logo
বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬

  শওকত হোসেন   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

তরুণ ও উদ্যোক্তাদের কী বলছে বাজেট

বাজেটে অনেক ভালো ভালো কথা আছে। কিন্তু আসল সুফল আসবে বাস্তবায়ন দক্ষতা ও সততায়। নয়-ছয় বলে একটা বাংলা প্রবাদ চালু আছে। আমাদের বাজেটের ক্ষেত্রে সেটা নয়-তিন। সম্পূরক বাজেটে নয় মাসের (জুলাই ২০১৮-মার্চ ২০১৯), খরচ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৬ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা আর ১২ মাসের সংশোধিত বাজেট ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ২ লাখ ৩৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে, যা নয় মাসের ব্যয়ের অধিক। শুধু অধিক নয়, নয় মাসের প্রকৃত ব্যয়ের অনুপাতে কার্যক্রম চললে খরচ হওয়ার কথা ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪২১ কোটি টাকা তাড়াহুড়া করে খরচ করা হবে; যার অনেকটাই অপব্যয়, অপচয় বা দুর্নীতির গ্রাসে যাবে। বাজেটকে এই নয়-তিনের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দরকার হলে চলমান বাজেট পদ্ধতি চালু করা হোক। জুনে সব টাকা খরচ করতে হবে, না হলে টাকা ফেরত যাবে- এ চিন্তাধারা গুণগত ব্যয়ের অন্তরায়।

প্রায় সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকার আজদাহা বাজেট। প্রতি বছর বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে ঘাটতিও। এ বছর বাজেটের ঘাটতি ১০ বছর আগের বাজেটের (২০০৯-১০ সালে ৯৪,১০০ কোটি টাকা) প্রায় দেড় গুণ। বাজেট ক্রমে বাড়ছে, এটাও বাজেট বক্তৃতায় সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। মোটা হওয়া সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা রোগের নিদর্শন। অর্থাৎ সংখ্যা বা আকার নয়, ব্যয়ের খাতের উপযুক্ততা, ব্যয়ে মিতব্যয়িতা এবং বাস্তবায়নের গুণগত মানই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। দেখা প্রয়োজন আমরা দুধ বেচে মদ খাচ্ছি, না মদ বেচে দুধ খাচ্ছি। যদি আমরা একটা ভালো খাত/কাজ বা পণ্যে করারোপ করে সেই অর্থ দিয়ে এমন একটা কার্যক্রম চালু করি, যা জনগণকে হয়রানি করছে অথবা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ব্যাহত করছে, তাহলে বাজেট ছোট হওয়াই কাম্য। আর যদি উল্টোটা হয়, অনাকাঙ্ক্ষিত কাজকে শাস্তি (শুল্ক বা করের মাধ্যমে) দিয়ে লব্ধ অর্থ একটা ভালো কাজে (প্রাথমিক শিক্ষা বা প্রাথমিক স্বাস্থ্য) ব্যয় করা হচ্ছে, তবে বাজেট বড় হওয়া সবার কাম্য।

তরুণদের চাওয়া সম্মানজনক কর্ম। দেশে প্রতি বছর ২০-২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে ঢুকছেন। তাদের কতজন অর্থপূর্ণ কর্মে নিযুক্ত হতে পারছেন? আমাদের ১৩১ পৃষ্ঠা বাজেট বক্তৃতায় বেকারত্ব বা চাকরি সৃজনের কোনো পরিসংখ্যান নেই। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি মাসে বেকারত্বের হার প্রকাশিত হয়। সেটার হ্রাস সরকারের সাফল্য এবং বৃদ্ধি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের বাজেটের দক্ষতার মূল মাপকাঠি বা কি পারফরম্যান্স ইনডিকেটর কী? আমরা প্রত্যেক বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা দেখি। ২০১৯-২০ সালের জন্য ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেটের শুরুতে গত বছরের বিভিন্ন সাফল্যের বর্ণনা দিয়েছেন, যেমন রাজস্বের পরিমাণ, মাথাপিছু আয়, বাজেটের আকার, রেমিট্যান্সের পরিমাণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, স্বাস্থ্য খাতের কিছু পরিমাপক, শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছু সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিমাপক ইত্যাদি। কোথাও বেকারত্বের হারের উলেস্নখ নেই।

কোনো জিনিস নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আগে তা পরিমাপ করতে হয়। বেকারত্ব কি আদৌ আমাদের প্রাধিকার তালিকায় আছে?

তরুণদের প্রশিক্ষণের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যাতে তারা চাকরির বাজারের উপযোগী হয়ে উঠতে পারেন। ২০৩০ সালের মধ্যে তিন কোটি যুবককে প্রশিক্ষিত করে তোলার পরিকল্পনা আছে সরকারের। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ২৭ লাখ চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। খুব প্রয়োজনীয় ভাবনা। এতে দুটো জিনিস ফুটে উঠেছে, বেকারত্ব একটা বড় সমস্যা। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও চাকরির জন্য যোগ্যতার মধ্যে ফারাক আছে, সেটা দূর করা প্রয়োজন। এ ফারাক দূর করার জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। বর্তমানে প্রতি বছর ২০-২২ লাখ তরুণ-তরুণী চাকরি বাজারে ঢুকছেন। ১০০ কোটি টাকা মানে মাথাপিছু মাত্র ৫০০ টাকা। ১২-১৪ বা ১৬ বছরের শিক্ষা যাদের কর্মোপযোগী করতে পারেনি, মাথাপিছু ৫০০ টাকা ব্যয় করে তাদের যোগ্যতার সেই ঘাটতি ঘুচিয়ে দেয়া হবে? খুব উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। কিন্তু খুবই প্রয়োজনীয়।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতির লভ্যাংশ যদি আমরা করায়ত্ত করতে চাই, তবে এ রকম সুনির্দিষ্ট ও উপযুক্ত লক্ষ্য নির্ধারণ প্রয়োজন। পর্বত যত খাঁড়া, আরোহণ তত দুরূহ। লক্ষ্য হাসিলের জন্য প্রয়োজন বিশাল কর্মযজ্ঞ। আমাদের পোশাক শিল্পের বয়স প্রায় ৪০ বছর। এ শিল্প এত বছরে ৪০-৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। সেখানে ১১ বছরে তিন কোটি কর্মসংস্থান? খুব কঠিন লক্ষ্য। সেজন্য দুটো ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন, যথা উদ্যোক্তা তৈরি এবং এসএমই খাত।

বাজেটে স্টার্টআপের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নিঃসন্দেহে সুখবর। সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। যদিও টাকার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ৫ লাখ ২৬ হাজার ১৯১ কোটি টাকার বাজেটে শূন্য দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। তবুও ভালো। হাত খুলুক। প্রশ্ন হলো বণ্টন বা ব্যবহারের যথার্থতা নিয়ে। আগে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতো। এবার নারী উদ্যোক্তা বাদ দিয়ে স্টার্টআপের জন্য সরকারের বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকা। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা ১০০ কোটি টাকার কত খরচ হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, কতজন নারী উদ্যোক্তা সহায়তা পেয়েছেন বা নতুন তৈরি হয়েছেন, তা জানা দরকার। সরকারের আগের বরাদ্দকৃত ইইএফের সাফল্য কতটুকু, সেটা জানা দরকার। বরাদ্দকৃত টাকা যতই অপ্রতুল হোক, যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পরবর্তী সময়ে আরো অর্থের সংকুলান হতে পারে। এমনকি ব্যক্তি খাতও স্টার্টআপে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। ভারতে সিডবি (স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া) সরকারের কাছ থেকে এসএমই খাত উন্নয়নের জন্য সহায়তা পায়। তারা সরাসরি এসএমই উদ্যোগে অথবা কোনো ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডে বিনিয়োগ করে। শর্ত থাকে, ওই ফান্ডে তহবিল ব্যবস্থাপক ম্যাচিং ফান্ডের ব্যবস্থা করবে অথবা ফান্ডের ৫০ শতাংশ উদ্দিষ্ট খাতে বিনিয়োজিত হবে। অর্থাৎ সিডবি যদি কোনো তহবিলে ১০ কোটি রুপি বিনিয়োগ করে তাহলে ওই তহবিল কমপক্ষে ২০ কোটি রুপি কিংবা ওই তহবিলের ফান্ড সাইজ যদি ১০০ কোটি রুপি হয় তাহলে কমপক্ষে ৫০ কোটি রুপি এসএমই খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। সুতরাং সরকার স্টার্টআপের জন্য বরাদ্দকৃত ১০০ কোটি টাকার কিছু অংশ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশনে নিবন্ধনকৃত তহবিল ব্যবস্থাপকদের দায়িত্বে দিতে পারে। তহবিল ম্যাচিং করার শর্ত দিয়ে। তাতে তিনটি লাভ হবে, পেশাদার ব্যবস্থাপকদের হাতে দায়িত্ব দেয়ার ফলে অপেক্ষাকৃত ভালো ফলাফল আশা করা যায়। দ্বিতীয়ত, পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপকদের যৌথভাবে বিনিয়োগে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তৃতীয়ত, ম্যাচিং তহবিলের শর্ত জুড়ে দিয়ে যে পরিমাণ টাকা দেবে, কমপক্ষে তার দ্বিগুণ সুবিধা পাওয়া যাবে।

আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড নিয়ে খুবই উৎসাহী। প্রত্যেক দেশ একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে এ ডিভিডেন্ড পেয়ে থাকে। কেউ কাজে লাগাতে পারে, কেউ পারে না। সত্তরের দশকে দক্ষিণ কোরিয়া ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের পর্যায়ে পৌঁছে। এটিকে কাজে লাগিয়ে দেশটির মাথাপিছু আয় এখন ৩৯ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারে পৌঁছে গেছে। কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল একটি দেশ এ পর্যায়ে আসতে পেরেছে তিনটি কারণে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মাধ্যমে জন্মহার কমানো, সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ। আমাদেরও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। শিক্ষার বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। মান বাড়াতে হবে। অন্যথা জনমিতির লভ্যাংশ নয়, লোকসান হয়ে দাঁড়াবে।

বাজেটে অনেক ভালো ভালো কথা আছে। কিন্তু আসল সুফল আসবে বাস্তবায়ন দক্ষতা ও সততায়। নয়-ছয় বলে একটা বাংলা প্রবাদ চালু আছে। আমাদের বাজেটের ক্ষেত্রে সেটা নয়-তিন। সম্পূরক বাজেটে নয় মাসের (জুলাই ২০১৮-মার্চ ২০১৯), খরচ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৬ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা আর ১২ মাসের সংশোধিত বাজেট ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ২ লাখ ৩৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে, যা নয় মাসের ব্যয়ের অধিক। শুধু অধিক নয়, নয় মাসের প্রকৃত ব্যয়ের অনুপাতে কার্যক্রম চললে খরচ হওয়ার কথা ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪২১ কোটি টাকা তাড়াহুড়া করে খরচ করা হবে; যার অনেকটাই অপব্যয়, অপচয় বা দুর্নীতির গ্রাসে যাবে। বাজেটকে এই নয়-তিনের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দরকার হলে চলমান বাজেট পদ্ধতি চালু করা হোক। জুনে সব টাকা খরচ করতে হবে, না হলে টাকা ফেরত যাবে- এ চিন্তাধারা গুণগত ব্যয়ের অন্তরায়।

শওকত হোসেন

বিডি ভেঞ্চারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে