logo
বুধবার ১৯ জুন, ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০  

তুরস্কের বুকে লাল-সবুজের পতাকা

ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি তুরস্ক। এ দেশটি মাসব্যাপী দেখার সুযোগ হয়েছে মাহফুজ গাজির। তাও আবার সম্পূর্ণ ফ্রি। সব খরচ বহন করছে তুরস্ক সরকার। এ সুযোগ লুফে নিতে সারাবিশ্ব থেকে ৯৫ হাজার শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। সব প্রক্রিয়া শেষে ১১৮টি দেশ থেকে ১ হাজার শিক্ষার্থীর যাওয়ার সুযোগ হয়। তাদের মধ্যে মাহফুজ গাজি একজন। তুরস্কে কাটানো সময়ের গল্প শুনিয়েছেন তিনি-

তুরস্কের বুকে লাল-সবুজের পতাকা
তুরস্কের বুকে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা
মাহবুব আলম

মাহফুজ গাজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও বুয়েট থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি একটি ব্যাংকে কর্মরত। ব্যাংকের চার দেয়ালের মাঝে কাজ করতে করতে চিন্তা করলেন কোথাও থেকে যদি একটু ঘুরে আসা যেত তাহলে ভালো লাগত। তাই কাজের ফাঁকে একদিন আবেদন করল ঞঁৎশরংয ঝঁসসবৎ ঝপযড়ড়ষ চৎড়মৎধসসব এ। সারাবিশ্ব থেকে ৯৫ হাজার ছাত্রছাত্রী আবেদন করল। সব প্রক্রিয়া শেষে ১১৮টি দেশ থেকে ১ হাজার ছাত্রছাত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। সেই আমন্ত্রণে ডাক পেল মাহফুজ গাজিও। এমন সুযোগ পেয়ে মনের ভেতরে একটু শিহরণ ছুয়ে গেল তার। কারণ সব খরচ বহন করবে তুরস্ক সরকার। এমন সুযোগ পেয়ে তুরস্কের উদ্দেশে রওনা দিলেন মাহফুজ গাজি। প্রায় সাড়ে ৮ ঘণ্টা বিমানভ্রমণ শেষে পৌঁছলেন ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দরে। মাহফুজ গাজি জানালেন, তখন মনোমুগ্ধকর ডিজাইনের বিশাল বিমানবন্দরটি ছিল বেশ ব্যস্ত। সেখানে নামার পরপর আমাদের সবাইকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল তুরস্কের প্রতিনিধিরা। তারপর বিভিন্ন দেশ থেকে আগতদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিচয় হলো। তাদের সবার ভাষা, পোশাক, ধর্ম, চেহারা সবই ভিন্ন। কিন্তু মনে হলো আমরা সবাই খুবই কাছের। কয়েকদিনে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। পরেরদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো তুরস্কের শহর ইজমিরে। সেখানে একটি ইউনিভার্সিটিতে আমাদের তুরস্কের ভাষা শিখানো হবে। ইজমিরের রূপ দেখে অবাক হলাম। সত্যি ছবির মতো সুন্দর শহর ইজমির। সারাবিশ্বের লাখো পর্যটকের আনাগোনা এই শহরে। কারণ এই শহরের সি-বিচ, বিশাল পাহাড়, আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে ভরপুর। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ও ইজমির খুবই গুরুত্বপূর্ণ শহর। এখানে মুসলমানের পাশাপাশি, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী এবং উপজাতিও কম নয়। তাই ইজমিরের মানুষের জীবনাচরণ, পোশাক-আশাক আসলেই তুরস্কের অন্যান্য প্রদেশ থেকে ভিন্ন। সব ছাপিয়ে ইজমিরের মানুষের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা আমরা মুগ্ধ। মানুষগুলোর প্রাণখোলা হাসি, মনে হয় যেন কত আপন। এখানকার সব ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আমরা ঘুরেছি। তুরস্কের বিমানবাহিনীর কেন্দ্রও এই ইজমিরে। ইজমিরের সবচেয়ে পুরনো গ্রাম দেখতে গেলাম। সেখানে নৃতাত্ত্বিক ও পুরাতাত্ত্বিক জাদুঘরে, হাজার হাজার বছর আগের মানুষের জীবনপ্রণালি, রান্নার ধরন, পানি সংগ্রহ পদ্ধতি, মৃত সৎকারে বিশ্বাস, সবকিছু স্বচক্ষে দেখলাম। সেখানে জীবনে প্রথম ঘোড়ার খামারে গেলাম, ঘোড়ার দুধ খেলাম। এদিকে ভাষা শিক্ষার ক্লাসের পাশাপাশি ছিল তুরস্কের রান্না শিক্ষার ক্লাস। এই ক্লাসে শিখেছি টার্কিশ ট্র্যাডিশনাল আর্ট-এব্রম্ন। সবচেয়ে মজা পেয়েছি টার্কিশ নাচ শিক্ষার ক্লাসে। ইন্টারন্যাশনাল ডে'তে আমরা সবাই সেই ট্র্যাডিশনাল নাচ প্রদর্শন করেছি, এর নাম হচ্ছে- যেইবেক। তারপর বাংলাদেশের ওপর একটা প্রেজেন্টেশন করেছি, প্রেজেন্টেশনে আমাদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাসা, প্রকৃতি ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এসব শুনার পর বিভিন্ন দেশের শিক্ষকসহ বন্ধুরা বাংলাদেশে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

তুরস্কে যতদিন থাকলাম একটা বিষয় খুব অবাক করেছে- দেশটির রাস্তায় কোনো জ্যাম নেই, কোন ময়লা নেই, মানুষের কোনো জটলা নেই, একদিনও কারেন্ট যেতে দেখলাম না, হোটেলের সব জায়গায় সেন্সর, বিদু্যৎ আর পানি অপচয়ের কোনো রাস্তা নেই। এসব দেখে মনে হয়েছে- ইশ আমার দেশটাকে, আমার রাজধানীটাকে যদি এমন করতে পারতাম।

এ ছাড়াও রাস্তার চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়। সাপের মতো একেবেকে আমাদের গাড়ি চলতো। সামনে পেছনে পুলিশ। পাশে তাকালেই দেখা যায় প্রায় হাজার ফুট নিচের রাস্তা। পাহাড় কেটে তৈরি এত সুন্দর রাস্তা সত্যিই অবাক করল।

একটি বিষয় দেখে অবাক হলাম তুরস্কের রেস্তোরাঁগুলো সবই খোলা আকাশের নিচে, আমাদের মতো চিরাচরিত নয়, দাম ও বেশি নয়। এভাবেই ইজমিরের দিনগুলো স্বপ্নের মতো শেষ করে আমরা সবাই ইস্তাম্বুলে চলে এলাম। এখানে ১১৮টি দেশ একত্রিত হলো। মনে হলো সারাবিশ্ব একজায়গায়। এই এক মহামিলন মেলা। ইস্তাম্বুল খুবই ব্যস্ত শহর। ইজমিরের স্নিগ্ধতা বুঝি শেষ হয়ে এলো এখানে। এখানকার মানুষ খুব ধর্মপ্রাণ। কারণ ইজমিরের মসজিদে মানুষ প্রায় পাওয়া যেত না। কিন্তু ইস্তাম্বুলের মসজিদগুলো ছিল মানুষে ভরপুর। আমার কাছে মনে হয়েছে- বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর সুন্দর মসজিদগুলো এই ইস্তাম্বুলে। এখানে আমরা ১ ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে একটি জাদুঘরে প্রবেশ করলাম। যেখানে দেখতে পেলাম- আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর পায়ের ছাপ, দাঁড়ি মোবারক, হজরত আবু বকর (রা:), ওমর (রা:), উসমান (রা:), আলি (রা:), খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা:) এর তরবারিও সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়াও আরো নান্দনিক জিনিস দেখলাম এই জাদুঘরে। এরপর শুরু হলো আমাদের অফিসিয়াল ভ্রমণ। প্রথম দিন গেলাম গালাতা টাওয়ারে। বিশ্ব ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এই গালাতা টাওয়ার। ৯ আগস্ট ছিল পতাকা দিবস ও কনসার্ট। সবাই নিজ নিজ দেশের পতাকা নিয়ে হাজির হলাম। আমরাও বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে হাজির। ১১৮টি দেশের পতাকায় এক অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি হলো। এরপর ইস্তাম্বুলে অবস্থিত বাংলাদেশের চ্যান্সেলরের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। যাওয়ার সময় অবাক হলাম মারমারা সাগরের নিচ দিয়ে টানেল বানিয়েছে। অবশ্য এই পথে যেতে ৪২ লিরা টুল দিতে হলো। রাতে ছিল গালা ডিনার। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়পে এরদোগান প্রধান অতিথি ছিল। কিন্তু কি এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি আসতে পারেননি। সেখানে আমাদের সবাইকে সার্টিফিকেট দেয়া হলো।

এক মাস সময় শেষ করে ইস্তাম্বুল থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম আমরা। আসার সময় মনে হলো- যেন নিজের আরেকটা পরিবার ফেলে আসছি। এই সময়ে কত কিছু দেখলাম, মিশলাম বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতির সঙ্গে। কখনো নিজেকে খুঁজেছি হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যর সঙ্গে। কখন বা একেবারে অত্যাধুনিকতার সঙ্গে। মনের দরজা কতটুক প্রসারিত হলো জানি না। তবে এতটুকু বুজেছি মানুষে মানুষে সহযোগিতা আর ভ্রাতৃত্বই পারে জীবনের সঠিক বার্তা বহন করতে। সংকীর্ণতা আর আত্মকেন্দ্রিকতার গন্ডিকে অতিক্রম করতে। ব্যক্তিকে বিশ্বজগতের সঙ্গে একাত্ম করতে। যাতে পৃথিবীতেই পাওয়া যায় স্বর্গীয় আনন্দ।

এর মধ্যে একদিন তুরস্কের পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের মিটিং হলো। দেশটি সম্পর্কে এত সুন্দর বর্ণনা দিলেন তিনি। সত্যিই অবাক না হয়ে পারলাম না। সমস্ত কিছু নখদর্পণে। মনে হলো- এমন মন্ত্রীই দরকার একটা মন্ত্রণালয়ের সার্বিক উন্নয়নের জন্য।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে