logo
শনিবার ২৪ আগস্ট, ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬

  আবুল কাসেম ফজলুল হক   ১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

চাই জনগণের গণতন্ত্র

চাই জনগণের গণতন্ত্র
'জনগণের গণতন্ত্র' বা 'নয়াগণতন্ত্র' নাম দিয়ে গণতন্ত্রের সমাজতন্ত্র অভিমুখী বিশেষ রূপ ও প্রকৃতি নির্দেশ করেছিলেন রাশিয়ায় জোসেফ স্টালিন এবং চীনে মাও সেতুং-স্বতন্ত্রভাবে, প্রধানত নিজ নিজ দেশ ও জনগণের উন্নত জীবনের প্রয়োজনে। তারা নতুন রাশিয়া, নতুন চীন ও নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করেছিলেন।

স্টালিন পৃথিবীর সব জাতিকে সামনে নিয়ে চিন্তা করেছিলেন তৎকালীন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের ও পুঁজিবাদী রাশিয়ার অভিজ্ঞতাকে পটভূমিতে রেখে। একইভাবে মাও সেতুং পৃথিবীর সব জাতিকে সামনে নিয়ে চিন্তা করেছিলেন তৎকালীন পশ্চিমা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী গণতন্ত্রের ও পুরাতন চীনের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি ভূমিতে রেখে। পশ্চিমা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ও গণবিরোধী প্রকৃতি সম্পর্কে দুজনই গভীরভাবে অবহিত হয়েছিলেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পথ ধরে কমিউনিজমে উত্তীর্ণ হওয়া এবং কমিউনিজমের পথ ধরে এগিয়ে চলা ছিল তাদের লক্ষ্য।

ভবিষ্যৎ ভাবনার ও অগ্রযাত্রার এ ধারায় ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী, কিংবা আধাসামন্তবাদী-আধা-উপনিবেশবাদী, কিংবা অসংগঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের মাঝখানে একটা অন্তর্বর্তীকালীন নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন তারা অনুভব করেছিলেন। তাদের উদ্ভাবিত সেই অন্তর্বর্তীকালীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই তারা অভিহিত করেছিলেন জনগণের গণতন্ত্র বা নয়াগণতন্ত্র বলে। এর দ্বারা তাদের দেশে সামন্তবাদী শক্তির ও সাম্রাজ্যবাদের দালালদের কর্তৃত্বের অবসান ঘটানো হয়, আর জাতির অন্তর্গত প্রগতিশীল সব শক্তির সহযোগে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পুরনো সীমাবদ্ধতা ও অপশক্তির কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করে সামাজিক ন্যায় বৃদ্ধির ও জাতীয় পুঁজির বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। সংস্কৃতিকে ক্রমে পুরাতন সংস্থার বিশ্বাস থেকে মুক্ত করে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি ও মার্কসীয় মতাদর্শে উত্তীর্ণ করা হয় এবং জনসাধারণকে শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা দ্বারা সমৃদ্ধিমান রাখা হয়। জনগণের গণতন্ত্রে শ্রমিক, কৃষক, বৃহত্তর মধ্যবিত্ত ও জাতীয় ধনিকদের বাস্তবসম্মত স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষা করা হয়। সেই সঙ্গে পরবর্তী ধাপে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। সমাজতন্ত্রে উৎপাদনযন্ত্রের ব্যক্তিমালিকানার অবসান ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং প্রত্যেককে সামর্থ্য অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য শ্রম দেয়ার এবং প্রদত্ত শ্রমের অনুপাতে উৎপন্ন পাওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়।

স্টালিন ও মাও সেতুংয়ের ওইসব লেখা আমি পড়েছি ১৯৬০-এর ও '৭০-এর দশকে। এর মধ্যে অনেক সময় পার হয়ে গেছে- বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে ঘটে গেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। অতীতের যে কোনো শিল্পবিপস্নবের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী এই পরিবর্তন। সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিলুপ্ত করে পনেরোটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের বাকি দশটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। চীন পর্যায়ক্রমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র থেকে সরে যাচ্ছে। পৃথিবী হয়ে পড়েছে এককেন্দ্রিক-ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক। আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে আগ্রাসী যুদ্ধ চালিয়ে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। অতু্যন্নত প্রযুক্তি নিয়ে পৃথিবীকে সাজানো হচ্ছে গণবিরোধী ধারায়। বিশ্বব্যাপী মানুষের নৈতিক চেতনা ক্ষয় পেয়ে যাচ্ছে- মানুষ অমানবিকীকৃত হয়ে চলছে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় জনগণের জন্য দরকার সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাজনৈতিক কাজের সম্পূর্ণ নতুন ধারা।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপের পর অতু্যন্নত প্রযুক্তি নিয়ে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীরা বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের যে রূপ দিয়েছে, বাংলাদেশেও গণতন্ত্রের নামে যে উদ্যোগ-আয়োজন চালানো হচ্ছে, তাতে সর্বজনীন কল্যাণে গণতন্ত্রের জন্য সম্পূর্ণ নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী গণতন্ত্রের জায়গায় অবশ্যই জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রশ্ন হলো জনগণের গণতন্ত্র কী? জনগণের গণতন্ত্রের রূপ-প্রকৃতি তৈরি নেই- তৈরি করে নিতে হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে গণতন্ত্রের নামে যে শ্রমশক্তি ও চিন্তাশক্তি ব্যয় করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণই গণবিরোধী কাজের জন্য। সিভিল সোসাইটিগুলো এই দুই দলের রাজনীতিকে সফল করার জন্যই কাজ করে যাচ্ছে।

মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন ও মাও সেতুংয়ের উদ্দেশ্য ছিল মহান। তাদের ধারা ভেঙে গেল কেন, তা গুরুতর অনুসন্ধানের ব্যাপার। জনগণের মুক্তি ও উন্নতির উপায় যারা সন্ধান করবেন, অবশ্যই তাদের মার্কস ও মার্কসবাদীদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা গ্রহণের অর্থ অবশ্য তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করা নয়।

আজকের বাস্তবতায় জনগণের গণতন্ত্রের বা নয়াগণতন্ত্রের বা গণতান্ত্রিক গণরাষ্ট্রের ধারণার মধ্যে অতীতের সমাজতন্ত্রের ধারণা ও অভিজ্ঞতাকে সংশ্লেষিত করে নিতে হবে। জনগণের গণতন্ত্রকে নিতান্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে না ভেবে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে ভাবতে হবে। অতি দ্রম্নত এগোলে অগ্রগতি রক্ষা করা যায় না।

এখানে আমি চেষ্টা করছি আমাদের গত সোয়াশ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোকে এবং আমার নিজের গত পঞ্চাশ বছরের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য জনগণের গণতন্ত্রের বা গণতান্ত্রিক গণরাষ্ট্রের রূপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু ধারণা ব্যক্ত করতে। বুঝতে হবে যে, গত তিন দশকের মধ্যে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা পরাশক্তির হাতে চলে গেছে বা তুলে দেয়া হয়েছে এবং পুরাতন পরাজিত সব সংসার বিশ্বাসকে পরিকল্পিতভাবে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। ইতিহাসের গতি উল্টে ফেলা হয়েছে, এবং সেই উল্টো গতি বেগবান আছে। পৃথিবীজুড়েই বইছে উল্টো হাওয়া। প্রগতিবাদী চিন্তা ও কর্মের ধারা কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ বাস্তবতার মধ্যে নয়াগণতন্ত্রের জন্য আমাদের চিন্তা ও কাজ করতে হবে। ধ্বংসাত্মক চিন্তা নয়, গঠনমূলক চিন্তা চাই। ভাঙতে হবে নতুন করে সৃষ্টি করার জন্য।

জনগণের গণতন্ত্র, সংক্ষেপে জনগণতন্ত্র হলো শ্রমিক, কৃষক, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্য-মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও জাতীয় ধনিকদের মর্যাদা ও ন্যায়স্বার্থ প্রতিষ্ঠার ও সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রগতিশীল অগ্রযাত্রার গণতন্ত্র। জনগণতন্ত্রের জন্য গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে- রাষ্ট্রব্যবস্থার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে- পুনর্গঠিত, নবায়িত ও বিকাশশীল করতে হবে। নয়াগণতন্ত্রে, বিদেশের দালালি করে জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করার তৎপরতা কঠোরভাবে বন্ধ রাখা হবে এবং জাতির আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করে, জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা করে, নিজেদের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী বাইরের জগৎ থেকে গ্রহণ করে, উন্নতির উপায় করতে হবে। যারা বিদেশের দালালি করে এবং জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে, তাদের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণের বাইরে ধরতে হবে। যে কোনো শর্তে বিদেশি ঋণ ও সাহায্য গ্রহণ করা হবে না- ঋণকে সম্পূর্ণভাবে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করতে হবে। জাতির আত্মনির্ভরতা, আত্মশক্তি বৃদ্ধি ও স্বাধীনতার জন্য যা কিছু দরকার হয়, সবই করতে হবে। অন্যায় অবিচার থেকে মুক্তির জন্য, আত্মবিকাশ ও সমৃদ্ধির জন্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও মানবতার জন্য, শান্তি ও প্রগতির জন্য স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া দুর্বল দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো পরনির্ভর ও পরাধীন হয়ে আছে।

জনগণতন্ত্র কেবল ভোটাভুটির মাধ্যমে সরকার গঠনের ব্যাপার হবে না, এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে সমগ্র জনগণের আর্থ-সামাজিক রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও কর্মনীতি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, জনজীবন ও জাতীয় চিন্তাভাবনাকে পুনর্গঠিত করতে হবে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রনীতির সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতিরও আমূল সংস্কার করতে হবে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য (ঁহরঃু রহ ফরাবৎংরঃু) বা বহুত্ববাদী সমন্বয়ের (ঢ়ষঁৎধষরংঃরপ ংুহঃযবংরং) নীতি অবলম্বন করে চলতে হবে। বৈচিত্র্য বা বহুত্বে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি গুরুত্ব দিতে হবে ঐক্যে ও সমন্বয়ে। প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো বৈচিত্র্যে বা বহুত্বে এবং কখনো ঐক্যে ও সমন্বয়ে গুরুত্ব বেশি দিতে হবে। একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি সর্বজনীন কল্যাণের পরিপন্থি।

জনগণতন্ত্রের জন্য নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। এজন্য জনগণতান্ত্রিক আদর্শের দলকে প্রভূত জনসমর্থন অর্জন করতে হবে এবং সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাধিক্য নিয়ে ক্ষমতায় যেতে হবে। আর দলকে জনগণতান্ত্রিক ধারায় উন্নতির কর্মসূচি অবলম্বন করে ভেতর থেকে ভালোভাবে সংগঠিত হতে হবে।

জনগণতন্ত্রের লক্ষ্য নিয়ে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় গেলে হবে না; ক্ষমতায় যাওয়ার আগে ও পরে আদর্শগত, সাংগঠনিক, কর্মসূচিগত কর্মনীতিগত সব রকম প্রস্তুতি ও কাজ সম্পন্ন করে পথ চলতে হবে। জনগণের নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গড়ে তুলতে হবে জনগণতান্ত্রিক আদর্শের জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক দল ও তার সম্পূরক সাংস্কৃতিক সংগঠন। সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলো অভীষ্ট লক্ষ্যে জনগণের চিন্তাধারা পরিবর্তনের আন্দোলন, যা সাংস্কৃতিক সংগঠন দ্বারা পরিচালিত হবে। জনগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল পরিকল্পনা করবে জনগণের ভবিষ্যৎ প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থার রূপ ও প্রকৃতি। জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল অবলম্বন হবে জনগণতান্ত্রিক দল। রাষ্ট্রের সংবিধানে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ, প্রশাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষানীতি ইত্যাদি সব কিছুরই নবায়িত রূপ-স্বরূপ স্পষ্টভাবে বর্ণিত রাখতে হবে। আজকের বাস্তবতা বিচার করে এবং ধর্ম, মতবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং বিশ্বায়ন ইত্যাদি বিচার করে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপ ও প্রভৃতি নিরূপণ করতে হবে এবং তাতে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয়, রাষ্ট্রীয় ও আন্তরাষ্ট্রিক সম্পর্কের আদর্শ রূপে গড়ে তুলতে হবে। জনগণতন্ত্র হবে বিকাশশীল। বলাই বাহুল্য, বর্তমানে, কর্মরত বাংলাদেশের বামপন্থি ও ডানপন্থি দলগুলোর মতো কোনো দল গঠন করা হলে তাতে জনগণতন্ত্রের পথে কোনো অগ্রগতি হবে না। জনগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হবে সর্বজনীন কল্যাণে নিবেদিত, জ্ঞানবান, নৈতিক বলে বলীয়ান, সম্পূর্ণ নতুন বৈশিষ্ট্যের দল। সব রকম প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জনগণতন্ত্র বাস্তবায়নের ও সর্বাঙ্গীণ উন্নতির লক্ষ্যে সামনে চলতে হবে।

জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলই হবে কেন্দ্রীয় ব্যাপার। সরকারের চেয়ে দলের গুরুত্ব বেশি বই কম হবে না। দলই থাকবে মূলে, তার ওপর সরকার। দল হবে মূল নীতিনির্ধারক ও নেতৃত্বকারী শক্তি, সরকার হবে নির্বাহী শক্তি। জনগণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করবে দলের গুণগত অবস্থার ওপর। দলের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত রাখতে হবে।

ব্যক্তি, দল ও সরকারের সম্পর্কের মধ্যে এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তির সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। সর্বজনীন কল্যাণের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সৃষ্টিশীল কাজের সুযোগ, সংগঠন করার স্বাধীনতা ইত্যাদির বিরোধের ন্যায়সঙ্গত মীমাংসা পরিপূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে জাতীয় সংসদে আইন তৈরি করে আইনের বাস্তবায়নের মাধ্যমে করতে হবে। 'জোর যার মুলস্নুক তার', 'টাকা যার দুনিয়া তার'-এসব প্রবণতার কারণ অনুসন্ধান করা হবে এবং কারণ যথাসম্ভব দূর করা হবে।

দলীয় নেতৃত্বে ও সরকারি ক্ষমতায় বংশাণুক্রমিক উত্তরাধিকার, স্বজনপ্রীতি, পরিবারতন্ত্র, দলীয়করণ ইত্যাদির সুযোগ রাখা হবে না। সর্বজনীন কল্যাণে ও সম্প্রীতিতে পরিপূর্ণ গুরুত্ব দেয়া হবে।

দল লিখিত সংবিধান অবলম্বন করে কাজ করবে। দলের ঘোষণাপত্র ও সংবিধান এবং রাষ্ট্রের সংবিধান সব সময় জনগণের মধ্যে প্রচার করা হবে। দলের ভেতরে নিয়মিত জ্ঞান ও আদর্শের চর্চা করা হবে। জাতীয় উন্নতির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দল থেকেই জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য দেয়া হবে।

রাষ্ট্রে বিভিন্ন আদর্শের দলের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে, তা দলের সংবিধানে এবং রাষ্ট্রের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বর্ণিত রাখা হবে। জনগণের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠন ও সমাজ গঠনের মূল অবলম্বন রূপে জনগণতান্ত্রিক দলকে গড়ে তুলতে হবে। দলকে চলতে হবে অন্যান্য দলের সঙ্গে সুস্থ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়ে। দল একবার ক্ষমতায় এলে চিরকালের জন্য এসে গেল- এমন ধারণার কোনো স্থান থাকবে না।

বাংলাদেশে বর্তমানে সমাজে যার ক্ষতি করার শক্তি যত বেশি, তার প্রভাব প্রতিপত্তি তত বেশি। সর্বজনীন কল্যাণ সাধনের চিন্তা ও চেষ্টা এ সমাজে গুরুত্ব পায় না। জনগণতন্ত্রে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক গণরাষ্ট্রে এ অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টে ফেলা হবে।

জনগণতন্ত্রের যারা বিরোধী তাদেরও অর্জনের লক্ষ্য, পরিকল্পিনা ও কর্মসূচি থাকবে। তারা সাধারণত সর্বজনীন স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে দেখবে। তারা নিজেদের সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি যোগ্য মনে করেন। নৈতিক বিবেচনাহীন, ক্ষমতালিপ্সু, কর্তৃত্বলিপ্সু, অর্থগৃধ্নু, সম্পত্তিলোভী লোকেরা জনগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে। তারা জনসাধারণকে ভাঁওতা দেবে- জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা করবে। তারা বিদেশি অপশক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হীন উপায়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ও স্বার্থ হাসিল করতে তৎপর থাকবে। আর জনগণতন্ত্রীরা সব রাষ্ট্রের প্রগতিশীল শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনগণের দিক থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কাজ করবে। জনগণতন্ত্রীদের মূল প্রতিযোগিতা হবে জনগণতান্ত্রিক আদর্শের বিরোধী সব শক্তির সঙ্গে। জনগণতন্ত্রীরা তাদের বিরোধীদের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করবেন।

কোনো রাষ্ট্রে জনগণতান্ত্রিক আদর্শের দল একাধিক হতে পারে এবং তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা দুই-ই চলতে পারে। নৈতিক শক্তি, আদর্শনিষ্ঠা ও কর্মসূচি অবলম্বন ইত্যাদি দিক দিয়ে যারা বেশি উন্নত হবে, তারাই জনগণের সমর্থন লাভ করবে এবং জয়ী হবে। কোন দিক দিয়ে এর অন্যথা ঘটলে জনগণতন্ত্রীদের জন্য এবং জনগণের জন্যও সংকট দেখা দেবে।

নির্বাচনের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ গঠন ও সরকার গঠন জনগণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য অঙ্গ। যেরকম নির্বাচন পদ্ধতি বাংলাদেশে আছে তা পরিবর্তন করে সর্বজনীন কল্যাণে নতুন নির্বাচন পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। নির্বাচন হবে দলভিত্তিক এবং সরকার গঠিত হবে বিভিন্ন দলের নির্বাচিত সদস্যদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। যেসব দলের সদস্যসংখ্যা মোট সদস্যসংখ্যার দশ শতাংশের কম হবে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব মন্ত্রিপরিষদে থাকবে না। অপর সব দলের নির্বাচিত সদস্যদের অনুপাতে প্রত্যেক দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হবে। এ ব্যবস্থায় প্রায় সব দলেরই প্রতিনিধিত্ব থাকবে মন্ত্রিপরিষদে। নির্বাচন পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।

জনগণতন্ত্র বিষয়ে বিবেকবান চিন্তাশীল সব নাগরিকেরই মত প্রকাশ করা কর্তব্য। যে গণতন্ত্র বাংলাদেশে চলছে তার জায়গায় সর্বজনীন কল্যাণে জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া রাজনীতির উৎকৃষ্ট কোনো উপায় পাওয়া কঠিন।

বাংলাদেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে নয়াগণতন্ত্রের জন্য বৌদ্ধিক জাগরণ, সেই সঙ্গে গণজাগরণ-দুটোই অপরিহার্য। জাতির নবজন্মের কোনো বিকল্প নয়।

জনগণ চাইলেই এবং চেষ্টা করলেই সম্ভব হবে নয়াগণতন্ত্র উদ্ভাবন ও প্রতিষ্ঠা, অন্যথায় হবে না। গণতন্ত্রের নামে গণনির্যাতন ও গণশোষণ নয়, চাই জনগণের গণতন্ত্র-জনগণতন্ত্র।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে