logo
সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

  ড. আর এম দেবনাথ   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

ব্যাংকিং ব্যবস্থা : ভুল সবই ভুল

এই যে পরিস্থিতি তা কি ভুল সিদ্ধান্তের ফল, তা কি বিনা বিচারে আন্তর্জাতিক আইনবিধি পালনের ফল? তা কি পুরোটাই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণে হচ্ছে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এখন সর্বত্র। শুধু আমাদের দেশে নয়, এই খেলাপি সমস্যা আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। কোম্পানি ধরে ধরে খেলাপির সম্পদ বিক্রি করা হচ্ছে। অর্ধেক টাকাও আদায় হচ্ছে না। বছর দুই ধরে নতুন ঋণ বন্ধ। ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রহীতারা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর প্রভাব পড়ছে জিডিপি, প্রবৃদ্ধির হারে। বড় বড় কোম্পানি পড়েছে ভীষণ বিপদে। আরও বিপদ আমেরিকার ব্যবহারে। তারা ভারতীয় পণ্যের ওপর করারোপ করেছে। ভারতও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। একই অবস্থা চীনের। দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বায়ন ও বাজার অর্থনীতি ছিল সারা বিশ্বের লক্ষ্য তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্নবিদ্ধ করছে স্বয়ং আমেরিকা। তারা এখন বাজার অর্থনীতি মানে না। তাদের কথা চীন আমেরিকার বাজার দিয়ে বড়লোক হয়েছে। আমেরিকা ঠকেছে।

কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি ভুল করে? করে, তবে তা মাত্রার মধ্যে। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুলের কোনো শেষ নেই। তাদের অবহেলা, দায়িত্বহীনতারও কোনো শেষ নেই। এই নিবন্ধের শুরুতে আমি দুটো মারাত্মক ভুলের কথা আলোচনা করব যার ফলে ব্যাংকিং খাত আজও ভুগছে। প্রথম ভুলটি 'পর্যাপ্ত পুঁজির' সংজ্ঞা নিয়ে। ১৯৬২ সালের ব্যাংকিং অর্ডিন্যান্সে একটি ব্যাংক কত পুঁজি রাখবে তার সীমা বেঁধে দেয়া হয়। বলা হয় আমানতের (ডিপোজিট) দশ শতাংশ একটি তফসিলি (শিডিউল্ড) ব্যাংক পুঁজি রাখবে। এই ভুলটি স্বাধীনতার পরেও অব্যাহত থাকে। থাকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত যখন ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্ট করা হয়। বাতিল হয় ব্যাংকিং অর্ডিন্যান্স। এই যে সংজ্ঞা এর মধ্যে ভুল কী? ভুল তত্ত্বগতভাবে। একাউন্টিংয়ের পরিভাষায় 'আমানত' ব্যাংকের জন্য দায় (লায়াবিলিটি)। এই টাকা চাহিবা মাত্র আমানতকারীকে ফেরত দিতে হবে নিয়ম মেনে। এবার আসা যাক পুঁজির প্রশ্নে। একাউন্টিংয়ে পুঁজিও (ক্যাপিটাল) একটি 'দায়'। দুটোই 'ব্যালেন্স শিটে' 'দায়' হিসাবে দেখানো হয়। এখন প্রশ্ন 'দায়ের' সাথে 'দায়ের' সম্পর্ক কীভাবে হবে? ব্যাংকের আমানতকারীদের 'দায়' পরিশোধ হবে ঋণগ্রহীতাদের টাকা দিয়ে। ঋণের টাকা যদি আদায়যোগ্য থাকে তাহলে আমানতকারীদের কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ঋণের টাকা যদি আদায় না হয় তাহলে আমানতকারীদের সমূহ বিপদ। এর জন্যই দেখা হয় ব্যাংকে খেলাপি ঋণের (ক্লাসিফাইড লোন) পরিমাণ কত। অর্থাৎ খারাপ ঋণের পরিমাণ কত যা আদায়যোগ্য নয়। ধরা যাক ঋণের দশ শতাংশ আদায়যোগ্য নয়। অতএব, একটি ব্যাংককে 'রিক্স ওয়েটেড মেথডে' ১০ শতাংশ পরিমাণ পুঁজি রাখতে হবে। ১০ শতাংশ কিসের? খারাপ ঋণের। ঋণ হচ্ছে ব্যাংকের সম্পদ (অ্যাসেট)। অর্থাৎ খারাপ সম্পদের ১০ শতাংশ পুঁজি রাখতে হবে। এখন হয়তো একটু বেশি। অথচ এটি না করে ব্যাংক রক্ষা দীর্ঘ দিন পুঁজি রেখেছে 'দায়'-এর ওপর ভিত্তি করে। এই ভুলটি ধরতে আমাদের সময় লেগেছে ২৫-৩০ বছর। এর কমে ব্যাংকে পর্যাপ্ত পুঁজির সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এর ধকল অনেক ব্যাংককে আজও সহ্য করতে হচ্ছে। দ্বিতীয় ভুলটি কি? এটি শেয়ারে বিনিয়োগ প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত। এক সময় বাণিজ্যিক ব্যাংক মার্চেন্ট ব্যাংকিংয়ের কাজও করত। দেখা গেল এটা ভুল নীতি। আমানতকারীদের টাকা দিয়ে 'স্পেকুলেটিভ' কাজ করা যায় না। শেয়ার ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক এটা বন্ধ না করে করল কী, তারা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের একটা সীমা করে দেয় ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্ট-১৯৯১ তে বলা হয় 'আমানত'-এর (ডিপোজিট) ১০ শতাংশ পরিমাণ টাকা একটি ব্যাংক শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারবে। এর কুফল কী হতে পারে তা শেয়ার বাজারের ধস দেখেই বুঝতে পারি। হয়েছে কী, ব্যাংকগুলো প্রচুর পরিমাণ টাকা নিয়ে শেয়ার বাজারে ঢোকে। সব ব্যাংক মিলিয়ে প্রচুর আমানত। এর ১০ শতাংশ বিস্তর টাকা। বলা বাহুল্য, বাজারে ভালো শেয়ার নেই। নতুন কোম্পানি ও বাজারে শেয়ার বিক্রি করছে না। অথচ সব ব্যাংক মুড়ি-মুড়কির মতো শেয়ারব্যবসা শুরু করে। গ্রামে গ্রামে পর্যন্ত শেয়ার বেচাকেনা শুরু হয়। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। অল্প শেয়ার অথচ বাজারে প্রচুর 'লিকুইডিটি' (তারল্য)। শেয়ারের দাম ওঠে আকাশে। ফটকা বাজারিরা প্রথমে শেয়ার কেনে অল্প দামে, যথা সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে। হাজার হাজার কোটি টাকা তারা বাজার থেকে তুলে নেয়। এমনকি কোম্পানির মালিকরা তাদের পুরো শেয়ার বিক্রি করে 'দিগম্বর মালিক' সাজেন। 'দিগম্বর' কারণ তারা পরিচালক, কিন্তু কোম্পানিতে কোনো শেয়ার নেই। এই যে অবস্থা ছিল হলো তা কিসের জন্য? খুব সোজা হিসাব। আমানতকারীদের টাকা নিয়ে বাজারে যাওয়া ছিল মারাত্মক ভুল। এটা হওয়া উচিত ছিল শেয়ার মালিকদের টাকা। অর্থাৎ পুঁজির টাকা। ব্যাংকের মালিকদের টাকা দিয়ে তাদের শেয়ারের ব্যবসা করা উচিত ছিল। অথচ তারা করল ঠিক উল্টোটি। এখানে দুটো ভুল। প্রথম শেয়ার বাজারে যাওয়া, দ্বিতীয়ও আমানতকারীদের টাকা নিয়ে যাওয়া। এই দুটো ভুলের মাশুল সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হাজার হাজার কোটি টাকা হারিয়ে আজও দিচ্ছে। এক শ্রেণির লোককে হাজার হাজার কোটি টাকা ধরিয়ে দিয়ে কেন্দ্রিয় ব্যাংক অবশ্য পরে বিধানটি রহিত করে। এখন বাণিজ্যিক ব্যাংক শেয়ারের ব্যবসা করে আলাদা 'মার্চেন্ট কোম্পানি' করে যা তাদের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। দ্বিতীয়ত, শেয়ারে বিনিয়োগের সীমা এখন আর আমানতকারীদের টাকার ওপর নির্ধারিত হয় না। এখন তা নির্ধারিত হয় 'ক্যাপিটালের' ওপর। অর্থাৎ ব্যাংক মালিকদের টাকার ওপর। পুঁজির মালিকরা তাদের নিজস্ব টাকায় যাচ্ছে তাই করুক, এতে আপত্তি থাকলেও কম।

এখন যে সমস্যাটির কথা আলোচনা করব তা সম্পূর্ণ ভুল না হলেও ইতোমধ্যেই অর্ধেক ভুলে প্রমাণিত হয়েছে। বিষয়টি 'ব্যাংক-ঋণ গ্রহীতা' সম্পর্কের বদলে 'বিআইএস' (ব্যাংক অব ইন্টারনেশনাল সেটেলমেন্ট) এবং ঋণগ্রহীতা সম্পর্কে পরিগণিত হয়েছে। 'বিআইএস'-এর বকলমে বলা যায় তা হয়েছে 'বাংলাদেশ ব্যাংক-ঋণগ্রহীতা সম্পর্ক'। ফলে তা এখন আবেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়েছে 'মিডিয়া' ও রাজনৈতিক ইসু্য। বিষয়টি 'খেলাপি ঋণ' (ক্লাসিফাইড লোন) সম্পর্কিত। পূর্বে ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে ঋণগ্রহীতার সমস্যার সমাধান করা হতো। এখন তা আর নেই। এখন ঋণখেলাপ সমস্যাটি দেখা হয় অঙ্কের মতো। এর জন্য ফর্মুলা আছে। সেই ফর্মুলা সব ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য। 'সংজ্ঞা, ফর্মুলা এবং অঙ্ক' দৃশ্যত নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রিয় ব্যাংক। কিন্তু তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রযোজ্য। 'বিআইএস'-এ বসে বিভিন্ন ব্যাংকের গভর্নররা এটা ঠিক করেছেন। 'খেলাপি' মানে ঋণের চুক্তি খেলাপ। কোন ঋণ কী অবস্থায় কখন খেলাপি (ক্লাসিফাইড) হবে তা ফর্মুলার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। খেলাপি হলে কোন স্তরে কত টাকা মুনাফা থেকে কেটে 'প্রভিশন' করতে হবে, 'সিকিউরিটি' কাকে বলে, কোনটা কোন ধরনের সিকিউরিটি ব্যাংকের কোন সম্পদ কতটুকু ভালো, ব্যাংক কতটুকু পুঁজি রাখবে এবং তা কখন রাখবে- এ ধরনের সব খুটিনাটি বিষয় এখন আন্তর্জাতিক বিধানে চলে। সভার জন্য এক। ছাত্রছাত্রীদের 'ইউনিফরম'-এর মতো। ভালো-মন্দ রাষ্ট্র, স্বৈরতন্ত্রের দেশ, গণতান্ত্রিক দেশ, বাজারি সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে শুরু করে আফ্রিকার অনুন্নত দেশের জন্যও একই বিধান। এটা বিশ্বায়নের ফল, বাজার অর্থনীতির ফল। এক দেশ থেকে অন্য দেশে মাল যাবে কোনো শুল্ক নেই, বাধা নেই। এর জন্য সমুদ্রপথ, বিমান পথ, সড়কপথ, রেলপথ করে সারা বিশ্বকেই এক করা হচ্ছে। ব্যাংক, বিমা, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, শুল্কব্যবস্থা, করব্যবস্থা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের সব নিয়ম, অনুশাসন এক। ধনী-দরিদ্র, উন্নত-অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ধীরে ধীরে সবাইকে নিয়মের খোঁয়াড়ে ঢুকতে হবে। এর জন্য 'গ্যাট' ভেঙে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডবিস্নওটিও) করা হয়েছে। লক্ষণীয় এতে দেশভিত্তিক কোনো বিবেচনা নেই। সমাজ, সংস্কৃতি, লোকাচার, ব্যবসায়িক নিয়মাচার, পরিবার, সঞ্চয় ইত্যাদি কোনো বিষয়েই কোনো ছাড় নেই। এর ফল হয়েছে কি? আমাদের ব্যাংকগুলো এই নিয়ম মানতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে ১৯৯০ সাল থেকে। সে আজ ২৯ বছর। একজন গ্রাহক খেলাপি হতে পারে অনেক কারণে। হলে করণীয় কী ব্যাংক জানে। এখন ব্যাংক জানলে হবে না। নিয়মে ফেলে তার সমাধান করতে হবে। করা হলো 'পুনঃতপশীল'-এর (রিশিডিউলিং) ব্যবস্থা। এটা চলে না। একবার, দুইবার, তিনবার করতে করতে ১০-১৫ বারও পুনঃতপশীলের উদাহরণ সৃষ্টি হলো। 'খেলাপি' বদনাম থেকে বাঁচার জন্য ব্যাংকগুলোতে সৃষ্টি হলো নানা অনাচার। ট্রাস্ট রিসিটের (টিআর) বিপরীতে দেয়া ঋণ দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হলো। লোনে 'এগেইনস্ট ইমপোর্টেড মার্চেন্ডাইজ' (এলআইএম) অনিয়ম দেখা গেল। প্রকল্প ঋণ নিয়ে বিদেশ থেকে অতিমূল্যায়ন করে মাল আনা হলো। রপ্তানি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হলো। দেশের কয়জনের মর্টগেজ দেয়ার মতো প্রপার্টি ছিল? অথচ মর্টগেজ ছাড়া ঋণ হয় না। অতএব, ডকু্যমেন্টেশনে জালিয়াতি করা শুরু হলো। এসব অনিয়ম করেও অনেক ব্যবসায়ী কুলোতে পারল না। আমি ইচ্ছাকৃত খেলাপির কথা বলছি না। যারা ভালো গ্রাহক তারাও পুনঃতপশীল সুবিধায় চলতে পারল না। বড় বড় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ফতুর হলো, দেশ ছাড়ল। ব্যাংকের টাকা আদায় হচ্ছে না। আবিষ্কার হলো 'লোন রিস্ট্রাপচারিং' সুবিধা। পুনঃতপশীল বাদ, বড়দের জন্য নানা সুবিধা দিয়ে ঋণের পুনঃগঠন করা হলো। কারণ বড়দের অনেকেই ব্যাংকের টাকা জমিতে ঢুকিয়েছে, কেউ কেউ বিদেশে পাচার করেছে। অনেকে 'অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি তৈরি করেছে। যা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি উৎপাদন ক্ষমতা। চিনি, সিমেন্ট, ইস্পাত, তৈরি পোশাক, বস্ত্রশিল্প থেকে শুরু করে সবকিছুতেই এখন 'ওভার ক্যাপাসিটি'। এসব করতে গিয়ে পাঁচ, সাত, দশ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছে কেউ কেউ। বিপণনের নামে দেশে দেশে অফিস করে সেখানে টাকা রাখছে। দেখা গেল শেষ পর্যন্ত 'লোন রিস্ট্রাকচারি' করেও লাভ হয়নি। সর্বশেষ এমন সুবিধার ব্যবস্থা করা হলো যে, সারা দেশে তার প্রতিবাদ হলো। ঋণের সুদ মাপ হলো, মূল ঋণ পরিশোধের সময় দ্বিগুণ-তিনগুণ করা হলো, সুদের হার ৯ শতাংশে হ্রাস করা হলো, পুনঃতপশীলের জন্য ডাউন পেমেন্টের টাকার পরিমাণ হ্রাস করা হলো। আরও কত কী? হাইকোর্ট এতে 'স্টে' অর্ডার দিল। পরে তা তুলে নেয়া হলো। অতএব, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার আবার কার্যকর করা হলো।

এই যে পরিস্থিতি তা কী ভুল সিদ্ধান্তের ফল, তা কি বিনা বিচারে আন্তর্জাতিক আইনবিধি পালনের ফল? তা কি পুরোটাই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণে হচ্ছে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এখন সর্বত্র। শুধু আমাদের দেশে নয়, এই খেলাপি সমস্যা আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। কোম্পানি ধরে ধরে খেলাপির সম্পদ বিক্রি করা হচ্ছে। অর্ধেক টাকাও আদায় হচ্ছে না। বছর দুই ধরে নতুন ঋণ বন্ধ। ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রহীতারা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর প্রভাব পড়ছে জিডিপি, প্রবৃদ্ধির হারে। বড় বড় কোম্পানি পড়েছে ভীষণ বিপদে। আরও বিপদ আমেরিকার ব্যবহারে। তারা ভারতীয় পণ্যের ওপর করারোপ করেছে। ভারতও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। একই অবস্থা চীনের। দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বায়ন ও বাজার অর্থনীতি ছিল সারা বিশ্বের লক্ষ্য তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্নবিদ্ধ করছে স্বয়ং আমেরিকা। তারা এখন বাজার অর্থনীতি মানে না। তাদের কথা চীন আমেরিকার বাজার দিয়ে বড়লোক হয়েছে। আমেরিকা ঠকেছে। ভারত আমেরিকাকে ঠকাচ্ছে। ট্রাম্প আন্তর্জাতিক চুক্তি পর্যন্ত মানছেন না। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রশ্নের মুখে। গ্রেট ব্রিটেন এর থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার মানে ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বিমা, আমদানি-রপ্তানির বিশ্বায়ন করতে গিয়ে যেসব বিধি-বিধান করা হয়েছিল তা আজ প্রশ্নের মুখে। এখন 'ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম'-এর সভায় রাষ্ট্রপতি, সরকারপ্রধান ও বড় বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বলছেন 'একনীতি' দিয়ে বিশ্ব চালানো যাবে না। স্ব স্ব দেশের বিবেচনা মাথায় রাখতে হবে। একেক দেশের সমস্যা একেক রকমের। ব্যবসা-বাণিজ্যের ঐতিহ্য একেক রকমের। সমাজ-সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন। এতদসত্ত্বেও সারা বিশ্বকে একই মানদন্ডে আনতে গিয়ে এখন বাজার অর্থনীতি নিজেই প্রশ্নের সম্মুখীন। 'বিশ্বায়ন' শব্দটি তো এখন মিডিয়াতেও দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে মার্কিনীদের পরিবার নেই। পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছে বড় বড় করপোরেশন। নাগরিকদের কোনো সঞ্চয় নেই। সঞ্চয় সব করপোরেট হাউসের। পিতৃহীন সমাজে পরিণত হচ্ছে আমেরিকা। ছেলেমেয়ে, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী সব বিচ্ছিন্ন। তারা বিশ্ব পিতৃদিবস, বিশ্ব মাতৃদিবস করে বছরে একবার বাবা-মাকে দেখতে যায়। সারা বছরে কোনো খবর নেই। পুরো সমাজ ঋণী। আর আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত। পরিবার আমাদের সর্বাগ্রে বিবেচ্য। তাদের ব্যাংকিং আমাদের ব্যাংকিংয়ের মতো নয়। তাদের দেশের ব্যাংক ডজন ডজন প্রতিদিন অবসায়নে যায়। অনেক ব্যাংক আমানত গ্রহণ করে না। তারা ঋণ নেয়, বিনিয়োগ করে, মার্কার-অ্যামালগেমন দেখাশোনা করে। তাদের সঙ্গে ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে দল বাঁধতে গিয়ে এবং স্ব স্ব ব্যাংকগুলোর হাত-পা বেঁধে, ব্যাংকার-কাস্টমার সম্পর্ক নষ্ট করে এবং দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জড়িত করে আমরা চলেছি কোন পথে এর একটা মূল্যায়ন দরকার।

ড. আর এম দেবনাথ

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক ঢাবি
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে