logo
মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬

  কৃষিবিদ মো. আবু সায়েম   ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০  

আধুনিক পদ্ধতিতে পাট চাষ অধিক ফলন ও উন্নত আঁশ

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে উদ্ভাবিত সর্বশেষ দেশি জাতের মধ্যে বিজেআরআই দেশি পাট-৮ ও ৯ অন্যতম। এ জাত দুটির গড় ফলন ১০ মণ, জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন এবং বপনের উপযুক্ত সময় চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। বিজেআরআই দেশি পাট-৯ জাতের আঁশ তুলনামূলক সাদা এবং কম কাটিংসযুক্ত। পাট শাকের উপযোগী বিজেআরআই দেশি পাট শাক-১ ও বিনা পাট শাক-১ নামে দুটি জাত আছে। এ জাতগুলোতে বেশি শাক পাওয়া যায়, প্রচুর ভিটামিন এ সমৃদ্ধ এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক।

আধুনিক পদ্ধতিতে পাট চাষ অধিক ফলন ও উন্নত আঁশ
পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। দেশে উৎপাদিত পাটের শতকরা ৭০ ভাগ দেশে ব্যবহার হয়, বাকি ৩০ ভাগ কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্য হিসেবে রপ্তানি হয়। পাটের আঁশ থেকে পাটের সুতা, ব্যাগ, বস্তা, পর্দা, কার্পেট ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। পাটকাঠি থেকে পার্টিকেল বোর্ড, প্রিন্টারের কালি তৈরি হচ্ছে। সর্বশেষ পাট থেকে উৎপাদিত পলিথিনের বিকল্প পচনশীল ব্যাগ বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে সারা ফেলে দিয়েছে। এক হেক্টর বা সাড়ে সাত বিঘা জমিতে পাট চাষ করলে তা মোট তিন মাসের ১৫ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে এবং ১১ টন অক্সিজেন প্রকৃতিকে দেয়। এ ছাড়া পাটের পাতা প্রতিনিয়ত জমিতে মিশে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে, মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখছে। বর্তমানে বিঘা প্রতি পাটের ফলন ও গুণগতমান কোনটাই আশানুরূপ নয়। তাই আধুনিক পাট চাষের বিভিন্ন দিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বাজারজাতকরণের ওপর ভিত্তি করে পাটকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। পাট আঁশ বিক্রয়ের জন্য আঁশের মান উত্তম থেকে খারাপের ক্রমানুসারে এ-বটম, বি-বটম, সি-বটম, ক্রস বটম ও কাটিং শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।

পাটের উফশী জাত: বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে উদ্ভাবিত সর্বশেষ দেশি জাতের মধ্যে বিজেআরআই দেশি পাট-৮ ও ৯ অন্যতম। এ জাত দুটোর গড় ফলন ১০ মণ, জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন এবং বপনের উপযুক্ত সময় চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। বিজেআরআই দেশি পাট-৯ জাতের আঁশ তুলনামূলক সাদা এবং কম কাটিংসযুক্ত। তোষা জাতের মধ্যে ফাল্গুনী, বিজেআরআই তোষা পাট-৫, ৬ ও ৭ ভালো। ফাল্গুনী তোষা আগাম বপন উপযোগী আর বিজেআরআই তোষা পাট-৫, ৬ ও ৭ জাতগুলো চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বৈশাখের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত লাগানো যায়। গড় ফলন বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ এবং জীবনকাল ১২০ থেকে ১৫০ দিন। বিজেআরআই তোষা পাট-৬ জাতটির আঁশের মান ভালো এবং রঙ উজ্জ্বল সোনালি। পাট শাকের উপযোগী বিজেআরআই দেশি পাট শাক-১ ও বিনা পাট শাক-১ নামে দুটি জাত আছে। এ জাতগুলোতে বেশি শাক পাওয়া যায়, প্রচুর ভিটামিন এ সমৃদ্ধ এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক। বীজ বপনের মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যেই খাওয়ার উপযোগী হয়।

জমি নির্বাচন ও তৈরি : যেসব জমি মৌসুমের প্রথমে বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় না এবং বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এমন জমি নির্বাচন করতে হয়। পাটের জন্য একটু উঁচু বা মধ্যম উঁচু জমি নির্বাচন করা প্রয়োজন। পাটের বীজ খুব ছোট বলে পাট ফসলের জমি মিহি এবং গভীর করে চাষ দিতে হয়। পাট চাষের জন্য খরচ কমাতে হলে যেসব জমিতে আলু বা সবজি করা হয় সেসব জমিতে একবার চাষ করে মই দিয়ে পাট বীজ বপন করেও ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

সার ব্যবস্থাপনা : বীজ বপনের দিন প্রয়োজনীয় পরিমাণে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম এবং জিংক সালফেট সার জমিতে শেষ চাষে প্রয়োগ করে মই দিয়ে মাটির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয় কিস্তি অর্থাৎ ৪৫ দিনে ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ রস থাকে। দ্বিতীয় কিস্তি প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া সার কিছু শুকনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করা ভালো। ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন প্রয়োগকৃত সার গাছের কচি পাতায় এবং ডগায় না লাগে। সার ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করাটা বিজ্ঞানসম্মত হলে বেশি ভালো। আঁশ উৎপাদনের জন্য দেশি পাটের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া ২২ কেজি, টিএসপি ৩ কেজি, এমওপি ৪ কেজি, জিপসাম ৬ কেজি, দস্তা দেড় কেজি প্রয়োগ করা যেতে পারে। আর তোষা পাটের ক্ষেত্রে প্রতি বিঘায় ২০-২২ কেজি ইউরিয়া, ৩-৪ কেজি টিএসপি, ৪-৫ কেজি এওপি, ১২-১৩ কেজি জিপসাম ও দেড় কেজি দস্তা সার ব্যবহার করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, জৈব সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সার কম লাগে।

বীজের পরিমাণ ও চারার ঘনত্ব- ভালো এবং অধিক ফসল পেতে হলে রোগমুক্ত, পরিষ্কার পরিপুষ্ট ও মানসম্মত বীজ ব্যবহার করতে হবে। প্রচলিত এবং জনপ্রিয় পদ্ধতি হচ্ছে ছিটিয়ে বপন করা। সারিতে বপন করা কষ্টসাধ্য ব্যয়বহুল মনে হলেও এর উপকারিতা বেশি। এতে জমির সর্বত্র গাছের বিস্তৃত সমভাবে থাকে, পরিচর্যার সুবিধা হয়। সারিতে বপন করা হলে বীজের পরিমাণ কম লাগে এবং গজায়ও ভালো। ১২ ইঞ্চি দূরে দূরে সারি করে বীজবপন করলে সবচেয়ে ভালো হয়। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব সব সময় ঠিক রাখা না গেলেও পরিমিত অবস্থায় ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি ধরা হয়। সারিতে বীজবপন করার জন্য বীজবপন যন্ত্র বা সিডার ব্যবহার লাভজনক। সারি বপন করলে বিঘা প্রতি দেশি পাটের ক্ষেত্রে এক কেজি এবং তোষা পাটের ক্ষেত্রে ৬শ থেকে ৭শ গ্রাম বীজ লাগে। অন্য দিকে ছিটিয়ে বপন করলে বিঘা প্রতি দেশি পাটের ক্ষেত্রে দেড় কেজি এবং তোষা পাটের ক্ষেত্রে ১২শ থেকে ১৩শ গ্রাম বীজ লাগে।

নিড়ানি ও পাতলাকরণ : চারা গজানোর ১৫-২০ দিনের মধ্যে চারা পাতলা করা প্রয়োজন। সারিতে বপন করা হলে হাত দিয়ে বা ছিটিয়ে বপন করা হয়ে থাকলে আঁচড়া দিয়ে প্রাথমিকভাবে চারা পাতলা করা যায়। পাট গাছের বয়সের ৪০-৫০ দিনের মধ্যে একবার নিড়ানি দেয়ার সময় কৃষক কোনো কোনো ক্ষেতে চারাও পাতলা করেন। তবে বয়স ৬০-৭০ দিনের মধ্যে যে চারা পাতলা করা হয় তা টানা বাছ নামে এবং বয়সের ৮৫-৯০ দিনের মধ্যে চারার গোড়া কেটে যে পাতলা করা হয় তা কাটা বাছ নামে পরিচিত। এ কচি গাছ না ফেলে পচিয়ে খুব উন্নতমানের পাট পাওয়া যায়, যা সুতা তৈরি করায় ব্যবহৃত হতে পারে।

পানি নিষ্কাশন: পাটের জমিতে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন করা অত্যন্ত জরুরি। জমিতে পানি জমলে মাটির ভেতর বাতাস প্রবেশ করতে পারে না, ফলে গাছের শিকড়ের শ্বাস-প্রশ্বাস বিঘ্নিত হয়, গাছ স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না, ফলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে না এবং শেষ পর্যন্ত গাছ মারা যায়। দেশি পাটের জাত চারা অবস্থায় পানি সহ্য ক্ষমতা থাকে না। তবে এ জাতের গাছের বয়স ও উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। কিন্তু তোষা পাট চারা অবস্থায় পানি সহ্য করতে পারে না, এমনকি বড় হলেও দাঁড়ানো পানি বা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।

বালাই ব্যবস্থাপনা : জমিতে প্রতি বছর উড়চুঙ্গার আক্রমণ হলে বীজের পরিমাণ বাড়িয়ে বপন করতে হবে। আগুন উড়চুঙ্গা পোকাকে আকর্ষণ করে, তাই সন্ধ্যার সময় মাঠে আগুন জ্বালিয়ে রাখলে এ পোকা মারা যায়। অন্যান্য ক্ষতিকর পোকার মধ্যে বিছা পোকা, কাটওয়ার্ম, মাকড়, চেলে পোকা অন্যতম। রোগের মধ্যে হলুদ মোজাইক ভাইরাস, অ্যানথ্রাকনোজ বা শুকনা ক্ষত, কালো পট্টি ইত্যাদি রোগের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (আইপিএম) আলোকে রোগ-পোকা দমন ব্যবস্থাপনা নিতে হবে।

পাট কাটা ও বাছাইকরণ : আঁশের ফলন এবং মানের মধ্যে সমতা পেতে হলে ১শ থেকে ১শ ২০ দিনের মধ্যেই পাট কাটার প্রকৃত সময়। সাধারণত পাট গাছে যখন ফুল আসতে শুরু হয় তখন বা তার আগে প্রয়োজন মতো সুবিধাজনক সময় পাট কাটা হয়। কৃষক অনেক সময় ফলন বেশি পাওয়ার জন্য দেরিতে পাট কাটেন। পাট কাটার পর ছোট, বড়, মোটা ও চিকন গাছকে পৃথক করে আলাদা আলাদা আঁটি বাঁধতে হয়। একটি আটির ওজন ১০ কেজির হবে। ছোট ও চিকন এবং মোটা ও বড় পাটের গাছেরগুলোকে পৃথক পৃথকভাবে জাক দিতে হবে। পাটের আঁটি কখনও খুব শক্ত করে বাঁধা যাবে না। এতে পাট পচতে বেশি সময় লাগে। কারণ শক্ত আঁটির মধ্যে পানি পচনকালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারে না।

কম সময়ে ছাল পচানো : পচন সময় দুইভাবে কমানো যায়-১. প্রতি ১শ মণ কাঁচা ছালের জন্য আধা কেজি ইউরিয়া সার ব্যবহার করুন। ২. অথবা একটা ছোট হাঁড়িতে দুই একটি পাট গাছ ছোট ছোট টুকরা করে পচিয়ে নিন এবং পরে ছাল পচাবার সময় ওই পানি ব্যবহার করুন। ছাল পচতে খুব কম সময় লাগে, কাজেই ছাল পানিতে ডুবানোর ৭-৮ দিন পর থেকে পরীক্ষা করতে হয়। দুএকটা ছাল পানি থেকে তুলে ভালো করে ধুয়ে দেখতে হবে যদি আঁশগুলোকে বেশ পৃথক পৃথক মনে হয় তখনই বুঝতে হবে পচন সময় শেষ হয়েছে। সাধারণত ছাল পচনে ১২-১৫ দিন সময় লাগে।

আঁশ ধোয়া ও শুকানো : আঁশ ছাড়ানোর পর আঁশগুলোকে পরিষ্কার পানিতে ধোয়া উচিত। ধোয়ার সময় আঁশের গোড়া সমান করে নিতে হবে। এমনভাবে আঁশ ধুতে হবে যেন কোনো রকম পচা ছাল, ভাঙা পাটখড়ি, অন্য কোনো ময়লা, কাদা আঁশের গায়ে লেগে না থাকে। কারণ এতে পাটের মান নষ্ট হয় এবং বাজারে এসব আঁশের চাহিদাও কমে যায়। আঁশ ধোয়ার পর খুব ভালো করে আঁশ শুকানো উচিত। আঁশ কখনও মাটির ওপর ছড়িয়ে শুকানো উচিত নয়, কারণ তাতে আঁশে ময়লা, ধুলোবালি লেগে যায়। বাঁশের আড়ায়, ঘরের চালে, ব্রিজের রেলিং বা অন্য কোনো উপায়ে ঝুঁলিয়ে ভালোভাবে আঁশ শুকাতে হবে। ভেজা অবস্থায় আঁশ কখনই গুদামজাত করা উচিত নয়। কারণ এতে আঁশের মান নষ্ট হয়ে যায়।

লেখক: অতিরিক্ত উপপরিচালক (এলআর), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ী, ঢাকা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে