সৌর বিদু্যৎ : যুগান্ত্মকারী সাফল্য এনে দিয়েছেসৌর বিদু্যৎ আজ এমন এক প্রয়োজনীয় স্ত্মরে পৌঁছেছে যে, বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কাজে সৌর বিদু্যৎ সিস্টেমের ব্যবহার কাজের সময়কে বর্ধিত করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যেমন পোলট্রি ফার্ম, মাছ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র, কাপড় বুনন, হস্ত্মশিল্প এবং হাটবাজারে ব্যবসা বাণিজ্যের সময় বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। সৌর বিদু্যৎ প্রকল্পের কার্যক্রম ইতিমধ্যে ব্যাপক বিস্ত্মৃতি লাভ করেছে।বীরেন মুখার্জী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে বিদু্যৎ ছাড়া সব কিছুই স্থবির হয়ে পড়ে। অল্প সময়ের লোডশেডিংয়ে আমরা তা অনুভব করতে পারি। অথচ বিদু্যতের ঘাটতি দূর করতে এবং যেসব এলাকায় বিদু্যৎ পৌঁছায়নি, সৌরবিদু্যৎ সিস্টেম সেসব এলাকার মানুষের জন্য এক বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এক সময় সৌরবিদু্যৎ কল্পনাতীত হলেও এখন তা বাস্ত্মব। দিন দিন সৌর বিদু্যতের ব্যবহারও বাড়ছে। জাতীয় গ্রিডেও যুক্ত হয়েছে সৌর বিদু্যৎ। সৌর বিদু্যতের মূল কাজ হলো সূর্যের রশ্মিকে বিদু্যৎ শক্তিতে রূপান্ত্মরিত করা। এই বিদু্যৎ উৎপাদনে কোনো জ্বালানির প্রয়োজন নেই। ফলে কোনো লোডশেডিংও নেই। সূর্যের তাপকে সংরক্ষণ করার জন্য অনেক সৌর কোষ একত্রে সংযুক্ত করে একটি সৌর প্যানেল তৈরি করা হয়। ঐ সৌর প্যানেলের ওপর সূর্যের আলো পড়লেই এতে ভোল্টেজ সৃষ্টি হয় এবং সংযুক্ত তারের মাধ্যমে এটি থেকে বিদু্যৎ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ দিন সূর্যালোক থাকায় সৌর বিদু্যৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ একটি আদর্শ দেশ। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কিলোওয়াট ঘণ্টা শক্তি এদেশের প্রতি বর্গমিটার জমিতে আছড়ে পড়ছে। ভূপতিত এই সৌরশক্তির মাত্র ০.০৭% শক্তিতে রূপান্ত্মর করা গেলেই বাংলাদেশের সব বিদু্যতের চাহিদা মিটিয়ে ফেলা সম্ভব- সৌর বিদু্যতের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরা এমন কথা বলে আসছেন। তবে সোলার প্যানেল স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক বেশি হলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নূ্যনতম কিছু খরচ ছাড়া আর তেমন খরচ হয় না। সৌরবিদু্যৎ উৎপাদন হয় খুব সহজেই। সূর্যের আলোর কণা সোলার মডিউলে পড়লেই সৌরবিদু্যৎ উৎপাদিত হয়। এ বিদু্যৎ ব্যাটারিতে জমা হয়। সোলার হোম সিস্টেমে চার্জ কন্ট্রোলার ব্যাটারিকে অতিরিক্ত চার্জ ও ডিসচার্জ হওয়া থেকে রক্ষা করে প্রয়োজনীয় বিদু্যৎ বিতরণ করে।
সৌর বিদু্যৎ আজ এমন এক প্রয়োজনীয় স্ত্মরে পৌঁছেছে যে, বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কাজে সৌরবিদু্যৎ সিস্টেমের ব্যবহার কাজের সময়কে বর্ধিত করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যেমন পোলট্রি ফার্ম, মাছ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র, কাপড় বুনন, হস্ত্মশিল্প এবং হাটবাজারে ব্যবসা বাণিজ্যের সময় বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। সৌর বিদু্যৎ প্রকল্পের কার্যক্রম ইতিমধ্যে ব্যাপক বিস্ত্মৃতি লাভ করেছে। এর সাহায্যে লাইট, ফ্যান, টিভি, মোবাইলচার্জ, কম্পিউটার, ফ্রিজ ও সেচপাম্প ইত্যাদি অতি সহজে সাশ্রয়ীমূল্যে চালাতে পারায় পলস্নী এলাকাসহ শহর এলাকার জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং বিদু্যতের সাধারণ গ্রিডের ওপর চাহিদার চাপও লাঘব হচ্ছে, যা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। আমাদের দেশে সৌর বিদু্যতায়নের শুরম্নতে দুই একটি কোম্পানি কার্যক্রম শুরম্ন করলেও বর্তমানে দেশব্যাপী একশর বেশি ছোট বড় কোম্পানি সৌর বিদু্যৎ সিস্টেম বিক্রির সঙ্গে জড়িত আছে। সব কিছু মিলিয়ে সৌর বিদু্যৎ উৎপাদন ও ব্যবহার এক যুগান্ত্মকারী সাফল্য হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে দেশে মোট সৌরবিদু্যৎ উৎপাদন হয় ২০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত সৌর প্যানেল থেকে পাওয়া যায় ৫ মেগাওয়াট আর আমদানি করা সৌর প্যানেল থেকে ১৫ মেগাওয়াট। এই বিদু্যৎ মোট বিদু্যতের ০.৬ ভাগ। গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৪০ লাখের মতো মানুষ এখন সৌর বিদু্যৎ ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছে। তথ্য বলছে, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৮১ শতাংশই আসে সৌরবিদু্যৎ থেকে। অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশ বিদু্যৎ উৎপাদনে রেকর্ড গড়লেও বিদু্যতের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। যে কারণে বিদু্যৎ সংকটও চলমান। বিদু্যতের উৎপাদন বাড়াতে সরকারিভাবে মেগা প্রকল্প বাস্ত্মবায়িত হচ্ছে। এগুলোর ফল পেতে প্রকল্প বাস্ত্মবায়ন পর্যন্ত্ম অপেক্ষা করতে হবে। ফলে আপাত সংকটে সৌরবিদু্যৎ একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। বলা বাহুল্য করছেও। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ডিজেল পস্ন্যান্ট (বিডিপি) লি. স্পেনের সানকো রিনিউয়েবল এনার্জির কারিগরি সহায়তায় এই সৌর প্যানেল স্থাপন করেছে। সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত হচ্ছে বিদু্যৎ আর তা সরাসরি চলে যাচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। এভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১০ কিলোওয়াট বিদু্যৎ। সৌরবিদু্যৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের বিষয়টি অত্যন্ত্ম আশাব্যঞ্জক।
দেশের প্রথম সোলার প্যানেল জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে স্থাপিত হয়েছে। আট একর জমিতে সাড়ে ১১ হাজার সোলার প্যানেল ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে তিন মেগাওয়াট ক্ষমতার এই সৌর বিদু্যৎকেন্দ্রটি, যা নির্মিত হয়েছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে। 'এনগ্রিন সরিষাবাড়ী সোলার পস্ন্যান্ট লিমিটেড' নামের এই কেন্দ্রে জমি দিয়েছে বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ড। আর বিনিয়োগ করেছে জার্মানির আইএফই এরিকসেন এজি, বাংলাদেশের কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড ও জুপিটার এনার্জি লিমিটেড। এটার পাশাপাশি সুনামগঞ্জে ৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি ফটোভোল্টাইক বিদু্যৎকেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে মোট ৩২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও দুটি বিদু্যৎ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২০১৭ সালের সর্বশেষ তথ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪০% বিদু্যৎ সুবিধা পেয়ে থাকে। দেশে বিদু্যৎ চাহিদা প্রায় ৬০০০ মেগাওয়াট অথচ উৎপাদন হয় মাত্র ৪০০০ মেগাওয়াট। আবার মোট বিদু্যতের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত হয়। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদও ক্রমেই শেষ হয়ে হয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং খনিজ প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতার কারণে জ্বালানি সংকট দূরীকরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার হিসেবে সোলার এনার্জি এক উলেস্নখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। সোলার এনার্জি শুধু বৈদু্যতিক সুবিধাই দেয় না; এটি পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখে। অধিকন্তু জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর বিদু্যতের যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস পরিবেশে নির্গত হয়, সোলার এনার্জিনির্ভর বিদু্যতে তা হয় না। আবার জাতীয় গ্রিডের বিদু্যৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এবং শহর এলাকার জন্য উপযোগী সোলার-হোম-সিস্টেম বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)-এর জ্বালানি গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউট উদ্ভাবন করেছে। এই সোলার-হোম-সিস্টেম প্রযুক্তিটি জাতীয় গ্রিড লাইনের আওতাধীন এলাকাসমূহে ব্যবহার করা যাবে, ফলে শহর এলাকার অব্যবহৃত ছাদ এখন সৌর বিদু্যতের উৎস হতে পারবে। দেশের অর্থনীতিসহ সামগ্রিক উন্নয়নে বিদু্যৎ উৎপাদন একান্ত্ম অপরিহার্য। বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় বিদু্যৎ উন্নয়নে এগিয়ে গেছে দেশ। সৌর বিদু্যৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে উৎপাদিত বিদু্যৎ সরবরাহ বর্তমান সরকারের একটি সাফল্য বলা যেতে পারে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশেস্নষণে দেখা যায়, বর্তমানে সৌরশক্তির প্রযুক্তি আর ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ইউরোপ। ইউরোপ ও আমেরিকাকে ছাড়িয়ে শীর্ষে আসার পরিকল্পনা চূড়ান্ত্ম করে কাজ করছে চীন। ভারত সরকার ঘোষণা দিয়েছে, তারা ২০২২ সাল নাগাদ ২০ হাজার মেগাওয়াট সৌরশক্তিচালিত বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে। কিছুদিন আগে মার্কিন সরকার ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোলার প্যানেল স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে চীনও শুরম্ন করেছে সবচেয়ে বড় সোলার প্যানেল বসানোর কাজ। এতে স্পষ্ট যে, বিশ্বে সৌর বিদু্যতের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরে প্রায় এক লাখ ৭৮ হাজার ভবন আছে। যেখানে সোলার প্যানেল বসিয়ে ১,৪৬৫ মেগাওয়াট বিদু্যৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশ ডিজেল পস্ন্যান্ট (বিডিপি) লি. থেকে পাওয়া এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একটি পাঁচ কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল স্থাপন করতে প্রাথমিকভাবে ১৩ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। আর এর জন্য প্রয়োজন তিন থেকে চার কাঠা জমির ওপর নির্মিত ভবনের ছাদ। ঢাকা নগরীতে যত ইমারত, তার অর্ধেকের ছাদ ব্যবহার করে এভাবে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদু্যৎ উৎপাদন সম্ভব বলে তারা আশাবাদী। সরকারেরও নির্দেশনা আছে রাজধানীতে নতুন বাড়ি তৈরি করলে তার একাংশে সৌর প্যানেল বসাতে হবে। এভাবে সরকার, উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারী সবার সম্মিলিত উদ্যোগে সৌর বিদু্যতের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদু্যৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
সোলার প্যানেলের ব্যাপক প্রসার এবং স্থানীয় বাজারে এর আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি তৈরির মাধ্যমে সৌর বিদু্যৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে অনেকাংশেই। এই সৌর বিদু্যতের প্যানেল চীন থেকে আমদানি করতে হচ্ছে আমাদের। আশার কথা যে, দেশের ছয়টি প্রতিষ্ঠান সোলার প্যানেল তৈরি করছে। বাংলাদেশে যেহেতু সৌরবিদু্যতের প্রসার ঘটেছে, সেহেতু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সৌর বিদু্যৎ আরও সহজলভ্য হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 'রিনিউয়েবলস ২০১৭ গেস্নাবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট' অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে সৌরশক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। বিশ্বে ৬০ লাখ সৌর প্যানেলের মধ্যে ৪০ লাখই বাংলাদেশে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ক্লিন স্টোভ ও বায়োগ্যাস ব্যবহারেও সামনের দিকে আছে বাংলাদেশ। এতে প্রচুর কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে ৫ম স্থানে আছে। সুতরাং বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যে বিপস্নব ঘটেছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। প্রসঙ্গত, ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কাছে সৌরশক্তির সুবিধা পৌঁছে দিতেও কাজ করছেন সৌর বিদু্যৎ খাত সংশিস্নষ্টরা। বাংলাদেশে সব মৌসুমেই সূর্যের আলো পাওয়া যায়, ফলে সৌর বিদু্যতের উৎপাদনও ব্যাপক হারে করা সম্ভব। সৌর বিদু্যতের এই সাফল্য আরও যুৎসই কাজে লাগাতে সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা জরম্নরি।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close