logo
বৃহস্পতিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  আহমদ রফিক   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

আর কত ছাড় ঋণখেলাপিদের জন্য?

এবারের বাজেট মধ্যবিত্তবান্ধব নয়, বরং উচ্চশ্রেণির সুবিধাভোগীদের বাজেটে পরিণত হয়েছে। এ সত্যটাই বাজেট আলোচনা প্রসঙ্গে সংবাদপত্রে প্রকাশ পেয়েছে আক্ষেপের সুরে। দু-একটি উদ্ধৃতি : 'মধ্যবিত্তের চাপ বাড়ল। ধনীদের বেশ ছাড়'। একটি পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে মোটা হরফে শিরোনাম : 'বাজেটে চাপে পড়বে মধ্যবিত্ত'। উদ্ধৃতি না বাড়িয়ে বলি, বাজেট তো হওয়া উচিত সর্বশ্রেণিবান্ধব। কিন্তু বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তা কি কখনো হয়েছে? পরিবর্তে ধনী আরও ধনী, গরিব আরও গরিব হচ্ছে- একথাটাই প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে শ্রেণিসংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। সুষ্ঠু ব্যবস্থা না নিলে লক্ষ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কয়েক লাখ কোটিতে গিয়েও থামবে না, বাড়তেই থাকবে, তখন...?

কয়েক দশক ধরে একাধিক পত্রিকায় কলাম লিখেছি; কিন্তু জাতীয় বাজেট নিয়ে কিছু লিখিনি, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের হাতে ছেড়ে রেখেছি, অর্থনীতির মামলা বলে কথা। কিন্তু এবার অর্থনীতির ছাত্র না হয়েও বিশেষজ্ঞদের অভিমতের পরিপ্রেক্ষিতে একজন বোধ ও বুদ্ধির সাধারণ নাগরিক হিসেবে কিছু বলার ও লেখার তাগিদ অনুভব করছি।

কারণটি স্পষ্ট, সহজবোধ্য এবং আবারও বলি, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের হিসাব-নিকাশে। একসময় ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তা ছিলাম দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে, শিল্পের ভালো-মন্দ নিয়ে কিছু বোধ ও অভিজ্ঞতা সে সময়কার। সেগুলো মরে যায়নি। বরং বছরের পর বছর দেখতে দেখতে তিক্ত অভিজ্ঞতার বৃত্তটি ক্রমেই বড় হয়েছে। মনে প্রশ্ন জেগেছে, সরকার কেন ব্যবসায়ী স্বার্থঘাতী হবে?

আর যে কথা এ রচনার পেছনে মূল তাগিদ, তা হলো এটা একজন সাধারণ শিক্ষিত মানুষও বোঝেন, ঋণ দিয়ে ঋণ ফেরত না পাওয়া গেলে তার ফল ঋণদাতার জন্য শুভ হয় না্তএটা এক সাধারণ সূত্র। এটা বুঝতে অর্থনীতিবিদ বা অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। অনেক উদাহরণ তা স্পষ্ট করে দেয় এবং দিয়েছে।

ঋণ দিয়ে ঋণ ফেরত না পেয়ে একদা ব্যাংক দেউলিয়া হয়েছে, অর্থনীতির সে এক ভয়ংকর ঘটনা এবং তা অনেকের সর্বনাশ ঘটিয়ে ছেড়েছে। অন্যদের কথা থাক। প্রজাবান্ধব রবীন্দ্রনাথের উদাহরণই যথেষ্ট। তিনি দরিদ্র কৃষকদের মহাজনদের সর্বগ্রাসী থাবা থেকে রক্ষা করতে মুসলমানপ্রধান কালিগ্রাম পরগনার পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন (১৯০৫) ধারদেনা করে।

এককথায় বলি- জনপ্রিয় সে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেল ১৯২৫ সালের পর মূলত প্রদত্ত ঋণ কৃষকের ঘর থেকে ফেরত না আসায় এবং সরকার কৃষক স্বার্থে রুরাল টেনেন্সি অ্যাক্ট চালু করায়, যে জন্য ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা না থাকায়। ফলে ঋণ করে আনা টাকা কবির নোবেল পুরস্কারের টাকাসহ কালিগ্রাম কৃষি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে নাগর নদীতে ভেসে গেল। রবীন্দ্রনাথ একদিক থেকে নিঃস্ব হয়ে গেলেন। এখন অবশ্য সেসব সমস্যা নেই, ব্যাংক দেউলিয়া হয় না।

দুই.

দেউলিয়া না হলেও ব্যাংক খেলাপি ঋণ অনাদায়ের কারণে সমস্যা সংকটে জর্জরিত হতে পারে। বেশ কিছুদিন থেকে সংবাদপত্রগুলোতে খেলাপি ঋণের অনাদায়ে ব্যাংকের উদাসীনতা এবং সরকার তরফে আত্মঘাতী অর্থনৈতিক প্রবণতা নিয়ে খবর পরিবেশন ও বিচার-বিশ্লেষণ চলতে দেখেছি আর তখনই মনে পড়েছে ঋণখেলাপিদের দায় এড়াতে নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ছেড়ে আসার বাধ্যবাধকতার কথা।

বিষয়টি নৈতিক। ঋণ নিয়ে ঋণ শোধ করার দায় নৈতিকতার মধ্যে পড়ে। একবারে পরিশোধ নয়, দীর্ঘমেয়াদি শিডিউলে ঋণ পরিশোধ সদিচ্ছা থাকলে সেটা মোটেই অসম্ভব নয়, কারো জন্য কষ্টকর হয়তো হতে পারে। কিন্তু আদায়ের মেয়াদ দীর্ঘ, তাতে বড় বেশি চাপ সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়, যদি প্রতিষ্ঠানে সততা ও সুশাসন বজায় থাকে। এককথায় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায় দীর্ঘ মেয়াদে হলেও ঋণ শোধ করা।

আর এ ঋণ আদায়ের প্রাথমিক ও প্রধান দায় যেমন ঋণদাতা ব্যাংকের, তেমনি পরোক্ষ দায় ব্যাংকগুলোর নৈতিক পরিচালক কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের এবং সেই সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পপতিরা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে এত শক্তিমান যে ব্যাংক দূরে থাক, রাষ্ট্রযন্ত্রকেই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না।

তাই তারা খেলাপি ঋণ মেয়াদি শোধেরও তাগিদ অনুভব করেন না; বরং আরো ঋণ, আরো ঋণ নিয়ে ঋণের অঙ্ক বাড়াতে থাকেন। সে ঋণের টাকা কতটা শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের কাজে ব্যয় হলো, কতটা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ভোগে-উপভোগে লাগল, বলতে অপচয় হলো তা দেখার কেউ নেই। বিষয়টি ব্যক্তিগত অধিকারের এখতিয়ারভুক্ত হলেও ঋণদাতা ব্যাংকের অধিকার রয়েছে যাচাই করার যে গৃহীত ঋণ কথিত কাজে লাগানো হলো কি না তা নিশ্চিত করা।

এ নিয়মতান্ত্রিক, নৈতিক দায়-কর্তব্য ব্যাংক যথাযথভাবে পালন করলে ব্যাংক প্রদত্ত ঋণ খেলাপি চরিত্র অর্জন করতে পারে না। এখানে যত ঘাটতি। এ ঘাটতির দায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের উদাসীনতার পেছনে যে গূঢ় কারণ রয়েছে আমাদের কারো অজানা নেই, এককথায় শব্দটি হলো দুর্নীতি।

তিন.

প্রশ্ন উঠতে পারে, ঋণখেলাপিদের ওপর চাপ সৃষ্টির বদলে তাদের ঢালাও সুবিধা। এত সুবিধা দিচ্ছে কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো? এ প্রশ্নের জবাব এককথায় এর আগে উলেস্নখ করেছি। জবাবটা রাজনৈতিক তাৎপর্যে প্রসারিত করতে চাইলে বলতে হয়, এর মূল কারণ সুবিধাবাদ ও সুবিধাভোগী সমাজ ও রাজনীতি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্রেণিগুলো সুবিধাদানে ও সুবিধা অর্জনে পরস্পরনির্ভর, আরো স্পষ্ট ভাষায় পরস্পরের স্বার্থনির্ভর। কাজেই সে ক্ষেত্রে দুয়ে দুয়ে চার না হয়ে পাঁচ বা সাত হলেও ক্ষতি নেই।

খেলাপি ঋণের উৎস, ক্রমান্বয় বৃদ্ধি ও অনাদায় কথা বলতে গেলে আরো দু-একটি রাজনৈতিক সত্যের উলেস্নখ প্রয়োজন। পাকিস্তান আমল নিয়ে একটি কিংবদন্তিসম আপ্তবাক্য এখনো বাংলাদেশে উচ্চারিত হয়ে থাকে, এই দু'দিন আগেও দেখেছি এক বিশ্লেষকের লেখায়। সেটা হলো পাকিস্তানের ২২ পরিবারের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার কথা, যা ছিল অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা।

কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি পূর্ব ঐতিহ্যমাফিক ছাত্র, যুবা ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাত ধরে এগিয়েছে এবং সে হিসেবে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম বা স্বাধীন বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম ছিল না। এ রাজনৈতিক শাসন ও রাজনীতি ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থবাহক। কিন্তু ক্রমে এর চরিত্র বদল ঘটেছে। বাংলাদেশে দ্রম্নত সীমাবদ্ধ অর্থনীতির বিকাশ এবং ধনী ও অতি ধনীর অবিশ্বাস্য ভার্টিক্যাল উন্নতি সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করেছে, শ্রেণিগত বৈষম্যও প্রকট করে তুলেছে।

প্রতাপশালী, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল এখন আর মধ্যবিত্ত মননশীলতার প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং প্রতিনিধি ও স্বার্থবাহক শিল্পপতি, বৃহৎ ব্যবসায়ীকুল ও অনুরূপ ফাটকাবাজদের, মুনাফাবাজদের যারা অর্থবলে সমাজ ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে পূর্বোক্ত ২২ পরিবারের চেয়েও বেশি শক্তিমত্তায়। তাই যেমনটা বলেছি, সংবাদপত্রে খেলাপি ঋণিদের মুক্তবিহারে সরকারি মদদ নিয়ে বিস্তর লেখাজোখা। কিন্তু সমস্যা হলো এসব লেখায় কান দিচ্ছে না কেউ।

দু-তিনটি শিরোনাম উদ্ধৃতিই যথেষ্ট। কিন্তু এরই মধ্যে জুন মাস এসে গেছে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে লেখায় পত্রিকার পাতাগুলো গরম, বিশেষ করে পৃষ্ঠা থেকে সম্পাদকীয় দপ্তর। এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম : 'উৎসাহিত হবেন ঋণখেলাপিরা'। লিখেছেন একজন স্বনামধন্য ব্যাংকার-অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, 'বাংলাদেশের অর্থসম্পদ শতকরা ৫ ভাগ মানুষের হাতে পুঞ্জিভূত'। শতকরা হিসাবে না হলেও মোটা দাগে এ কথাটা ইদানীং একাধিক লেখায় উদ্ধৃত।

পূর্বোক্ত বিশেষজ্ঞ আরও লিখেছেন উলিস্নখিতদের চরিত্র-বিশ্লেষণে, 'তারাই ঠিকমতো কর দেন না। ওই গোষ্ঠীকে আঘাত করতে না পারলে অনুমিত আয় আদায় করা সম্ভব হবে না।' বলা বাহুল্য যে এ অনাদায়ের পেছনে রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতির উচ্চস্তর থেকে সর্ব নিম্নস্তর পর্যন্ত। প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলেও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না কেন? নিলে তো সরকারি কোষাগার খানিকটা হলেও ভরে উঠত। অথচ এরাই সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা ও অভাবিত নিরাপত্তা ভোগ করে আসছে।

সরকার পক্ষে এজাতীয় উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ কারও মন্তব্য : 'অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষে গেছে বাজেট'। সিপিডির এ বিশ্লেষণ পুরোটাই বাজেট প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গেছে। আমরা এখানে আলোচনা করছি শুধু ঋণখেলাপিদের নিয়ে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, তাদের মালিকরা কে কত ব্যাংকঋণ নিয়েছেন এবং কতটা শোধ করেছেন তা খুঁজে বের করতে। ভালো পরামর্শ। তবে এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব রয়েছে। রয়েছে এমন নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব, যাতে ঋণখেলাপিরা ঋণ ফেরতে বাধ্য হন। তাতে তো সরকারেরও লাভ।

এ আলোচনা দীর্ঘ হতে পারে। তবে সীমিত পরিসরে আমাদের পর্যালোচনায় শেষ কথা হলো আগের উলিস্নখিত শ্রেণিচরিত্র বদলের কারণে উচ্চবিত্ত শ্রেণি এখন বিপুল সুবিধাভোগী স্তরে উন্নীত, তাদের সমর্থক রাজনীতি ও শাসনযন্ত্র। তাই শত সমালোচনা সত্ত্বেও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না; বরং অবাধ সুবিধার দ্বার খুলে রাখা হয়েছে তাদের জন্য। তার প্রভাব পড়েছে এবারের বাজেটে।

এবারের বাজেট মধ্যবিত্তবান্ধব নয়, বরং উচ্চ শ্রেণির সুবিধাভোগীদের বাজেটে পরিণত হয়েছে। এ সত্যটাই বাজেট আলোচনা প্রসঙ্গে সংবাদপত্রে প্রকাশ পেয়েছে আক্ষেপের সুরে। দু-একটি উদ্ধৃতি : 'মধ্যবিত্তের চাপ বাড়ল। ধনীদের বেশ ছাড়'। একটি পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে মোটা হরফে শিরোনাম : 'বাজেটে চাপে পড়বে মধ্যবিত্ত'।

উদ্ধৃতি না বাড়িয়ে বলি, বাজেট তো হওয়া উচিত সর্বশ্রেণিবান্ধব। কিন্তু বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তা কি কখনো হয়েছে? পরিবর্তে ধনী আরো ধনী, গরিব আরও গরিব হচ্ছে- একথাটাই প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে শ্রেণিসংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। সুষ্ঠু ব্যবস্থা না নিলে লক্ষ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কয়েক লাখ কোটিতে গিয়েও থামবে না, বাড়তেই থাকবে, তখন...?

আহমদ রফিক

কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে