকে। অনেক ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করে চড়াই-উতরাই পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকব্যবস্থা আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা। ব্যাংকব্যবস্থাকে দুর্বল এবং অনুন্নত রেখে শক্তিশালী অর্থনীতির আশা করা যায় না কোনোভাবেই। এটা সবাই উপলব্ধি করেছেন বেশ ভালোভাবেই। আমাদের ব্যাংকব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সমস্যা, সংকট রয়েছে। কিন্তু তারপরেও থেমে নেই ব্যাংকব্যবস্থা। যথেষ্টসংখ্যক সরকারি-বেসরকারি বিদেশি ব্যাংক থাকার পরও গত বেশ কয়েক বছরে অনেক নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম শুরম্ন হওয়াটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশে ব্যাংকব্যবস্থা বিকাশ লাভ করছে এখনো। বিকাশমান ব্যাংকব্যবস্থায় গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) কারণে ২০০০ সালের পরবর্তী দেড় দশকে দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে অনেক বেশিসংখ্যক গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবা দেয়া সম্ভব হয়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে কর্মদক্ষতা ও মুনাফাও। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আইসিটির ব্যবহার শুরম্ন হয়েছিল ১৯৯০ সালের পর থেকে। তবে ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে আইসিটির ব্যবহার বাড়তে শুরম্ন করে। সেই অবস্থা থেকে আইসিটি এখন ব্যাংক খাতের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া ব্যাংকিং কর্মকা- এক মুহূর্তের জন্য পরিচালনার কথা ভাবা প্রায় অসম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উজ্জ্বল প্রকাশ আমাদের ব্যাংকিং খাত। এখানে যাবতীয় লেনদেন হিসাব-নিকাশ, অর্থ স্থানান্ত্মরসহ সব কাজই এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। মাত্র কিছু সময়ের জন্য যদি অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ত্রম্নটি-বিচু্যতির কারণে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটে তাহলে একটি ব্যাংকের চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এ বিষয়ে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের যে ক্ষতি হয় সেটা কোনো না কোনোভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু একটি ব্যাংকের অনলাইনভিত্তিক কেন্দ্রীয় তথ্যভা-ার যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে সেই ব্যাংকের পক্ষে একদিনও টিকে থাকা সম্ভব নয়।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) কারণে দেশে প্রথাগত ব্যাংকিং মাধ্যমের লেনদেনকে ছাড়িয়ে গেছে অনলাইনভিত্তিক লেনদেন। এর ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে এই খাতের মুনাফা বৃদ্ধিতে তা গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নির্ভুল লেনদেনের মাধ্যমে গ্রাহকের সন্তুষ্টি বাড়াতেও আইসিটির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথাগত ব্যাংকিং মাধ্যমে এখন বছরে গড়ে ১৭০ কোটি বার লেনদেন হচ্ছে। আর আইসিটির কারণে অনলাইনে ২০০ কোটি বারের বেশি লেনদেন হচ্ছে। আর আইসিটির কারণে অনলাইনে একজন কর্মী এখন বছরে গড়ে ১০ হাজার লেনদেন সম্পন্ন করছেন। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত্ম ব্যাংকের একজন কর্মীর গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজারের কম। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গত দেড় দশকে ব্যাংকের কর্মীদের কর্মদক্ষতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আইসিটিতে বিনিয়োগ ব্যাংক খাতের জন্য অবশ্যই লাভজনক। ব্যাংকের আইসিটি খাতে এক টাকা খরচ করলে তা কতটা মুনাফা নিয়ে আসে তা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিটিতে ১ টাকা বিনিয়োগ করলে ব্যাংকের জন্য তা ১৩৬ টাকার সমান উৎপাদনশীলতা তৈরি করে। এর বিপরীতে প্রযুক্তি বহির্ভূত খাতে ১ টাকা খরচ করলে সেটি ৫৮ টাকার সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা নিয়ে আসে। একইভাবে আইসিটি বিষয়ে জ্ঞান আছে, এমন একজন কর্মীর পেছনে এক টাকা খরচ করা হলে ব্যাংকের আয় বাড়ে ২৫ টাকার সমান। সাধারণ একজন কর্মীর পেছনে এক টাকা খরচ করলে ব্যাংকের আয় বাড়ে ছয় টাকা। অর্থাৎ আইসিটিতে দক্ষ একজন কর্মীর পেছনে ব্যাংকের বিনিয়োগ চারগুণ বেশি লাভজনক।
মূলত ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ধীরে ধীরে আইসিটির ব্যবহার শুরম্ন হয়েছিল। সে সময় ব্যাংকের একজন কর্মী গড়ে ৪১ কোটি টাকা লেনদেন করতেন। সেটি ২০১৫ সালে বেড়ে ১৬০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ লেনদেন সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে একজন কর্মীর আর্থিক লেনদেনের দক্ষতাও এ সময়ে প্রায় চারগুণ বেশি বেড়েছে। কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকের মুনাফাও বেড়ে গেছে একথা আজ অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং প্রভৃতির দ্রম্নত বিকাশ এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা খুব সহজেই চোখে পড়ে। এখন বেশির ভাগ গ্রাহক অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন বাস্ত্মব প্রয়োজনেই। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে ব্যাংকের জটিল লাভ-ক্ষতির হিসাবকরণ প্রক্রিয়া অনেক সহজ এবং নির্ভুল হয়েছে। আগে যা করতে প্রচুর সময় লাগতো, বিলম্বিত হতো ব্যাংকের সঠিক মুনাফা প্রক্রিয়াকরণ কাজ এখন তা নির্বিঘ্নে করা সম্ভব হচ্ছে। এখন ব্যাংকের লেনদেনে ভুলের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। কোনো কোনো ব্যাংক আগের প্রচলিত হিসাবকরণ প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মিথ্যে, কাল্পনিক মুনাফা প্রদর্শন করত। এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের ফলে সেই জালিয়াতির সুযোগ আর নেই বলা চলে। এখন ব্যাংকগুলোকে সত্যিকার সঠিক মুনাফাই প্রদর্শন করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি কিংবা জালিয়াতির কোনো সুযোগ থাকছে না।
ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় তথ্য প্রযুক্তির (আইটি) ব্যবহার ক্রমেই বাড়লেও এ ক্ষেত্রে আইটি কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ব্যাংকগুলো এখনো যথেষ্ট বিনিয়োগ করছে না। বর্তমানে ব্যাংকের আইটি খাতে বছরে যত খরচ হয়, তার ৩ শতাংশের বেশি খরচ হয় কর্মীদের প্রশিক্ষণে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) ব্যাংক খাতের আইটি কার্যক্রমবিষয়ক এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৬ সালে দেশের সব ব্যাংকে আইটি খাতে খরচ করেছে ১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে আইটিবিষয়ক প্রশিক্ষণে খরচ করা হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। যা এ খাতে মোট বিনিয়োগের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। যা মোটেও সন্ত্মোষজনক নয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এখন প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, আইটি কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করলে তা ব্যাংকের জন্য সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
ব্যাংক খাতে বৈপস্নবিক পরিবর্তন এনেছে যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, যার কারণে ব্যাংকিং কর্মকা-ে দারম্নন গতির সঞ্চার হয়েছে সেই আইসিটিকে ব্যাংক খাতের প্রধান একটি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু বাস্ত্মবতা হলো ভিন্ন। এখনো আইসিটিকে ব্যাংক খাতের মূল ব্যবসা থেকে আলাদা করে দেখার একটি মানসিকতা বহাল রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নতুন গতি সঞ্চারকারী আইসিটি খাতকে সবচেয়ে গুরম্নত্ব না দিয়ে অবহেলিত অবস্থায় রেখে দিলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। এ খাতের নীতি-নির্ধারকদের পুরনো মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে বাস্ত্মবতার নিরিখে। আইসিটি খাতকে আরও বেশি গুরম্নত্ব দেয়ার বিষয়টি সিরিয়াসলি নিতে হবে। ২০০০ সালেও আইসিটিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ বলতে বোঝাতো সফটওয়্যার ও কিছু কম্পিউটার কেনা। সেই অবস্থা থেকে আইসিটির কারণে ব্যাংক খাতে নতুন অনেক সেবা এসেছে, কর্মদক্ষতাও বেড়েছে। তারপরেও ব্যাংকের আইটি বিভাগের কাজকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। আইটি বিভাগে যারা কাজ করছেন তাদেরও মানসিকতা আইটি বিভাগেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তারা এর বাইরে ব্যাংকের অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে ধারণা নিতে ইচ্ছে প্রকাশ করছেন না। আইটি খাতের লোকজনদের ব্যাংকের মূল ব্যবসা বোঝারও প্রয়োজন রয়েছে। কারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিটেইল ব্যাংকিংয়ে অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকের সেবা নিয়ে যেতে প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। এটা সবাইকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
দেশের অধিকাংশ ব্যাংক নিজেদের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিত নয়। ব্যাংক খাতের সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে অর্ধেকেরও বেশি ব্যাংক কর্মীর সচেতনতার অভাব রয়েছে। এ বিষয়ে ২৮ শতাংশ কর্মীর জ্ঞান খুবই কম, আর ২২ শতাংশ কর্মীর জ্ঞান কম। সাইবার নিরাপত্তার ব্যাপারে সামান্য ধারণা থাকার কথা জানিয়েছেন ২০ শতাংশ। বাকি ৩০ শতাংশ কর্মীর জ্ঞান এ ক্ষেত্রে ভালো থেকে উচ্চপর্যায়ের। ব্যাংক খাতের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) আরেক গবেষণায়। ২১টি ব্যাংকের ওপর এই জরিপ চালায় বিআইবিএম। যার মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ১৪টি, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ৩টি এবং বিদেশি ব্যাংক ৩টি। বাংলাদেশের ৫৭টি ব্যাংকে প্রায় ২ লাখ কর্মকর্তা রয়েছে। গ্রাহকদের মধ্যেও একই জরিপ চালিয়েছে বিআইবিএম। এতে দেখা গেছে, ৫৪ শতাংশ গ্রাহক সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে অজ্ঞ। ওই গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ৯০ শতাংশ ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতে সাইবার ঝুঁকি বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতের তথ্য নিরাপত্তা বাধায় আরও কিছু কারণ রয়েছে। এগুলো হলো- নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ব্যাংক কর্মকর্তাদের জানা শোনার অভাব, গ্রাহকদের অসচেতনতা, ব্যাংকগুলোর বাইরের আইটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা, ব্যাংকিং খাতে আইটি এক্সপার্টের অভাব, যথেষ্ট পরিমাণে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা এবং আইটি খাতে বাজেটের স্বল্পতা। এসব থাকার কারণে ব্যাংকিং খাতে সাইবার ঝুঁকি বাড়ছে। সাইবার নিরাপত্তার জন্য গত কয়েক বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। প্রতি বছর আইটি নিরাপত্তায় রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ আরও দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। দেশের ব্যাংকগুলো এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইড লাইন অনুযায়ী নিরাপত্তা মানে পৌঁছাতে পারেনি। এ কারণে ব্যাংকিং খাত এখনো ঝুঁকিমুক্ত হতে পারেনি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রতিনিয়ত সাইবার আক্রমণের ঘটনা ঘটছে এবং সেগুলো খুব বড় ধরনের। যা জটিলও বটে। এটা আর্থিক খাতের পুরো সিস্টেমকে নষ্ট করে ফেলছে। আজকাল এই অপরাধীরা সাইবার আক্রমণ করে বড় অঙ্কের তহবিল হাতিয়ে নিচ্ছে এবং এটিএম জালিয়াতির মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিশ্বব্যাপী যেভাবে সাইবার হামলা হচ্ছে তাতে যে কোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। বিশেষ করে, বিমানবন্দর, সরকারি গুরম্নত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ব্যবসায়িক, শিল্প-প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সব প্রতিষ্ঠানই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দেশের সব ব্যাংকের অনলাইন তথ্যভা-ার বা ডাটা সেন্টার ঢাকায় অবস্থিত। একইভাবে বিকল্প ডাটা সেন্টারগুলো ঢাকায় অবস্থিত। এটি ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তার জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা যায়। কারণ ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগকালীন বিপর্যয়ে তথ্য উদ্ধারের সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে যে পদ্ধতিতে আইটি নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সেটিও নানাভাবে ত্রম্নটিপূর্ণ। এখানেও অনেক সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়, ব্যাংক খাতের সাইবার নিরাপত্তার নিশ্চয়তাকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংক অভিভাবকসূলভ ভূমিকা রাখতে পারে। আইটিবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে বিনিময়ে একটি সম্মিলিত তথ্যভা-ার তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তথ্যভা-ারে সব ব্যাংকের জন্য আইটি নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় বিভিন্ন হালনাগাদ তথ্য থাকবে।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের ব্যাংক খাত যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে তেমনিভাবে এর অপপ্রয়োগ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ঘটে যাওয়া এটিএম কার্ড জালিয়াতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন ও চাঁদাবাজি অর্থ আদান-প্রদানের ঘটনাগুলো সবাইকে এক ধরনের অস্বস্ত্মির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেউ কেউ ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম করছেন। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত। কেউ কেউ অর্থ পাচার করছেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ দিন দিন বাড়ছে। এক সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং অবৈধ অর্থ পাচারের বড় হাতিয়ার হতে পারে। যা প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সজাগ থাকতে হবে দুর্বৃত্তরা যাতে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের তথ্যভা-ারে প্রবেশ করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটাতে না পারে।
বর্তমানে ৮৮ শতাংশ ব্যাংকের কার্যক্রম অনলাইননির্ভর হওয়া সত্ত্বেও আইটিতে কিছু কিছু ব্যাংক প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এই সমস্যা সমাধানে ব্যাংকগুলোর মুনাফার একটি অংশ আইটি খাতে অবশ্যই বিনিয়োগ করা উচিত। দেশীয় সফ্‌টওয়্যার ব্যবহার না করে ব্যাংকগুলো অহেতুক বিদেশি সফ্‌টওয়্যারের দিকে ঝুঁকছে। ব্যাংকের টাকায় অহেতুক বিদেশ ভ্রমণ কিংবা অন্য কোনো লাভের আশায় কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা এ কাজ করছেন। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাইবার ঝুঁকিতে অবহেলা করার সুযোগ নেই কোনোভাবেই। এ ধরনের একটি বড় ঝুঁকি ব্যাংকিং খাতে থাকলেও ব্যাংকিং খাতে দক্ষ আইটি কর্মীর অভাব রয়েছে। আইটিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে উন্নতমানের কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে ঘন ঘন। সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনে আরও যুগোপযোগী পরিবর্তন আনতে হবে। আইটি নিরাপত্তা জোরদারে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে আইটি নিরাপত্তা বিষয়ে আরও জোর দিতে হবে। কোনো রকম আগাম সংকেত পেলেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল-ত্রম্নটি অনিয়ম ও সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়িয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিংব্যবস্থা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যথার্থ প্রয়োগ ঘটিয়ে আরও এগিয়ে যাবে, আমাদের সবার একান্ত্ম প্রত্যাশা।

রেজাউল করিম খোকন
ব্যাংকার
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close