logo
রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ০৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০  

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাসে বৃষ্টিবিলাস

'বৃষ্টির দিনে প্রাণের ক্যাম্পাস অনন্য এক রূপে সাজে। আর তা দেখার জন্য আমি থাকব না এমনটা কি হতে পারে! বৃষ্টির দিনে শাটলে করে ধান ক্ষেত, গ্রাম-গঞ্জ পেরিয়ে ক্যাম্পাস যাওয়া আমার অন্যতম শখ। শাটলের জানালা দিয়ে বৃষ্টির মাদকতা মিশ্রিত পানি যখন সব শরীর শিহরিত করে সে যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি!

ক্যাম্পাসে বৃষ্টিবিলাস
বর্ষণমুখর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বৃষ্টিবিলাস
মাহবুব এ রহমান

বৃষ্টির রিনিঝিনি সুর শুনতেই যেন এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। তৃষ্ণার্ত পৃথিবীতে বৃষ্টি এনে দেয় পূর্ণাঙ্গ সজীবতা। ফোঁটায় ফোঁটায় যেন স্বর্গীয় অনুভূতি। আর তা যদি হয় সবুজাভ ক্যাম্পাসে! তাহলে তো আর কথাই নেই। বৃষ্টিভেজা ভোরে বিছানা ছাড়তে কারই বা ভালো লাগে! কিন্তু কাউকে কাউকে তো এই বাধা মাড়িয়ে উঠতেই হয়। ক্লাস, পরীক্ষা, বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রিয় মানুষটির টানে ছুটতে হয় ক্যাম্পাস পানে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য আছে শাটল ট্রেন। শহরের শিক্ষার্থীদের এসে দাঁড়াতে হয় স্টেশনে। অপেক্ষায় থাকতে হয় শাটল হুইসেলের।

আয়তনে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এই ক্যাম্পাস ছোটো-বড় টিলাবেষ্টিত। ২১০০ একরের প্রাণোচ্ছল ক্যাম্পাসে বৃষ্টি মানে এক অনন্য সতেজতা। বৃষ্টির ফোঁটায় ক্যাম্পাসের বৃক্ষরাজি প্রাণ ফিরে পায়। প্রকৃতি মেলে ধরে তার অসম্ভব সৌন্দর্য। বৃষ্টিতে ক্যাম্পাসের জারুলতলা কিংবা বুদ্ধিজীবী চত্বরের ছোটো ছোটো ঘাসগুলো আলতো চুমুতে পবিত্র করে চরণযুগল।

'নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে

ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।'

কবিগুরুর এই আহ্বান উপেক্ষা করে রোমাঞ্চকর স্বাদ নিতে শিক্ষার্থীরা ছোটেন প্রাণের ক্যাম্পাসে। বৃষ্টিভেজা দিনে উড়ুউড়ু মন কেমনে ক্লাসে নিবদ্ধ থাকে! তাই তো অনেকেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে চষে বেড়ান ক্যাম্পাসজুড়ে। মেতে ওঠেন কলা ঝুপড়িতে গানে আর আড্ডায়। প্রিয়-প্রেয়সী একই ছাতার নিচে ঘুরে উপভোগ করেন বৃষ্টিস্নাত ক্যাম্পাস। এমন দিনে স্মৃতির সাগরে ডুব দিয়ে অনেকেই খুঁজে ফেরেন হারিয়ে ফেলা সোনালি শৈশব। এমনি একদলের সঙ্গে দেখা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিক্যাল সাইন্স ফ্যাকাল্টির পুকুর পাড়ে। পুকুর পাড়ের ছাউনির নিচে বসে টুপটাপ বৃষ্টির গান শুনে শুনে একত্রে ভোনা খিচুড়ি খাচ্ছেন। এমন দিনের মধুরতম অনুভূতি জানতে চাইলে ফাহিমা আহমেদ জানান, বৃষ্টি এলে আমি নিজেকে বেঁধে রাখতে পারি না। ক্যাম্পাসে এলে যখন বৃষ্টি আসে ক্লাস থাকলে সেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে হলেও ঘুরতে বের হয়ে যাই। যেমন আজ একটা ক্লাস করে বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে বের হয়ে গেলাম। কাটা পাহাড় রাস্তায় ভিজতে ভিজতে হাঁটা শুরু। শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে খোলা আকাশ, বৃষ্টি, বৃষ্টিস্নাত শহীদ মিনার আর বুদ্ধিজীবী চত্বরের সৌন্দর্য অবলোকন করা। তারপর আবার দলবেঁধে ছুটে আসা এই বায়োলজি পুকুর পাড়ে।

বাঁধানো ঘাটে বসে পুকুরের পানিতে অবিরাম ঝরে পড়া টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ গুনছি। পাশে বসা বন্ধু মিতিশা বলে ওঠে, 'এমন বৃষ্টির দিনে কি ক্লাসে মন বসে? সবুজ ক্যাম্পাসের এত সৌন্দর্য এই বৃষ্টিতে না দেখলে তো অনেক কিছুই মিস করে ফেলব।' 'আজ বাড়ি ফেরারও কোনো তাড়া অনুভূত হচ্ছে না। ইচ্ছে হচ্ছে আজ রাত না নামুক। এমন প্রকৃতি থাকুক এক জনমভর।' মিতিশার কথার সঙ্গে যোগ করে আঁখি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ঝুপড়িতে আরও একটি বন্ধুদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ঝুপড়ির চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে দিয়ে গিটারে টুংটাং ছন্দ আঁকছেন। সেই ছন্দ মিলিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টি ফোঁটার টপাটপ ছন্দের মধ্যে। এমন দিনের ক্যাম্পাস কেমন লাগে, প্রশ্ন করতেই অর্ণব বলে ওঠে, 'পাহাড়ঘেঁষা ২১০০ একরের ক্যাম্পাসে সব কিছু অনেক সুন্দর মনে হয়। কিন্তু বর্ষার দিনে ক্যাম্পাস ঢেলে দেয় তার অপরূপ সৌন্দর্য। বর্ষার দিনে ক্যাম্পাসের কাটা পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে নিজের মধ্যে একটা স্বর্গীয় সুখ অনুভূত হয়। দুই পাশে পাহাড় আর মাঝখানের পিচঢালা পথ যেন ভেঙে দেয় দিনের সব ক্লান্তি। এই দিনে বন্ধুদের সঙ্গে বৃষ্টিতে না ভিজলে কি হয়! তাই তো চা শেষ করে চলে যাব কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। বন্ধুদের সঙ্গে হবে ফুটবল খেলা।'

জিরো পয়েন্টে দেখা শাটলের জন্য অপেক্ষমাণ

ইংরেজি ও বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাবিহা ইবনাত ও তাহমিনা আক্তারের সঙ্গে। নাবিহা বলে, 'জ্যৈষ্ঠ শেষে হুড়হুড় গুড়গুড় করে মেঘে সাওয়ার হয়ে আষাঢ় আর শ্রাবণ নামে প্রিয় ক্যাম্পাসে।

শাটলের জানালায় হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা, আর একটুখানি ভিজে যাওয়া। কাদামাটি মাখা কাঁচা-পাকা রাস্তা, মাটির সুঘ্রাণ। চেনা-অচেনা রঙিন ফুল। ক্যাম্পাস পৌঁছতেই তুমুল বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় গুটিগুটি পা ফেলে নয়তো পর্দা টানা রিকশা বা অটোতে চেপে ফ্যাকাল্টি যাত্রা। ঝুপড়ির চালে ঝম ঝমাঝম বৃষ্টির তাল। প্রিয় আর প্রেয়সী দুইয়ে মিলে একই ছাতার নিচে কিছুদূর এগোনো! কখনো দল বেঁধে বৃষ্টি উদযাপন সে এক অব্যক্ত অনুভূতি।

'বৃষ্টির দিনে প্রাণের ক্যাম্পাস অনন্য এক রূপে সাজে। আর তা দেখার জন্য আমি থাকব না এমনটা কি হতে পারে! বৃষ্টির দিনে শাটলে করে ধান ক্ষেত, গ্রাম-গঞ্জ পেরিয়ে ক্যাম্পাস যাওয়া আমার অন্যতম শখ। শাটলের জানালা দিয়ে বৃষ্টির মাদকতা মিশ্রিত পানি যখন সব শরীর শিহরিত করে সে যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি! শাটল জার্নি শেষে যখন ক্লাসমুখী হই তখন স্টেশনের কৃষ্ণচূড়া গাছ এবং কাটা পাহাড়ের রাস্তা তথা সব ক্যাম্পাসজুড়ে থাকে আমার মুগ্ধতা! বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাসের ফাঁকে আড্ডাটাও বেশ জমে।' এভাবেই অনুভূতি ব্যক্ত করে তাহমিনা।

বৃষ্টির দিনের ক্যাম্পাসের চেহারা সত্যিই অন্যরকম। ক্লাসের প্রতি সবারই যেন এক গা-ছাড়া ভাব। বৃষ্টির দিনে প্রকৃতিকে উপভোগেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে