logo
সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

  কৃষিবিদ মো. আজিম উদ্দিন   ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০  

বাংলাদেশের বীজ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের বীজ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা
ভালো বীজে ভালো ফলন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি টেকসই করতে ভালো বীজের বিকল্প নেই -যাযাদি
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ করে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত সুখী সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে উন্নীত করার লক্ষ্যে বীজ শিল্প ও প্রযুক্তিতে গতিশীলতা আনয়নসহ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে বীজ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষির উন্নয়নে বীজই অন্যতম মুখ্য উপকরণ। বীজ ভালো না হলে অন্যান্য উপকরণের ব্যবহার ফলপ্রসূ হয় না, কখনও কখনও একেবারেই অপচয় হয়। এটা পরীক্ষিত যে, মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারে শতকরা ১৫-২০ ভাগ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। সুতরাং মানসম্পন্ন বীজকে কেন্দ্র বিন্দু ধরেই স্থিতিশীল খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে উন্নত জাত ও মানের বীজের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই দেশে মানসম্পন্ন বীজের ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানসম্পন্ন বীজের গুরুত্ব অনুধাবন করে এবারে জাতীয় বীজ মেলা-২০১৯ আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখবে মানসম্পন্ন বীজের ব্যবহার।'

বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে না জমি। মানুষের খাদ্য চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলছে, বর্ধিত জনসংখ্যার স্থিতিশীল খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বর্তমান সময়ে কৃষির মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬০.৭৫ মিলিয়ন, ধারণা করা হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে তা বেড়ে গিয়ে হবে ১৭০ মিলিয়ন। এমতাবস্থায়, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৫-৬ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে হলে দরকার বীজ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। কম জমিতে অধিক ফলন পেতে হলে সব চাষের জমিতে পর্যায়ক্রমে মানসম্মত বীজ ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ এখন নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে; আগামী ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান পাবে। ফলে দ্রম্নত গতিতে আমাদের শিল্পেরও উন্নতি হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষিতে নানাবিধ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে এবং কৃষিতে যান্ত্রিকরণ হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় হতে বীজ ব্যবসার জন্য ৩২,০০০ বীজ ডিলারকে নিবন্ধন প্রত্যয়ন প্রদান করা হয়েছে। প্রায় ৯০,০০০ চুক্তিবদ্ধ চাষির মাধ্যমে সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের চাষিদের হাতের নাগালে এখন উন্নত জাত ও মানের বীজ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশেও হাজার হাজার টন বীজ ব্যবহার হচ্ছে, অনেক বড় বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি বীজ ব্যবসা করছে। বীজ ব্যবসার সফলতার মূল ভিত্তি হলো 'বীজ প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন।'

বীজকে নিয়ে এখন শিল্প গড়ে উঠেছে। এ শিল্পের উৎপাদিত পণ্য হচ্ছে ভালো বীজ। বীজ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে ভালো বীজ পাওয়া যায়। তাই বীজ শিল্পের অন্তর্নিহিত চালিকাশক্তি হচ্ছে বীজ প্রযুক্তি। বিভিন্ন ফসলের বীজে বীজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বীজ শিল্পের জন্য ভালো বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। সভ্যতা শুরুর আদি প্রযুক্তি হচ্ছে বীজ প্রযুক্তি। সভ্যতার সময় বিকাশের সঙ্গে বীজ তথা বীজ প্রযুক্তির অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়েছে। উদ্যান সভ্যতার উন্নততর থেকে উন্নততর স্তরে নিয়ে বীজ প্রযুক্তিবিষয়ক নব নব আবিষ্কার বীজ প্রযুক্তিকে উন্নত হতে উন্নততর স্তরে নিয়ে যাচ্ছে। তাই বীজ প্রযুক্তির ব্যবহার আগামীতে সভ্যতার স্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেই বেড়ে চলবে।

বীজ প্রযুক্তির কার্যাবলি : একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাধারণত ধাপে ধাপে এগুতে হয়। ফসল উৎপাদনে ভালো বীজ ব্যবহারের জন্যও এমনি ধাপে ধাপে কিছু কাজ করতে হয়।

গবেষণা ও জাত উন্নয়ন : জাত হচ্ছে বীজ প্রযুক্তি বাস্তবায়নের চাবি। সঠিক চাবি না থাকলে তালাবদ্ধ ঘরে প্রবেশ করা কষ্টসাধ্য। তেমনি একটি নির্দিষ্ট জাত না হলে বীজপ্রযুক্তির অন্য কাজগুলো বাস্তবায়ন শুরু করা যায় না। এ জন্য দরকার জাত উন্নয়নের মাধ্যমে সঠিক জাত উদ্ভাবন এবং বাছাই করা। বাংলাদেশে জাতীয় গবেষণা সিস্টেমের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি পর্যায় হতে জাত গবেষণা ও উন্নয়ন করা হয়।

বীজ পরিবর্ধন : কাঙ্ক্ষিত জাতের সামান্য পরিমাণ বীজ প্রজননবিদ অতি যত্নের সঙ্গে উৎপাদন করে। এ অল্প পরিমাণ বীজ চাষ করে পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয়। এভাবে দু'তিন বছর ধরে পরিমাণ বৃদ্ধি করে তা কৃষকের নিকট ফসল ফলানোর জন্য বিতরণ বা বিক্রয় করা হয়। বর্তমানে প্রজনন বীজকে ভিত্তি, প্রত্যায়িত ও মানঘোষিত এ চারটি শ্রেণিতে পরিবর্ধন করা হয়। মানঘোষিত শ্রেণির বীজ ছাড়া অন্য তিনটি শ্রেণির বীজকে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি মাঠমান এবং বীজমান যাচাই করে জাতীয় বীজ বোর্ডের নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রত্যয়ন দিয়ে থাকে; প্রকৃতপক্ষে প্রত্যায়িত বীজই ভালো বীজ।

প্রক্রিয়াজাতকরণ : পরিবর্ধিত বীজের মধ্যে নানারকম খড়কুটো, অবীজ, চিটা, পোকা ইত্যাদি থাকতে পারে। তাই পরিবর্ধিত বীজ সরাসরি চাষে ব্যবহারের যোগ্য হয় না। তা ছাড়া বীজ সংগ্রহের পর পরবর্তী ফসল চাষের মৌসুম পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হয়। বীজ পরিষ্কার করা, সংরক্ষণ করা, প্যাকিং করা ও শোধন করা এ কাজগুলো একত্রে বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ।

মান নিশ্চিতকরণ : বীজমান নিশ্চিত করতে না পারলে সে বীজ ভালো বীজ হয় না। তাই মান নিশ্চিতকরণ বীজ প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ জন্য বীজ ফসলের মাঠ পরিদর্শন এবং পরিবর্ধিত বীজ গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে মান নিশ্চিত করা হয় এবং নিম্ন মানসম্পন্ন বীজ বিপণন করা হয় না। মান নিশ্চিতকরণের কাজ বীজ প্রযুক্তির অন্তর্গত কাজগুলোর সব ক'টিতে প্রয়োগ করতে হয়।

বীজ বিপণন : বীজ প্রযুক্তি সিঁড়ির শেষ ধাপ হচ্ছে বীজ বিপণন। বীজ বিপণনের মাধ্যমে কৃষক ভালো বীজের সরবরাহ পায় এবং ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষক তা ব্যবহার করে থাকে। বীজ বিপণন সুষ্ঠু না হলে ভালো বীজ সঠিক সময়ে, সঠিক মোড়কে, সঠিক মূল্যে কৃষকের নিকট সরবরাহ সম্ভব হয় না। অন্যান্য কার্যাবলি ফলপ্রসূ করতে বীজ বিপণন অপরিহার্য। বর্ণিত কার্যাবলি ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়। জাত না পেলে যেমন অন্যান্য ধাপের প্রয়োগ সম্ভব নয় তেমনি সরাসরি বীজ বিপণন করা সম্ভব নয় যদি ভালো বীজ পরিবর্ধন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ না করা যায়। আবার মান নিশ্চিতকরণ ধাপ পালিত না হলে অন্যান্য ধাপ কোন কাজে আসে না। তাই কাজগুলো শুধু সম্পাদন করা নয় ধারাবাহিকভাবে করলে ফলপ্রসূ হয়।

বীজ ব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের সর্ববৃহৎ সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এ সংস্থাটি ১৯৬২-৬৩ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন মাত্র ১৩ টন বীজ সরবরাহের মাধ্যমে বীজ কর্মসূচি শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ বেড়ে যায়। তখন বীজের গুণগতমান রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বীজের মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রত্যয়নের জন্য ১৯৭৪ সালে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে নার্সভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হতে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ছাড়কৃত জাতের প্রজনন শ্রেণির বীজ সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএডিসি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সরবরাহ করা হয়।

বাংলাদেশে গড়ে সব ফসলের বীজ প্রতিস্থাপনের হার ২৬%। যেখানে শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল ও ভারতে ২০% এর কম। বাংলাদেশের প্রায় ৭৫% আবাদি জমি ধান চাষের আওতাভুক্ত, স্বাভাবিকভাবেই ধান প্রধান ফসল হিসেবে এর জন্য বীজের প্রয়োজন ও বেশি লাগে। তিন মৌসুমে ধান চাষ করা হয়। আউশ মৌসুমে প্রায় ৬০% মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করা হয়, আমনে ৩০% এবং বোরো মৌসুমে ১০০% মানসম্পন্ন বীজ চাষিরা ব্যবহার করে। গম বাংলাদেশের দ্বিতীয় ফসল; এ ক্ষেত্রে ৫০% বীজ মানসম্পন্ন। ভুট্টার ক্ষেত্রে ৯৮% জমিতে আমদানিকৃত হাইব্রিড ভুট্টা বীজ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও পাটের ক্ষেত্রে ৯৩% মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করা হয়। আলু বীজের ক্ষেত্রে চাষিরা ১৩% মানসম্পন্ন প্রত্যায়িত বীজ ব্যবহার করে। সবজি বীজের ক্ষেত্রে ৮৫% জমিতে চাষিরা হাইব্রিড সবজি বীজ ব্যবহার করে।

সরকারের নানামুখী কর্মসূচির কারণে কৃষক পর্যায়ে ভালো বীজের ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে বিএডিসি সর্বমোট ১,৪০,০০০ টন উচ্চফলনশীল বিভিন্ন ফসলের গুণগতমানসম্পন্ন বীজ চাষি পর্যায়ে সরবরাহ করে। অন্যদিকে বেসরকারি পর্যায় হতে ২০০৫-০৬ সালে ১৩,৫০০ টন বীজ সরবরাহ করা হয়, ২০০৮-০৯ সালে বীজ সরবরাহ করা হয় ৬২,০০০ টন; যা ২০১৮-১৯ সালে ১,২১,৭০০ টনে উন্নীত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ বীজ সরবরাহের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে এবং বীজ প্রতিস্থাপনের হার ৫০% হলে উৎপাদনশীলতাও অনেক বেড়ে যাবে। অনেকের ধারণা বাংলাদেশের বীজ ব্যবস্থা আমদানি নির্ভর কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়।

বর্তমানে সরকার বেসরকারি সেক্টরকে সব ফসলের বীজ গবেষণার সুযোগ দিয়ে বাস্তবসম্মত যুগোপযোগী 'বীজ আইন-২০১৮' প্রণয়ন করেছে। উদ্ভিদের জাত সুরক্ষা ও জাতের অধিকার প্রদানের জন্য উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন-২০১৯ প্রণয়ন করেছে। বীজ আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য 'উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ আইন-২০১১ ও বিধি-২০১৮' প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও দেশে-বিদেশে প্রতিযোগিতামূলক একটি যুগোপযোগী বীজ নীতি-২০১৯ প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী কয়েক বছরে আইনগুলোর সফল বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের বীজ শিল্প এশিয়া মহাদেশের মধ্যে একটি স্থায়ী অবস্থান অর্জন করবে।

\হ

লেখক: প্রধান বীজ প্রযুক্তিবিদ, কৃষি মন্ত্রণালয়
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে