রহমতের বাণী নিয়ে এল মাহে রমজানযাযাদি রিপোর্ট মাহে রমজান এলো বছর ঘুরে/মুমিন মুসলমানের দ্বারে দ্বারে/রহমতেরই বাণী নিয়ে/মাগফেরাতের পয়গাম নিয়ে/এলো সবার মাঝে আবার ফিরে..... পাপী-তাপী আয়রে ছুটে/খোদার রহম তোরা নেরে লুটে/পাহাড় সমান গোনার বোঝা/দেবেন রহিম সবই ক্ষমা করে।
বছর ঘুরে রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের সওগাত নিয়ে আবারও এলো মাহে রমজান। শুরম্ন হলো সংযম সাধনার মাস। খোশ আমদেদ মাহে রমজান। এসেছে আলস্নাহ তাআলার অধিক থেকে অধিকতর নৈকট্য লাভের সেরা সময়, পরকালীন পাথেয় অর্জনের অভাবনীয় মৌসুম। সিয়াম-সাধনা, ইবাদত-বন্দেগি, যিকির-আযকার এবং

তাযকিয়া ও আত্মশুদ্ধির ভরা বসন্ত্ম। মহান আলস্নাহপাক এই মাসের প্রতিটি দিবস-রজনীতে দান করেছেন খায়ের-বরকত-মাগফিরাত এবং অফুরন্ত্ম কল্যাণের মুষলধারা।
ফার্সি শব্দ রোজার আরবি অর্থ হচ্ছে সওম, বহুবচনে সিয়াম। সওম বা সিয়ামের বাংলা অর্থ বিরত থাকা বা সংযম পালন করা। দৈনন্দিন জীবনে নানা রকম ভোগ-উপভোগ, প্রবৃত্তির চাহিদা, লোভ-লালসা ও ইন্দ্রিয় রাজির আবেদনসমূহকে অবদমিত রেখে এইসব কার্যকলাপ থেকে বিরত থেকে পূর্ণ সংযম পালন করা। ইসলামী পরিভাষায় আলস্নাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে তারই বিধান মতে সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত্ম পর্যন্ত্ম যাবতীয় পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকা।
এ সম্পর্কে আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, 'আর (রমজানের সিয়াম পালনকালে) তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাতের কালো রেখা হতে ভোরের সাদা রেখা স্পষ্টভাবে তোমাদের নিকট ফুটে না উঠে; এরপর সূর্যাস্ত্ম পর্যন্ত্ম সিয়াম পূর্ণ কর।' (আল-কুরআন : ২ :১৮৭) সুবহে সাদিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত্ম সময়কালে সম্পূর্ণ দিবা ভাগে পানাহার থেকে বিরত থেকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার প্রবল যাতনা উপলব্ধি করা। যে কখনও অনাহারে দিন কাটায়নি তার পক্ষে ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করাও সম্ভব নয়। সিয়াম সেই সহমর্মিতারই শিক্ষা দিতে আসে। নিজের আত্মার অনুভূতি দিয়ে অন্যের দুঃখ কষ্টকে অনুভব ও উপলব্ধি করার অনুশীলনের শিক্ষা-সবক নিয়ে আসে সিয়াম।
রোজা নৈতিক মূল্যবোধকে উন্নত করে; সংযমের মাধ্যমে রিপু দমন করে এবং রোজাদারদের দেহ ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। রোজা নর-নারীকে স্বার্থপরতা, জাগতিক মন্দ চিন্ত্মা-ভাবনা থেকে বিরত রাখে। প্রাথমিকভাবে রোজা হচ্ছে একটি আত্মিক অনুশাসন, নিয়ম শৃঙ্খলাপূর্ণ ইবাদত, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে আলস্নাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন।
এছাড়াও সহমর্মিতা ও আত্ম সংযমের মহান শিক্ষা সিয়ামের মাধ্যমে অর্জিত হয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর আবির্ভাবের পূর্বে প্রায় সব ধর্ম মতে পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে সিয়ামের পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। রোজার বিধান আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর সময় থেকে বিভিন্ন আদলে প্রবর্তিত এবং প্রচলিত রয়েছে। প্রত্যেক প্রেরিত ধর্মের বিধানসমূহের মধ্যে রোজার বিধান রয়েছে। জগতের প্রত্যেক ধর্ম-শিক্ষক প্রবৃত্তিসমূহের অবদমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রোজা পালনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি ও প্রচার করেছেন।
পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে: 'হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হলো; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।' (সুরা বাকারা-১৮৩)। আয়াতে উলিস্নখিত 'যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেয়া হয়েছিল' - কথাটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর দ্বারা হযরত আদম (আ.) থেকে শুরম্ন করে হযরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত্ম সকল উম্মত ও শরীয়তকে বুঝানো হয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেন, আলস্নাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, রোজা ছাড়া আদম সন্ত্মানের প্রত্যেকটি কাজই তার নিজের জন্য। তবে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর পুরস্কার দেব। তোমাদের কেউ রোজা রেখে অশস্নীল কথাবার্তায় ও ঝগড়া বিবাদে যেন লিপ্ত না হয়। কেউ তার সঙ্গে গালমন্দ বা ঝগড়া বিবাদ করলে শুধু বলবে, 'আমি রোজাদার।'
রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, রোজা এবং কোরআন কেয়ামতের দিন আলস্নাহর কাছে বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি তাকে (রমজানের) দিনে পানাহার ও প্রবৃত্তি থেকে বাধা দিয়েছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করম্নন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতের বেলায় নিদ্রা হতে বাধা দিয়েছি। সুতরাং আমার সুপারিশ তার ব্যাপারে কবুল করম্নন। অতএব, উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে (এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে)। (বায়হাকী) হাদিস শরীফে আরও এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন রমজানের প্রথম রাত আসে শয়তান ও অবাধ্য জিনদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। অতপর এর কোনো দরজাই খোলা হয় না।
নবী করীম (সা.) বলেছেন, কেউ যদি রোজা রেখেও মিথ্যা কথা বলা ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ না করে তবে তার শুধু পানাহার ত্যাগ করা (অর্থাৎ উপবাস ও তৃষ্ণার্ত থাকা) আলস্নাহর কোনো প্রয়োজন নেই।
এটা ধৈর্য্যের মাস। আর ধৈর্য্যের সওয়াব হলো বেহেশত। এটা সহানুভূতি প্রদর্শনের মাস। এটা সেই মাস যে মাসে মুমিন বান্দার রিজিক বাড়িয়ে দেয়া হয়। এ মাসে যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তা তার জন্য গুনাহ মাফের এবং দোযখের আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে। এছাড়া তার ছওয়াব হবে রোজাদার ব্যক্তির সমান। অথচ রোজাদার ব্যক্তির সওয়াব কমবে না।
আর যে ব্যক্তি এই মাসে আপন অধীনস্থ দাস-দাসীদের কাজের বোঝা হালকা করে দেবে মহান আলস্নাহ তাকে মাফ করে দেবেন এবং তাকে দোযখ থেকে মুক্তি দান করবেন। (বায়হাকী) প্রিয় নবীর প্রিয় সাহাবী হযরত আবু ওবায়দা (রা.) রমজানের গুরম্নত্ব সম্পর্কে আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হুজুর (সা.) এরশাদ করেছেন, রোজা মানুষের জন্য ঢালস্বরূপ যতক্ষণ পর্যন্ত্ম তা ফেড়ে না ফেলা হয় (অর্থাৎ রোজা মানুষের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে যতক্ষণ পর্যন্ত্ম তা নিয়ম অনুযায়ী পালন করা হয়)। (ইবনে মাজাহ, নাসাঈ) সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে এ সম্পর্কে আরেকটি বর্ণনা এসেছে। তিনি বলেছেন, হুজুর (সা.) এরশাদ করেছেন, অনেক রোজাদার ব্যক্তি এমন রয়েছে যাদের রোজার বিনিময়ে অনাহারে থাকা ব্যতীত আর কিছুই লাভ হয় না।
(ইবনে মাজাহ, নাসাঈ) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) আরও বলেছেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে শরীয়ত সম্মত কোনো কারণ ছাড়া রমজানের একটি রোজাও ভাঙে সে রমজানের বাইরে সারাজীবন রোজা রাখলেও এর বদলা হবে না।
আলস্নাহ পাক রমজান মাসের রোজা ফরজ করেছেন এবং এর রাতগুলোতে আলস্নাহর সামনে দ-ায়মান হওয়াকে নফল ইবাদত রূপে সুনির্দিষ্ট করেছেন। হাদিস শরিফে উলেস্নখ করা হয়েছে, যে ব্যক্তি এ রাতে আলস্নাহর রেজামন্দি, সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশে কোন ওয়াজিব, সুন্নাত বা নফল আদায় করবে, তাকে এর জন্য অন্যান্য সময়ের ফরজ ইবাদততুল্য সওয়াব প্রদান করা হবে। আর যে ব্যক্তি এ মাসে কোন ফরজ আদায় করবে, সে অন্যান্য সময়ের সত্তরটি ফরজ ইবাদতের সমান সওয়াব লাভ করবে। এ মাস ধৈর্য, তিতিক্ষা ও সবরের।
ধৈর্যের প্রতিফল হিসেবে আলস্নাহর নিকট থেকে জান্নাত লাভ করা যাবে। এটা পরস্পর সৌজন্য ও সহৃদয়তা প্রদর্শনের মাস। এ মাসে মুমিন বান্দাদের রিজিক প্রশস্ত্ম করে দেয়া হয়। এ মাসে যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে এর বিনিময়ে তার গুণাসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং জাহান্নাম হতে তাকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি দেয়া হবে। আর তাকে আসল রোজাদারের সমান সওয়াব দেয়া হবে। তবে সেজন্য আসল রোজাদারের সওয়াব বিন্দুমাত্র কম করা হবে না। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা আরজ করলাম- ইয়া রাসুলুলাহ, আমাদের মাঝে সকলেই রোজাদারকে ইফতার করানোর সামর্থ্য রাখে না তাহলে তারা কিভাবে এই পুণ্য লাভ করবে? তখন রাসুলুলস্নাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রোজাদারকে একটা খেজুর, দুধ বা এক ঢোক সাদা পানি দ্বারাও ইফতার করাবে, তাকেও আলস্নাহ পাক এই সওয়াব দান করবেন। আর যে ব্যক্তি একজন রোযাদারকে পূর্ণমাত্রায় পরিতৃপ্ত করবে আলস্নাহ পাক তাকে হাউজে কাউসার হতে এমন পানীয় পান করাবেন যার ফলে জান্নাতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত্ম সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close