পূর্ববর্তী সংবাদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিনশেখ হাসিনাকে শুধু ভালোবাসলেই হবে না, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে যাতে দেশি ও বিদেশি বিরোধী শক্তি যেন কোনোভাবেই ষড়যন্ত্র করে সফল হতে না পারে। দেশবাসীর কাছে অনুরোধ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে আরও শক্তিশালী করম্নন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ায় সহায়তা করম্নন।প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ আজ ১৭ মে। স্বাধীনতা-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। ঐতিহাসিক দিন বললাম এ কারণে যে, ১৯৮১ সালে এ দিনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যদি এ দেশে না ফিরতেন, তা হলে বাংলাদেশে ইতিহাস লেখা হতো অন্যভাবে। বাংলাদেশ পরিণত হতো পাকিস্ত্মানের মতো একটি ব্যর্থ ও জঙ্গিরাষ্ট্রে। '৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশ হেঁটেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অন্ধকার সময়ের ভেতর দিয়ে। এমন বাস্ত্মবতায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন সময়ের দাবি ছিল।
আমি কেন, আমার মতো লক্ষ কোটি মানুষ আজ বলতে বাধ্য, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন বলেই, বাংলাদেশ আজ গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন, উভয় শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আন্ত্মর্জাাতিক মন্ডলে নিজেদেরকে একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) ক্যাটাগরি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করল বাংলাদেশ। কিছুদিন আগে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হলো দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। ৫৭তম স্যাটেলাইট অধিকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হল প্রিয় বাংলাদেশ। জয়তু কৃষকরত্ন শেখ হাসিনা। তাই ইতিহাসের নিরিখে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল ঐতিহাসিক এক অনন্য দিন।
১৯৮১ সালে সেদিনের কথা মনে হলে আজও আবেগাপস্নুত হয়ে পড়ি। চারদিকে কালবৈশাখীর হাওয়ার বেগ ছিল ৬৫ মাইল। ওই ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে গ্রাম-গঞ্জ থেকে লাখো মানুষ জড়ো হয়েছিল ঢাকার রাজপথে। হৃদয় নিংড়ানো আবেগে আপস্নুত হয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে দেশবাসী বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের মানুষ বরণ করেছিল। লাখো জনতার সঙ্গে সেদিন স্বৈরশাসক জিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমরা তৎকালীন বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও উপস্থিত হলাম কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে। সবার মুখে 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' আর অশ্রম্নসিক্ত কণ্ঠে ছিল 'মাগো তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব' সেস্নাগান, হাতে বঙ্গবন্ধুর আর দলীয় প্রতীক নৌকার প্রতিকৃতি। কী অদ্ভুত দৃশ্য। তার দু'হাত তোলা মোনাজাতের ভঙ্গি, ক্লিষ্ট ক্ষীণ দুর্বল দেহ, যেন কাঙালিনী- সে দৃশ্য স্মরণ করে এ লেখা লিখতে গিয়ে অশ্রম্ন ঝরছে।
আজ যদি পেছনে ফিরে তাকিয়ে বর্তমান বিবেচনায় নেই, তবে দেখব সেদিনটি এমন নিষ্কলুষ ছিল না। শেখ হাসিনার চলার পথও এত কুসুমাস্ত্মীর্ণ ছিল না। রাজনীতির ময়দানের কঠিন পথের পাশাপাশি প্রকৃতিও সেদিন ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে যেন প্রকৃতিতেও নেমে এসেছিল অন্যরকমের উচ্ছ্বাস অন্য রকমের আনন্দের জোয়ার। অবিরাম মুষলধারে বারিবর্ষণে যেন ধুয়ে-মুছে যাচ্ছিল বাংলার পিতৃ হত্যার জমাটবাঁধা পাপ আর কলঙ্কের চিহ্ন। সত্যিকার অর্থেই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এদেশের মানুষের ভাগ্য পরির্বতন শেখ হাসিনার দুরদর্শী নেতৃত্ব ছাড়া আদৌ সম্ভব হতো না। প্রকৃতপক্ষে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি নেতৃত্বশূন্য হওয়া থেকে জাতিকে রক্ষা করেছেন।
বিকেল সাড়ে ৪টায় দিলিস্ন থেকে শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান বাংলার মাটি স্পর্শ করলে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন মুহূর্ত। চারদিকে স্স্নোগান আর স্স্নোগান। শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম স্স্নোগানের মাধ্যমে নেত্রীকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি জনতার কণ্ঠে ঘোষিত হচ্ছিল হাসিনা তোমায় কথা দিলাম- পিতৃ হত্যার বদলা নেব স্স্নোগানটি। জনগণের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা নতুন জীবন লাভ করেছিলেন। নেত্রীরূপে বাংলার মাটিকে তিনি ধন্য করেছিলেন। পিতা-মাতা, ছোটভাই রাসেলসহ স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে ওই দিন শেরেবাংলা নগর সমাবেশে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, 'আমি সামান্য মেয়ে। সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থেকে আমি ঘর-সংসার করছিলাম। কিন্তু সবকিছু হারিয়ে আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্ত্মবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। বাংলার দুঃখী মানুষের সেবায় আমি আমার এ জীবন দান করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ছোটভাই রাসেলসহ সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদেরকে ফিরে পেতে চাই।' কথা-কাজে-প্রতিজ্ঞা প্রতিটি পদক্ষেপে, নীতি-কৌশলে কন্যা ছিলেন ঠিক পিতার মতোই। দেশে ফিরে শেখ হাসিনা অবিরাম অগণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির মোকাবেলা করে চলেছেন। শেখ হাসিনার যোগ্য ও সফল নেতৃত্বের জন্য বাংলাদেশ, এদেশের মানুষ আজ বিশ্বে একটা সম্মানজনক অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যেদিন স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন, সেদিন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, ছিল সর্বব্যাপী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ। সামরিক স্বৈরশাসনের অন্ধকারে নিমজ্জিত স্বদেশ। এমন অস্বস্ত্মিকর ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ১৯৮১ সালের ১৪ থেকে ১৬ ফেব্রম্নয়ারি অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। পঁচাত্তর-পরবর্তী জিয়াউর রহমানের অপশাসনে দেশের মানুষের রম্নদ্ধশ্বাস অবস্থার সময়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দিবসটি তাই জাতির কাছে অত্যন্ত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর যারা ছিল অবহেলিত ও নির্যাতিত, ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে ও তার নেতৃত্বের পরশে তারা আবারও জেগে ওঠার সাহস ও প্রেরণা পেয়ে যায়। এ দিন শেখ হাসিনার নামে যথার্থই জেগে ওঠে বাংলাদেশ।
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের আর কোনো দেশ উন্নতির এমন অসাধ্য সাধন করতে পারেনি, যেমন পেরেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ। আজ বাংলাদেশ পৃথিবীর যে কোনো সভ্য দেশের সাথে তুলনীয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জনের লড়াইয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনেকখানি এগিয়ে গেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি বাংলাদেশকে ব্যর্থ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা স্বাধীনতাবিরোধীদের ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র সফল হতে দেননি। তিনি শুধু আওয়ামী লীগকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তা নয়, পুরো বাংলাদেশকে তিনি আগলে রেখেছেন। সব ষড়যন্ত্র আর বাধাকে জয় করে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছেন বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের উন্নতি এখন বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অগ্রগতির মূল কারণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব।
বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্ত্মর্জাতিক পরিম-লে নেতা হিসেবে পরিচিতি ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে মুসলিম বিশ্বের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। ভূষিত হয়েছেন 'মাদার অব হিউম্যানিটি' উপাধিতে। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ এখন আর খাদ্য সহায়তা নেয় না বরং সহায়তা দেয়। মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হলো দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ও মেট্রোরেলসহ বড় বড় উন্নয়ন কর্মকা- বাস্ত্মবায়ন করছে সরকার। শহরের পাশাপাশি বদলে যাচ্ছে গ্রামের দৃশ্যপটও। ডিজিটাল বিপস্নব ঘটেছে দেশে। রেকর্ড পরিমাণ বিদু্যৎ উৎপাদন করে দেশের উন্নয়নের চাকাকে বেগবান করা হয়েছে। এ বছর ৩৫ কোটি ৪২ লাখ পুস্ত্মক বিনামূল্যে স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৫২ ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল এক হাজার ৬১০ ডলার। এ ছাড়া চলতি বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এক কথায়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদু্যৎ, কৃষি এবং অন্যান্য সেক্টরে উন্নয়নের হাওয়া বইছে।
স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধী শক্তি শেখ হাসিনাকে ভয় পায়, এ জন্যই বারবার তার ওপর হামলা হয়েছে। ২৪ বার তার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, যাতে ২৪ জন ঘটনাস্থলে প্রাণ হারিয়েছেন, আর আহত হলেন শতশত। তাদের মধ্যে কৃষিবিদদের অহঙ্কার কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি, মশিউর রহমান হুমায়ুনও সেদিন মারাত্মকভাবে আহত হন। আজও তারা সেই গ্রেনেডের স্পিস্নন্টার শরীরে বহন করে এক দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করছেন। তথাপি আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেদিন ঘাতকদের মূল টার্গেট ছিল শেখ হাসিনা। অলৌকিকভাবে আলস্নাহর রহমতে এবং জনগণের দোয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
শেখ হাসিনাকে শুধু ভালোবাসলেই হবে না, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে যাতে দেশি ও বিদেশি বিরোধী শক্তি যেন কোনোভাবেই ষড়যন্ত্র করে সফল হতে না পারে। দেশবাসীর কাছে অনুরোধ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে আরও শক্তিশালী করম্নন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ায় সহায়তা করম্নন।
পরিশেষে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ: ভাইস-চ্যান্সেলর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close