logo
রোববার ১৬ জুন, ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬

  মোহাম্মদ অংকন   ০৮ জুন ২০১৯, ০০:০০  

কৃষকের অধিকার

কৃষকের অধিকার
কৃষি ও কৃষক নিয়েই বাংলা রাজ্যের যত কারবার। বলা হয়ে থাকে, বাংলা রাজ্যের রাজা কৃষিবান্ধব। রাজ্যের কৃষকরাও কৃষি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ইরি-বোরো মৌসুম এলে ধান চাষে মনোযোগ দেয় সবাই। এবং অনেক ধান উৎপাদন করে। এ ধানে রাজ্যের সব কৃষকের সারা বছরের খোরাক জোটে। রাজা ন্যায্যমূল্য দিয়ে ধান কিনে মজুদ রাখেন। যদি কখনো প্রজাদের অভাব-অনটন দেখা দেয়, তবে এখান থেকে ধান দিয়ে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়। এ ছাড়া যেসব কৃষক অধিক ধান চাষ করেন, তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় অংশ রেখে বাকিটা বাজারে বিক্রি করেন। ব্যবসায়ীরা এসব ধান অন্য রাজ্যে অধিক মূল্যে রপ্তানি করে থাকেন। কৃষি ও কৃষক নিয়ে রাজ্যের কার্যক্রম ভালোই চলে আসছে।

কৃষিবান্ধব এই রাজ্যে হঠাৎ কয়েক বছর ধরে চলছে কৃষকদের দারুণ মনোক্ষুণ্ন। কৃষকরা ঠিকমতো ধানের দাম পাচ্ছেন না। তেল-সার-কীটনাশকের দামও অপরিমেয়। শুধু তাই নয়, শ্রমিকের মজুরিও ঢের। দুই মণ ধানে একজন শ্রমিক মেলে। কৃষকরা যেন বিপাকে পড়ে গেছেন। যত টাকা খরচ করে ধান চাষ করেন, তা কোনোমতেই উঠছে না। বরং প্রতিবারই লোকসান গুণতে হচ্ছে। ক্ষোভে অনেক কৃষক পাকা ধানের জমিতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছেন, কেউবা পাকা ধানে মই দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ধানের জমিতে পুকুর খনন করছেন, ইটভাটা তৈরি করছেন। এমতাবস্থায় কৃষক জমির উদ্দিন ভাবলেন, 'না, কৃষকের দিনকাল এভাবে চলতে পারে না। রাজার কাছে বিষয়াটি জানানো দরকার।' তাই তিনি একদিন রাজ দরবারে কৃষকদের নিয়ে হাজির হলেন।

কৃষক জমির উদ্দিন ও অন্য কৃষকদের দেখে রাজা একটু বিস্মিত হলেন। 'কি ব্যাপার জমির চাষী, তোমরা যে একেবারে আঁটঘাঁট বেঁধে রাজদরবারে হাজির হলে। ঘটনা কি খুলে বলো তো, শুনি?'

জমির চাষি সবার পক্ষ থেকে বললেন, 'জাঁহাপনা, আমরা কৃষক মানুষ। আপনার রাজ্যের খেটে খাওয়া মানুষ। কৃষি দিয়েই আমাদের জীবিকা চলে। আমরা দুঃখে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।'

'তা বেশ করেছ, জমির চাষি। কি দুঃখ? না বললে বুঝব কেমনে? দেখি, তোমাদের কি উপকার করতে পারি, তা বলো।'

'জাঁহাপনা, রাজ্যে ধানের দাম একদমই নেই। ৫০০ টাকা মণ ধানে আমাদের কিচ্ছু হচ্ছে না। এক কেজি গরুর মাংসও কিনে খেতে পারছি না। কি যে যাতনায় আছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না, জাঁহাপনা।'

'আহা, বড়ই দুশ্চিন্তার কথা শোনালে, তোমরা। এমন তো কখনো শুনিনি।'

রাজ্যে ধানের দাম নেই কেন? এ নিয়ে রাজা মশাই মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন। কিন্তু কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। তাই তিনি মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন। 'কি ব্যাপার মন্ত্রী মশাই, তুমি যে একেবারে চুপ করে বসে আছ। কিছুই যে বলছ না। ধানের দাম নেই কেন?'

কাচুমাচু হয়ে মন্ত্রী উত্তর করলেন, 'জাঁহাপনা, আজই আমি রাজ্য ঘুরে দেখছি। এদের কথা সত্য না কি মিথ্যা। ব্যবসায়ীদের ধরলেই আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।'

'ঠিক আছে, তাহলে তুমি তাই কর। আমার রাজ্যের কৃষকরা যেন কিছুতেই দুঃখে না থাকে। আর শোনো, কেউ যদি কৃষকের আশা-ভরসা নিয়ে ছেলে খেলা করে, তাহলে তার নিস্তার নেই, এই বলে দিলাম সবার সমানে।'

মন্ত্রী মশাই একদিন রাজ্যের কৃষকদের কাছে গেলেন। কে কত বিঘা ধানের চাষ করেছে, তার খোঁজখবর নিলেন। তারপর রাজদরবারে ফিরে গেলেন।

'কি মন্ত্রী মশাই, কোনো কারণ খুঁজে পেলে? ব্যবসায়ীরা কি বলল?'

'জি জাঁহাপনা, অনেক কারণই পেয়েছি। শুনুন তাহলে, রাজ্যে ধান চাষের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তারা ধানের দাম পাচ্ছে না। তাই ধানের আবাদ কমাতে হবে। দেশে ধানের চাহিদা কম। আর তারা যে টাকা ধানের দাম চাচ্ছে, তা দেয়া সম্ভব নয়। তাই আপনি বলে দিন, আগামীতে যেন কৃষকরা কম করে ধানের আবাদ করে।'

রাজা মশাই মন্ত্রীর কথা বাছ-বিচার না করে বিশ্বাস করলেন। এ কথা কৃষকদের বলার জন্য রাজ্যের সবাইকে ডাকলেন।

উপস্থিত কৃষকদের উদ্দেশ্য রাজা মন্ত্রীর শেখানো কথাগুলো বলতে লাগলেন। এরই মধ্যে রাজার বিশ্বস্ত সহকারী গণেশ পাল এসে হাজির হলেন। 'জাঁহাপনা, আপনার এ ঘোষণা বন্ধ করুন। আমি এর প্রতিবাদ করছি। কৃষকরা যদি ধান উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তাহলে আমাদের রাজ্যে খাদ্যের অভাব দেখা দেবে। অন্য রাজ্য থেকে চাল আমদানি করতে হবে। তার চেয়ে বরং কৃষকরা কেন ধানের দাম পাচ্ছে না, তার আসল কারণ উদ্ঘাটন করা হোক। আপনার মন্ত্রী নিশ্চিত মিথ্যা কথা বলছে।'

'বাহ্‌, গণেশ পাল, তুমি তো চমৎকার কথা বলেছ। তা আমরা এখন কি করতে পারি, ঝটপট বলে ফেল, শুনি।'

'দেখুন রাজামশাই, আগে রাজ্যের কোষাগারে যত ধান লাগত, তার সবই রাজ্যের কৃষকদের থেকে সরাসরি ক্রয় করা হতো। কিন্তু বর্তমানে মন্ত্রী মশাই তা না করে রাজ্যের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অন্য রাজ্য থেকে আমদানি করছেন। তাই ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা উপায় না পেয়ে অল্প দামে ধান বিক্রি করে দিচ্ছে এবং লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছে।'

'এ তুমি কি শোনালে গণেশ পাল? মন্ত্রী, গণেশ যা বলছে, তা কি সত্য?'

'ইয়ে মানে, না মানে, জাঁহাপনা।'

'আচ্ছা, তোমার বিচার আমি পরে করছি। আগে কৃষকদের মরার হাত থেকে বাঁচাই।'

'তা বলো গণেশ পাল, এখন কি করা যেতে পারে? এ মন্ত্রীকে নিয়ে আর পারা গেল না।'

'জাঁহাপনা, এখন উপায়, ন্যায্য দাম দিয়ে কৃষকদের থেকে সরাসরি ধান কেনা হোক। তাহলে তারা ধন্য হবে।'

'তবে তাই হোক, আমি মন্ত্রীকে এখনই হুকুম দিচ্ছি। নইলে মন্ত্রীর শাস্তি বাড়বে।'

রাজার নির্দেশ মোতাবেক মন্ত্রী রাজ্যের কৃষকদের থেকে ধান কিনতে জনবল নিয়ে হাজির হলেন। কিন্তু এখানেও মন্ত্রী দুর্নীতির আশ্রয় নিলেন। রাজা যেখানে নির্দেশ দিয়েছেন যে কৃষক যতটুকু ধান বিক্রি করবে, ততটুকুই কিনে নিতে হবে। আর তিনি এসে বললেন, 'তোমরা এক টনের বেশি ধান বিক্রি করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, তোমাদের সবার ধান তো আর কেনা সম্ভব নয়, তাই তোমাদের মধ্যে লটারি করা হবে। যারা বিজয়ী হবে, শুধুমাত্র তাদের ধানই কেনা হবে।'

এবং মন্ত্রী লটারির মাধ্যমে তার পরিচিত কিছু কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কৃষক সাজিয়ে তাদের থেকে নির্ধারিত মূল্যে ধান কেনা শুরু করলেন। মন্ত্রীর এমন নয়ছয় কাজ দেখে ও মনগড়া কথা শুনে কৃষকরা তো রীতিমতো অবাক হয়ে গেল। এভাবে ধান কিনলে ক'জন কৃষক ধান বিক্রি করতে পারবে? এ প্রশ্ন সব কৃষকের মধ্যে।

তাই কৃষক জমির উদ্দিন সব কৃষককে নিয়ে আবারও রাজদরবারে হাজির হলেন। 'জাঁহাপনা, আমরা রাজ্যে কৃষক রয়েছি প্রায় এক হাজার জন। মন্ত্রী সেখানে চারশত জনের ধান কিনবেন বলেছেন। তাও আবার লটারির মাধ্যমে। আমরা এ নিয়ম মানিনা। এতে কয়েকজন ধান বিক্রির সুযোগ পাবে। আর বাকিজন পারবে না। এ নিয়ম মানি না।'

'আচ্ছা, তাহলে এই কথা। মন্ত্রী মশাই, এ রকম হওয়ার কারণ কি? তোমার কাজকর্মের আমি তো অবাক হচ্ছি।'

এবারও মন্ত্রী কোনো সত্য উত্তর দিতে সক্ষম হলো না। পাশ থেকে রাজার বিশ্বস্ত সহকারী গণেশ পাল বলে উঠল, 'এসবই মন্ত্রীর নয়ছয়, জাঁহাপনা। আমার কাছে প্রমাণ আছে, তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি করেই এসব করছেন। আপনি যদি সব ধান কিনে নেন, তাহলে ব্যবসায়ীরা কি করবে? তাই তার জন্য এ ব্যবস্থা।'

'ও আচ্ছা, এত বড় জোচ্চুরি আমার সাথে?'

'জাঁহাপনা, শুধু তাই নয়- অন্য রাজ্য থেকে চাল আমদানিতেও তার যোগসাজশ রয়েছে। কৃষক যখন চাল অন্য রাজ্যে রপ্তানি করছে, তখন তিনি ব্যবসায়ীদের দিয়ে চাল আমদানি করছে। একই সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি চলছে। তাহলে কৃষকরা কীভাবে ধানের ন্যায্যমূল্য পাবে?'

'তাহলে এখন কি করা যায় বলো তো গণেশ পাল? আমার মাথায় কিছু খেলছে না।'

'জাঁহাপনা, ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যায়। ধানের সিন্ডিকেট বাহিনীকে পরাস্ত করতে হবে। চাল আমদানি বন্ধ করতে হবে। সরাসরি রাজ্যের প্রকৃত কৃষকদের থেকে ধান কিনতে হবে। ব্যবসায়ীদের ধান কেনার জন্য ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। এবং যারা কৃষকের অধিকার বিনষ্ট করছে তাদের, শাস্তি দিতে হবে।'

'বাহ্‌, তুমি চমৎকার কথা বলেছ। তাহলে তোমার কথাই রাখা হবে। তবে সবার আগে দুষ্টু মন্ত্রীকে শাস্তি দিতে হবে। তারপর কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তা মন্ত্রী মশাই, তোমার কতজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে? এখনই বলো, নইলে শাস্তি কিন্তু আরও বাড়বে?'

'জি হুজুর, কারও সঙ্গে নাই। সত্য বলছি। গণেশ পাল মিথ্যা কথা বলছে।'

'সত্যি বলো, নতুবা শূলে চড়ানো হবে এখনই।'

'জি হুজুর বলছি..'

রাজার চাপের মুখে পড়ে অসাধু মন্ত্রী সব অকৃতকর্মের কথা খুলে বললেন। অতঃপর মন্ত্রী ও কতিপয় মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের রাজামশাই চরম শাস্তির ব্যবস্থা করলেন। তারপর নির্ধারিত বাজারদর করে দিলেন এবং রাজা সরাসরি কৃষকদের থেকে ধান কিনলেন। কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করে মাছ, মাংস কিনে নতুন চালের ভাত খেল। তাদের মধ্যে সুখ-শান্তি ফিরে এলো। কৃষকের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেয়ায় রাজা ও গণেশ পালের জন্য প্রার্থনা করল।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে