logo
মঙ্গলবার ২০ আগস্ট, ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

  কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন   ০২ জুন ২০১৯, ০০:০০  

মোকাবেলায় জলবায়ুর অভিঘাত আছে সহনশীল ধানের জাত

মোকাবেলায় জলবায়ুর অভিঘাত আছে সহনশীল ধানের জাত
বন্যা, খরা, জলমগ্নতা, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা সব ধরনের বৈরী পরিবেশের উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে ব্রি -যাযাদি
প্রাকৃতিক বৈরী পরিবেশের কারণে ফসলহানি এ দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল পরিবেশ উপযোগী ফসলের জাত বাছাই ও আবাদ করা কৃষকের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এ দেশের কৃষককূল ধানসহ অন্যান্য ফসলের জাত নির্বাচন করে আসছেন। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জোয়ারভাটা, জলমগ্নতা ও অতি ঠান্ডাসহ নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষকের দুর্দশা লাগবে সদা সচেষ্ট রয়েছেন দেশের ধান বিজ্ঞানীরা। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ব্রির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈরী পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্রি এখন পর্যন্ত ব্রি ১১টি লবণাক্ততা সহনশীল, ৬টি খরা সহিষ্ণু, ৩টি জোয়ারভাটা কবলিত নিম্নাঞ্চলে রোপণ উপযোগী, ২টি জলমগ্নতা সহিষ্ণু, ২টি ঠান্ডা সহনশীল জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়া ব্রি ধান চাষের ক্ষেত্রে সেচ নির্ভর আর্সেনিক দুষণযুক্ত এলাকায় আর্সেনিকের মাত্রা নিরূপণ সংশ্লিষ্ট তথ্যভিত্তিক এওঝ মানচিত্র তৈরি করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্রি ২০১২ সালে 'পরিবর্তিত জলবায়ু ও ধানভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তি' শীর্ষক বই প্রকাশ করেছে।

দেশের লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ১ মিলিয়ন হেক্টর। এসব এলাকায় চাষ উপযোগী ব্রি উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহনশীল জাতগুলো হচ্ছে বিআর২৩, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩ (আমন), ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৬১, ব্রি ধান৬৭ (বোরো), ব্রি ধান৭৩ (আমন) এবং ব্রি ধান৭৮ (আমন)। প্রায় ২ মিলিয়ন হেক্টরের অধিক জলমগ্ন এলাকায় চাষ করার জন্য ব্রি উদ্ভাবিত জলমগ্নতা সহনশীল (আকস্মিক বন্যা সহনশীল) জাতগুলো হলো ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২। দেশে জোয়ারভাটা কবলিত নিম্নাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ০.৪৭ মিলিয়ন হেক্টর। জোয়ারভাটা কবলিত নিম্নাঞ্চলে রোপণ উপযোগী ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলো হচ্ছে ব্রি ধান৭৬ (আমন), ব্রি ধান৭৭ (আমন), ব্রি ধান৭৮ (আমন) ও ব্রি ধান৭৯। দেশের প্রায় ১ মিলিয়ন হেক্টর খরা প্রবণ এলাকার জন্য ব্রি উদ্ভাবিত খরা সহনশীল জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩ (রোপা আমন), ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬ এবং ব্রি ধান৭১। দেশের উত্তর ও উত্তরপূর্বাঞ্চলের প্রায় ২ মিলিয়ন হেক্টর জমি ঠান্ডাপ্রবণ, যেখানে চাষ উপযোগী ঠান্ডা সহনশীল জাত হচ্ছে ব্রি ধান৩৬ ও ব্রি ধান৫৫। বর্তমান সরকারের গত দুই মেয়াদে দশ বছরে ব্রি চারটি হাইব্রিডসহ আউশ, আমন ও বোরো ধানের সর্বমোট ৪৩টি জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। যার প্রতিটিই বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কর্তৃক উদ্ভাবিত এসব ঘাত-সহনশীল ধানের জাত চাষে নতুন নতুন অনাবাদি জমি ধান চাষের আওতায় আসছে, যার কারণে ফলন বাড়ছে উলেস্নখযোগ্য হারে। ব্রির কৃষি অর্থনীতি বিভাগের জরিপে দেখা গেছে, ব্রি উদ্ভাবিত লবণাক্ত সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মোট লবণাক্ত এলাকার প্রায় ৩২ ভাগ এরিয়া ধান চাষের আওতায় এসেছে এবং এ থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮%। ব্রি উদ্ভাবিত খরাসহিঞ্চু জাতগুলো খরাপ্রবণ এলাকায় সম্প্রারণের মাধ্যমে ৫% আবাদ এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে যেখান থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২%। জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৪% এরিয়া চাষের আওতায় এসেছে যেখানে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৭%। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জোয়ার-ভাটা সহনশীল জাতগুলো উপকূলীয় এলাকায় সম্প্রসারণের ফলে উলেস্নখযোগ্য পরিমাণ জমি ধান চাষের আওতায় এসেছে। সর্বোপরি ঘাত সহনশীল প্রতিকূল ও অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের ফলে ২০১০-১৮ পর্যন্ত ৪.৮৮ লাখ টন হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

লবণাক্ততা সহনশীল জাত ও বৈশিষ্ট্য

ব্রি ধান৪৭ জাতটি লবণাক্ত এলাকায় বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। জাতটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মিটার এবং সমগ্র জীবনকাল-ব্যাপী ৬ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। এ জাতটি লবণাক্ত অঞ্চলের যেখানে সেচের পানির লবণাক্ততার মাত্রা ৪ ডিএস/মিটার পর্যন্ত আছে সেখানে অনায়াসেই বোরো মৌসুমে আবাদ করা যাবে। এ জাতের জীবনকাল ১৫২ দিন এবং গড় ফলন ৬.০ টন/ হেক্টর।

ব্রি ধান৬১ চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মি (৩ সপ্তাহ পর্যন্ত) লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। উপরন্ত এ জাতটি অংগজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যন্ত লবণাক্ততা সংবেদনশীল সকল ধাপে (ঝধষঃ ংবহংরঃরাব ংঃধমবং) ৮ ডিএস/মি মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করে ফলন দিতে সক্ষম।

ব্রি ধান৬৭ জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। জাতটি অংগজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যন্ত লবণাক্ততা সংবেদনশীল সকল ধাপে (ঝধষঃ ংবহংরঃরাব ংঃধমবং) ৮ ডিএস/মি মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করে ফলন দিতে সক্ষম। হেক্টর প্রতি ফলন ৬ টন।

ব্রি ধান৭৩ চারা অবস্থায় ১২ ডিএস/ মি. (৩ সপ্তাহ পর্যন্ত) লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। জাতটির জীবনকাল কম হওয়ায় (১২০-১২৫ দিন) উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ফসল কর্তনের পর মধ্যম উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ও লবণ সহনশীল/পরিহারকারী (ঊংপধঢ়রহম) সরিষা আবাদের সুযোগ তৈরি হবে। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে হেক্টরপ্রতি গড়ে ৪.৫ টন ফলন পাওয়া যায়।

জলমগ্নতা সহনশীল জাত ও বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশের নিচু থেকে মাঝারি নিচু যা মোট জমির শতকরা ২০ ভাগ বর্ষাকালে আকস্মিক বন্যায় সম্পূর্ণ তলিয়ে যায় এবং ১-২ সপ্তাহ জলমগ্ন থাকে ফলে ধানের ফলন বন্যার তীব্রতা অনুসারে আংশিক থেকে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষেত্রে ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২ বীজতলা কিংবা অংগজ বৃদ্ধি পর্যায়ে ১২-১৬ দিন পানিতে ডুবে থাকলেও চারা বা ধান গাছ মরে না, ফলে ফসল নষ্ট হয় না। ব্রি ধান৫১ হলে প্রচলিত স্বর্ণা জাত থেকে বেশি এবং স্বাভাবিক (বন্যামুক্ত) পরিবেশে স্বর্ণার ন্যায় সন্তোষজনক ফলন দেয়। ব্রি ধান৫২ আকস্মিক বন্যা প্রবণ অঞ্চলে রোপা আমন মৌসুমে ১২ থেকে ১৬ দিন জলমগ্ন হলে প্রচলিত বিআর১১ জাত থেকে বেশি এবং স্বাভাবিক পরিবেশে বিআর১১-র সমান ফলন প্রদান করে।

খরা সহনশীল জাতের বৈশিষ্ট্য

ব্রি ধান৫৬ একটি খরা সহনশীল এবং ব্রি ধান৫৭ মধ্যম মাত্রার খরা সহনশীল। জীবনকাল স্বল্প মেয়াদি হওয়ায় খরা আসার পূর্বেই ধানের দানা দুধ অবস্থা থেকে আধা শক্ত অবস্থায় চলে আসে। প্রজনন পর্যায়ে একটানা সর্বোচ্চ ৮-১০ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ব্রি ধান৫৭ এর ফলন হেক্টরে ৪.০ টন থেকে ৪.৫ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়।

ব্রি ধান৫৭ এর জীবনকাল আগাম উফশী জাত বিনা ধান৭ এর চেয়ে ১০ দিন এবং ব্রি ধান৩৩ এর চেয়ে ১৫ দিন কম। এ জাতের জীবনকাল স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় খরা আসার পূর্বেই ধানের দানা দুধ অবস্থা থেকে আধা শক্ত অবস্থায় চলে আসে। তাই এ জাতটিকে খরা পরিহারকারী জাত হিসেবে গণ্য করা যায়। প্রজনন পর্যায়ে একটানা সর্বোচ্চ ৮-১০ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ব্রি ধান৫৭ এর ফলন হেক্টরে ৪.০ টন থেকে ৪.৫ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়।

ব্রি ধান৬৫ বোনা আউশ মওসুমে খরা সহনশীল স্বল্প জীবনকালীন (৯৯ দিন) আগাম আউশ ধানের জাত। দেশের বিভিন্ন খরা প্রবণ এলাকায় কৃষকের মাঠে পরীক্ষার পর সরাসরি মাঠে বপনের জাত হিসেবে জাতীয় বীজ বোর্ড ২০১৪ সালে অনুমোদন করে। ব্রি ধান৬৫ বোনা আউশ মওসুমে খরা সহনশীল স্বল্প জীবনকালীন (৯৯ দিন) ধানের জাত। ফলন হেক্টরপ্রতি ৩.৫ টন।

ব্রি ধান৬৬ একটি খরা সহনশীল জাত। প্রজনন পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৫-২০ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন খরা প্রবণ এলাকায় কৃষকের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জাতীয় বীজ বোর্ড ২০১৪ সালে অবমুক্ত করে। ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৫ টন।

ব্রি ধান৭১ একটি খরা সহনশীল জাত। প্রজনন পর্যায়ে সর্বোচ্চ ২১-২৮ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। সে সময় চবৎপয ধিঃবৎ :ধনষব ফবঢ়ঃয হড়ৎসধষ থেকে ৭০-৮০ সে. মি. নিচে থাকলে এবং মাটির আদ্রতা ২০% এর নিচে হলেও এ জাতটি হেক্টরে ৩.৫ টনেরও বেশি ফলন দিতে সক্ষম। মধ্যম মাত্রার খরা হলে হেক্টরে ৪.০ টন এবং খরা না হলে ৫.০ টন ফলন দিতে পারে।

জোয়ারভাটা কবলিত নিম্নাঞ্চলে রোপণ উপযোগী জাত ও বৈশিষ্ট্য

ব্রি ধান৭৬ জোয়ারভাটা কবলিত নিম্নাঞ্চলে রোপণ উপযোগী আমন ধানের জাত। এ জাতের ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারার উচ্চতা ৭০-৭২ সে.মি. হওয়ায় স্বাদু পানিযুক্ত জোয়ারভাটা কবলিত নিম্নাঞ্চলে রোপণ করার উপযোগী। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৫৩ দিন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৪.৫ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে জোয়ারভাটা সহ্য করে হেক্টরে ৫.০ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে।

ব্রি ধান৭৭ জোয়ারভাটা কবলিত নিম্নাঞ্চলে রোপণ উপযোগী আমন ধানের জাত। এ জাতের ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারার উচ্চতা ৭০ সে.মি. হওয়ায় জোয়ারভাটা কবলিত নিম্নাঞ্চলে রোপণ করার উপযোগী পূর্ণবয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১৪০ সেমি। কান্ড শক্ত বিধায় ঢলে পড়ে না। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৪.৫ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে জোয়ারভাটা সহ্য করে হেক্টরেপ্রতি ৫.০ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।

জোয়ারভাটা ও লবণাক্ততা সহনশীল জাত ও বৈশিষ্ট্য

ব্রি ধান৭৮ এ আধুনিক উফশী ধানের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। রোপা আমন মৌসুমে সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত উপকূলীয় জোয়ারভাটা ও লবণাক্ততাপ্রবণ (৬-৮ ফঝ/স) অঞ্চলের জন্য জাত হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। তবে উপকূলীয় জোয়ারভাটা প্রবণ কম লবণাক্ত অঞ্চলে (৪-৫ ফঝ/স ) হেক্টর প্রতি ৫.৫-৬.০ টন ফলন দিতে পারবে।

লেখক: ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে