logo
শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  কবির কাঞ্চন   ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

হৃদয়ের আকুতি

হৃদয়ের আকুতি
রেণু, শুধু তোমাকে সুখী করতে আমি সব করতে পারি। তুমি শুধু একবার আমার কথায় রাজি হয়ে যাও। কথা দিচ্ছি, সারাজীবন তোমাকে সুখে রাখব।

কথাগুলো বলতে বলতে বিলস্নালের চোখ থেকে অঝরে পানি ঝরতে থাকে। রেণু তার এমন আহাজারিতে মোমের মতো গলে যায়। সে আবেগী হয়ে বলে ওঠে

- সত্যি তুমি আমায় এত ভালোবাসো! আগে জানতাম না।

- হঁ্যা, রেণু, যেদিন থেকে তোমাকে এই মন দিয়েছি, সেদিন থেকে আমার ভেতরের আমিতে পরিবর্তন হয়ে গেছে। সারাক্ষণ তোমার কথা ভাবি। এক মুহূর্তের জন্যও তোমার কথা না ভেবে থাকতে পারি না। আমি যেন তুমি হয়ে গেছি। আমার নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে শুধু তুমি আছ।

- বিশ্বাস কর, বিলস্নাল। আমার অবস্থাও ঠিক তোমার মতো। তুমি পুরুষ মানুষ। তাই মনের কথা মুখে বলতে পেরেছ। কিন্তু আমাদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না।

বিলস্নাল এদিক ওদিক তাকিয়ে রেণুর চোখে চোখ রেখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এক সময় সে আরো কাছে আসতে চায়। রেণু ঘাড় নেড়ে তা বাধা দেয়। বিলস্নাল তা মানতে চায় না। রেণুকে সে স্ত্রীর মতো করে পেতে চায়।

বিলস্নালের চোখের ভাষা বুঝতে পেরে রেণু তাকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে বলে।

জবাবে বিলস্নাল বলল, - রেণু, আমি তোমাকে আমার একটা ফাইনাল সিদ্ধান্ত জানাতে চাই।

- কিসের ফাইনাল সিদ্ধান্ত?

- আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করব।

- পালিয়ে কেন?

- তোমার আমার এই সম্পর্ক আমাদের বাবা-মা কেউই মেনে নেবেন না। এ ছাড়া আর কোনো উপায় তো আমাদের সামনে খোলা নেই।

- আগে তুমি প্রতিষ্ঠিত হও। তাহলে সবাই মেনে নিতে বাধ্য হবেন।

- আরে তুমি পাগল নাকি! আমি প্রতিষ্ঠিত হতে হতে তুমি তো কয়েক বাচ্চার মা হয়ে যাবে। আমি তোমাকে হারাতে চাই না।

- তাই বলে এখন!

- হঁ্যা, এখনই। আমি আর ধৈর্য ধরতে পারব না।

- আমাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে কি খাওয়াবে?

- কেন? আমি চাকরি নেব। আর আলস্নাহ সব মানুষের রিজিক দিয়েই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। নিশ্চয় আমাদেরও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

- অনেকে বলেন, সংসারে নাকি অভাব শুরু হলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়।

- ওসব কথার কথা মাত্র। একদম বিশ্বাস করবে না।

- কিন্তু আব্বা-আম্মা!

- তাদের নিয়ে চিন্তা করবে না। আমার বাবাকে আমি চিনি। আমরা পালিয়ে গেলে প্রথম প্রথম মেনে না নিলেও পরে ঠিকই মেনে নেবেন। তোমার আব্বাও আমার আব্বার মতো। খুব সহজ সরল মানুষ।

\হরেণু কিছুক্ষণ নীরব থেকে আস্তে করে বলল,

- আমাকে ভাববার জন্য অন্তত কয়েকদিন সময় দাও। তা ছাড়া এভাবে পালিয়ে যাওয়াটা সম্মানের কিছু নয়।

- না, রেণু, আর কোনো কথা নয়। আমরা আগামীকালই চট্টগ্রাম চলে যাব। আমাদের নিয়ে কে কি ভাবলো সেটা ভাবার কোনো দরকার নেই। কারণ আমাদের পবিত্র ভালোবাসাকে লোকে কি বলবে তা নিয়ে ভাবলে হবে না। যে কোনো মূল্যে আমাদের সফল হতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমাকে নিয়ে আপাতত আমার ছোট ফুপুর বাসায় উঠবো। আর হঁ্যা, তুমি কাল ঠিক ৯টার মধ্যেই নলচিরাঘাটে চলে আসবে। আমি তোমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করব। তুমি এলে নতুন করে জীবন সাজাবো। আর যদি না আস তবে মেঘনার জলে আমার লাশ দেখতে পাবে।

এই কথা বলে বিলস্নাল চোখের জল মুছতে লাগলো। রেণু নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।

বিলস্নাল আবার বলল,

- পিস্নজ, বলো না, আগামীকাল তুমি আমার জন্য ঘর থেকে বের হবে।

\হরেণু কাঁদতে কাঁদতে বলল,

- হঁ্যা, শুধু তোমার জন্য আমি সব ছাড়তে পারব। আমি আসব। আমি এখন যাই। বাড়ি থেকে এসেছি অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। যে কোনো সময় আব্বা এদিকে আসতে পারেন।

- ঠিক আছে, যাও।

- তুমি কোনো চিন্তা করবে না। তোমার রেণু তোমারই হবে।

এই কথা বলে রেণু বড় বড় পায়ে বাড়ির দিকে চলে গেল। বিলস্নালও মাথার চুল টানতে টানতে বাজারের দিকে চলে যায়।

পরদিন রেণুকে নিয়ে চট্টগ্রামে ফুপুর বাসায় উঠলো বিলস্নাল। ফুপু আর ফুপা প্রথমে তাদের মেনে নিতে না চাইলে বিলস্নাল তাদের হাতেপায়ে ধরে ম্যানেজ করে নেয়। ফুপু এক শর্তে তাদের মেনে নেন। আর তা হলো- তাদের বিয়ে করার পরই তার বাসায় তিনি রাখবেন।

ফুপুর প্রস্তাবে তারা রাজি হওয়ায় পাশের মসজিদের হুজুরসহ কাজি ডেকে ঘরোয়া পরিবেশে তাদের বিয়ের আয়োজন করা হয়। সেই সঙ্গে তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

দুই-তিনদিন ঘরে বসে থাকার পর বিলস্নাল কাজের সন্ধানে বের হলো। লেখাপড়াও খুব বেশি করেনি সে। সবেমাত্র এইচএসসি পাস করেছে। সারাদিন এদিক সেদিক হেঁটে হেঁটে হয়রান হয়েছে। কোথাও কর্মখালি নেই। ব্যর্থ হয়ে রাতে বিষণ্ন মনে বাসায় ফিরে আসে সে। স্ত্রী রেণু দৌড়ে এসে শাড়ির আঁচল দিয়ে স্বামীর কপালসহ মুখমন্ডল মুছে দেয়। বিলস্নাল খাটের ওপর হেলান দিয়ে বসে চোখ বুঁজে আছে। রেণু ফিল্টার থেকে এক গস্নাস পানি নিয়ে এসে স্বামীর পাশে বসে বলল, - এই নাও। তোমাকে খুব টেনশন বলে মনে হচ্ছে। কি, বাড়ি থেকে কোনো খবর এসেছে?

- না, আমি ওসব নিয়ে চিন্তা করি না। আজ সারাদিন একটি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছি। কিন্তু সব জায়গায় একই সাইনবোর্ড 'কর্ম খালি নাই'। এখন কি করব ভেবে কূল পাচ্ছি না।

পাশের রুম থেকে ফুপা এসে বললেন,

- এত টেনশনের দরকার নেই। কালই তুমি আমার সঙ্গে আমার অফিসে যাবে। ম্যানেজার স্যারকে বলে আমি তোমার একটা ব্যবস্থা করে নেব। এখন চল খাবে। তোমার ফুপি খাবার নিয়ে বসে আছে।

- জ্বি, চলুন।

পরদিন ফুপার অনুরোধে ফুপার অফিসে হিসাব শাখায় বিলস্নালের চাকরি হয়। অল্প বেতনের চাকরি হলেও সে মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করতে থাকে।

ওদিকে তাদের পালিয়ে বিয়ে করার খবর শুনে দুজনের বাবা-মা রাগ করে তাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগই করেননি।

\হদেখতে দেখতে তিনমাস সময় অতিবাহিত হলো।

একদিন বিলস্নাল তার ফুপুকে বলল,

- ফুপু, আমরা তো অনেকদিন ধরে তোমাদের এখানে রয়েছি। - রয়েছিস তো কি হয়েছে?

- না, মানে ইয়ে, আমি অফিসের কাছাকাছি একটি রুম দেখে এসেছি। আমি চাইছি আগামী মাসে ওখানে ওঠতে।

- এখানে কি তোদের কোনো সমস্যা হচ্ছে?

- সে জন্য না। আর কতদিন এভাবে থাকব। তা ছাড়া অফিসের কাছে থাকলে আসা যাওয়ায় সুবিধা হবে।

- যে বেতন পাস তা দিয়ে সংসার খরচ কিভাবে সামলাবি?

- নিশ্চয় সেটার একটা ব্যবস্থা হবে।

- ঠিক আছে তোরা যা ভালো মনে করিস তাই কর।

- ধন্যবাদ, ফুপু।

পরের মাসেই বিলস্নাল রেণুকে নিয়ে নতুন বাসায় ওঠে। নতুন বাসার অগ্রিম ভাড়া জমা দেয়ার পর গত মাসের বেতনের প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট টাকায় পুরো একমাস কাটিয়ে দিতে হবে। এ নিয়ে রেণুর সঙ্গে কথা বলে সে। রেণু তাকে আলস্নাহর ওপর ভরসা রাখতে বলে। স্ত্রীর সমর্থন পেয়ে বিলস্নাল আবার কাজে মনোনিবেশ করতে থাকে।

\হদেখতে দেখতে এক বছরের মতো সময় কেটে গেল।

একদিন বিলস্নাল বাসায় ফিরলে রেণু হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দরজা খুলে দেয়। রাত ১২টা পনেরো বাজে। মনের রাগকে মনে পুষে রেখে স্বামীকে ভাত দিতে আসতে চাইলে বিলস্নাল তাকে বারণ করে। 'থাক, আমার খিদে নেই। চলো ঘুমিয়ে পড়ি।'

বিলস্নালের কণ্ঠস্বরে রেণুর বুকের ভেতর ভয় জেগে ওঠে। দিনেদিনে বিলস্নাল যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে অফিসে গেলেও একটু সুযোগ পেলেই কল দিত। এখন সেখানে সারাদিনেও একটা কল দেয় না। রেণুর প্রতি তার আগ্রহও যেন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

এসব ভাবতেই রেণুর চোখে আর ঘুম নেই। প্রচন্ড টেনশনে সে বিলস্নালকে বলল,

- এই, তুমি এখানে বসো। আজ তোমাকে আমার কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।

বিলস্নাল আস্তে করে বলল,

- তোমার আবার কিসের প্রশ্ন?

- কেন? আমার কি কিছু বলবার থাকতে পারে না?

- আর কথা না বাড়িয়ে তোমার প্রশ্নটা করে ফেলো।

- তুমি দিনদিন আমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছো কেন?

- পালালাম কই?

- প্রতিদিন দেরি করে বাসায় ফিরো। আবার খুব ভোরে অফিসে চলে যাও। সারাদিন তোমাকে পাই না। রাতে এসেও ঘুমিয়ে পড়। এটা কি কোনো সংসার হলো? আমার এসব একদম ভালো লাগছে না।

- আমি আর কি করতে পারি, বল। সারাদিন কাজ করে আসি। রাতে যখন বাসায় আসি তখন কোনো কিছু ভালো লাগে না। তুমিও থাকো ঘুমে। আমার আর কিইবা করার আছে?

- এভাবে চলতে থাকলে আমি বাড়ি ফিরে যাব।

- চলে যাবে! যাও। আমি তোমাকে আটকে রাখব না। - তাহলে ঠিক আছে। আমি আগামীকালই বাড়ি চলে যাব। এই কথা বলে রেণু খাটের একপাশে শুয়ে মুখে শাড়ির আঁচল চেপে কাঁদতে লাগলো। বিলস্নাল কয়েকবার স্ত্রীকে ডাকতে গিয়েও থেমে যায়। সে মনে মনে ভাবে- যাক, ও আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাক। এই দেড় বছরে ও আমার কাছে থেকে একটুও সুখের মুখ দেখেনি। আপ্রাণ চেষ্টা করেও নিজের অবস্থান পাল্টাতে পারিনি।

এই ভেবে বিলস্নাল উল্টোদিকে মুখ করে বিষণ্ন মনে শুয়ে থাকে। ফজরের আজান হলে বিলস্নাল ঘুম থেকে জেগে ওঠে। রেণুকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে পরপর তিনবার ডাকলো। কিন্তু রেণু তার জবাব দিল না। বিলস্নাল মনে মনে বিড়বিড় করে বলল- সারারাত ঘুমায়নি। তাই হয়তো উঠতে পারছে না।

এই ভেবে বাথরুমে গিয়ে ওজু করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। রেণু তখনও জেগে আছে। সে ঘুমের ভান করেছিল। বিলস্নাল নামাজ আদায় করে খাটের ওপর বসে স্ত্রীর মুখের দিকে জলজল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এরপর বাথরুমে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। হঠাৎ রেণুর হৃৎপিন্ডটা কেঁপে ওঠে। সে নরম পায়ে এগিয়ে এসে বাথরুমের দরজায় কান খাড়া করে শুনতে থাকে। ভেতর থেকে আওয়াজ আসে, 'আমি তোমাকে সুখের স্বপ্ন দেখিয়ে এনেছিলাম, রেণু। কিন্তু নিয়তি আমার সহায় হয়নি। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করেও ঠিকমতো সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। আজ পর্যন্ত তোমাকে তোমার মনের মতো একটি শাড়ি কিনে দিতে পারিনি। তোমার বাবা-মায়ের এত কিছু থাকতে তুমি আমার শূন্য হাতে ভরসা খুঁজেছ। বিনিময়ে আমি তোমাকে শুধু অভাব অনটন আর দুঃখের গল্পের চরিত্র হিসেবে গড়ে যাচ্ছি। না, তোমাকে এত কষ্টের মাঝে আমি আর রাখতে চাই না। এভাবে আমার সঙ্গে থাকলে হয়তো এক সময় তুমিও মরে যেতে পার। কিন্তু আমি তোমাকে হারাতে চাই না। সত্যি রেণু, আমি অনেক অনেক তোমাকে ভালোবাসি।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে