বজ্রপাত ও জলবায়ু পরিবর্তনে করণীয়জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে দুর্যোগের ঘটনা। বাড়ছে ক্ষতিকর নানামুখী জনদুর্ভোগ। যখন তখন আঘাত হানছে ঝড়, তুফান ও সমুদ্রের নিম্নচাপ। বজ্রপাতের সঙ্গে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে মৃতু্যর সংখ্যা। প্রতিনিয়ত নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাত এড়াতে কতিপয় পরামর্শ সরকারি দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় অনেকটাই বিপর্যস্ত্ম হয়ে পড়েছে জনজীবন। এপ্রিল মাসব্যাপী সকাল থেকে প্রচ- রোদে জ্বলছিল প্রাণ ও প্রকৃতি। সকাল ১১টার পরেই হঠাৎই শুরম্ন হওয়া ধমকা হাওয়া আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বাতাসের তীব্রতা কিছুক্ষণ স্থায়ী হওয়ার পরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ে। কয়েক ঘণ্টা বিরামহীন বৃষ্টিতে পথ-ঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। মুহূর্তেই বজ্রপাত শুরম্ন হয়। আর তাতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভারি বর্ষণে শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। তখন দুর্ভোগ বেড়ে যায় খেটে খাওয়া মানুষের। বাতাস আরম্ভ হলেই বিদু্যৎ চলে যাওয়ায় মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ করতে হয় অফিসপাড়ায়। বজ্রপাত এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু পরামর্শ বলা হয়েছে, (ক) ঘনঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো দালানের নিচে আশ্রয় নিতে পারলে ভালো হয়। এ সময় কোন অবস্থায় খোলা বা উঁচু জায়গায় থাকা উচিত নয়। (খ) ফাঁকা জায়গায় যাত্রী ছাউনি, উঁচু গাছপালা, বিদু্যতের খুঁটি ইত্যাদিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে। বজ্রপাতের সময় এসব জিনিস থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা দরকার। (গ) বজ্রপাতের সময় বাসা-বাড়িতে থাকলে জানালা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা। (ঘ) বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়িরর্ যালিং, পাইপ ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা। এমনকি ল্যান্ড লাইন, টেলিফোন ও স্পর্শ না করা। এগুলোর সংস্পর্শেও আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। (ঙ) বজ্রপাতের সময় বৈদু্যতিক সংযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। বজ্রপাতের আভাস দেখা দিলেই টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ রাখুন। বৈদু্যতিক বোর্ড থেকে অব্যবহারকৃত যন্ত্রপাতি ফ্লাগ খুলে রাখুন। (চ) বজ্রপাতের সময় গাড়িতে থাকলে দ্রম্নত গাড়ি থেকে নেমে কোনো বারান্দা বা পাকা ছাউনির নিচে অবস্থান করা দরকার। এ সময় গাড়ির কাচে হাত দেওয়া বিপজ্জনক। (ছ) বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। বের হতে হলে পা ঢাকা জুতা পরিধান করে বের হওয়া উত্তম। (জ) বজ্রপাতের সময় রাস্ত্মায় চলাচলে আশপাশ খেয়াল রেখে চলতে হবে। কেউ আহত হলে দ্রম্নত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে বজ্রপাতে এ পর্যন্ত্ম প্রায় ৭০ জনের অধিক নিহতের সংবাদ জানা গেছে। গণ ৮ বছরে বজ্রপাতে বাংলাদেশে মারা গেছে ১৮০০ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. টমাস ডবিস্নউ-এর গবেষণায় বলে প্রতি বছর মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত্ম বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কি. মি. ৪০টি বজ্রপাত হয়। এ মৃতু্যর হার বাংলাদেশে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হারের চেয়ে বেশি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বছরের এ সময় বৃষ্টিপাতের সঙ্গে বজ্রপাতও ব্যাপক হারে হয়ে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তাওহিদা রশীদ বলেন, বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। বিঞ্জানীর অনেকে মনে করেন, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য এমনটি হচ্ছে। তবে এ মতের সঙ্গে অনেক বিজ্ঞানী দ্বিমত পোষণ করেন। বাংলাদেশে তাপমাত্রা বেড়েছে জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে এটারও প্রভাব দেশে পড়েছে। বাংলাদেশে দশমিক ৭৪ শতাংশ তাপমাত্রা বেড়েছে। বিকেলে বজ্রপাত হওয়ার হার বেশি। এ বিষয়ে আবহাওয়া বিজ্ঞানী তাওহিদা রশীদের মতে, বজ্রপাতের ধরনই এমন। সকালের দিকে প্রচ- তাপমাত্রা হয় আর এতে করে অনেক জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। এ জলীয় বাষ্পই বজ্র ঝড় ও বজ্রপাতের প্রধান শক্তি। তাপমাত্রা যত বাড়বে তখন জলীয় বাষ্প বা এ ধরনের শক্তিও তত বাড়বে। এ বিজ্ঞানী বলেন, জলীয় বাষ্প বেড়ে যাওয়া মানে হলো ঝড়ের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া। বছরে ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়ার কারণে ১ শতাংশ বজ্রঝড় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছ, এটি কোনো কোনো বিজ্ঞানী প্রমাণ করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে এ বিজ্ঞানী আরও বলেন, অঞ্চল ভেদে এটি কমবেশি হচ্ছে। বজ্রঝড় ও বজ্রপাত এপ্রিল ও মে মাসের কিছু সময় ধরে প্রতি বছরই হয়। এ বছর কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। তবে ওই অধ্যাপকের মতে, বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বজ্রপাতের সংখ্যা বেশি। কারণ ওখানে হাওরের কারণে জলীয় বাষ্প বেশি হয়। সে কারণে সিলেটের ওই অঞ্চলটিতে বজ্রপাতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ওই প্রফেসর বলেন, বজ্রপাত প্রকৃতির একটি বিষয় এবং এটি হবেই। তবে এতে প্রাণহানি কমানোর সুযোগ আছে। বজ্রপাত যখন শুরম্ন হয় এর তিনটি ধাপ আছে। প্রথম ধাপে বিদু্যৎ চমকানি বা বজ্রপাত শুরম্ন হয় না। প্রথমে মেঘটা তৈরি হতে থাকে এবং সেসময় আকাশের অবস্থা ঘন কালো হয় না। একটু কালো মেঘের মতো তৈরি হয়। সামান্য বৃষ্টি ও হালকা বিদু্যৎ চমকায় তখন। তখনি এ সময় মানুষকে সচেতন হতে হয়। প্রতিটি দুর্যোগে একটি নির্দিষ্ট সময় আছে এবং সেসময় সম্পর্কে প্রতিটি মানুষের সচেতন হওয়া উচিত। বাইরে থাকলে যখন দেখা যাবে আকাশ কালো হয়ে আসছে তখনি নিরাপদ জায়গায় যেতে হবে। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তখন অন্ত্মত ৩০ মিনিট পাওয়া যায়। বজ্রপাত প্রকৃতির একটা ধারাবাহিক খেলা। প্রকৃতির বিরম্নদ্ধাচরণ বজ্রপাতের অন্যতম কারণ। সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত হবে প্রকৃতির যথাযথ সংরক্ষণ লালন ও পালনের ব্যবস্থা করা। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কখনো সমাজ ও পরিবেশ টিকে থাকতে পারে না। তাই এ সময়ে আমাদেরকে বেশি করে প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরম্নত্ব দিতে হবে।

মাহমুদুল হক আনসারী
ঢাকা
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close