logo
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২২ আষাঢ় ১৪২৬

  সোহেল রানা   ২৬ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

চেক ডিজঅনার মামলায় প্রচলিত ভুল মতবাদ

চেক ডিজঅনার মামলায় প্রচলিত ভুল মতবাদ
ভুল/অশুদ্ধ

তর্কিত চেক শুধুমাত্র 'তহবিল অপর্যাপ্ততার' কারণে নয়, অন্য যে কোনো কারণে ডিজঅনার হলেও মামলা করা যাবে।

সঠিক/আইনসিদ্ধ

অবশ্যই নয়। ১৩৮ ধারার গর্ভ, মার্জিনাল হেড এবং অধ্যায়ের শিরোনামে ব্যবহৃত বাক্য বা শব্দগুচ্ছে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, চেক ডিজঅনারের মামলা চলতে হলে ডিজঅনারের কারণটি অবশ্যই ভঁহফ বা তহবিল সংক্রান্তে হতে হবে। যেহেতু মূল আইনের বিধান স্পষ্ট, সেহেতু এখানে রুলিং প্রয়োগ করে ভিন্নতর অর্থ আমদানি করা যাবে না।

কেউ কেউ বিভিন্ন মামলার পর্যবেক্ষণ কিংবা বই-লেখকদের ব্যক্তিগত মতামতের বরাতে এটা বিশ্বাস ও চর্চা করেন যে, যে কোনো কারণে ডিজঅনার হলেই মামলা চলবে। কেউ কেউ আবার ১৮/২০টি কারণের তালিকা নিয়ে একটি ফর্দও সংরক্ষণ করেন। বিষয়টি হাস্যকর এবং আইনের স্পষ্টতায় ভেজাল ঢুকিয়ে দেয়ার নামান্তর। আইনটির (দ্য নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট-১৮৮১) ১৩৮ ধারায় এ বিষয়ে ...বরঃযবৎ নবপধঁংব ড়ভ :যব ধসড়ঁহঃ ড়ভ সড়হবু ংঃধহফরহম :ড় :যব পৎবফরঃ ড়ভ :যধঃ ধপপড়ঁহঃ রং রহংঁভভরপরবহঃ :ড় যড়হড়ঁৎ :যব পযবয়ঁব ড়ৎ :যধঃ রঃ বীপববফং :যব ধসড়ঁহঃ ধৎৎধহমবফ :ড় নব ঢ়ধরফ ভৎড়স :যধঃ ধপপড়ঁহঃ নু ধহ ধমৎববসবহঃ সধফব রিঃয :যধঃ নধহশ বাক্যসমূহ ব্যবহারের মাধ্যমে এটিই বিধান করা হয়েছে যে, ডিজঅনারের আমলযোগ্য কারণের সংখ্যা অবশ্যই সীমিত এবং শুরুতে ্তুবরঃযবৎ্থ বসিয়ে এ মর্মেও লাগাম টানা হয়েছে যে, 'তহবিল' বিষয়ক ২টি কারণের বাইরে যাতে যাওয়া না হয়। আর, চেকের মামলার বিধানকারী ১৩৮-১৪১ ধারাসমূহ নিয়ে গঠিত আইনটির সপ্তদশ অধ্যায়ের শিরোনাম এবং ১৩৮ ধারার মার্জিনাল হেডে ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ (বিশেষ করে ভঁহফ) থেকেও বোঝা যায় যে, চেক ডিজঅনারের মামলা চলতে হলে ডিজঅনারের কারণটি অবশ্যই 'তহবিল' সংক্রান্তে হতে হবে। অন্যের মতামতে নিজেকে সঁপে না দিয়ে শুধুমাত্র আইনটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে সামান্য চিন্তা করলেই উত্তর মিলবে যে, যে কোনো কারণে ডিজঅনার হলেই যদি মামলা চালানোর ইচ্ছা আইনপ্রণেতাদের থাকতো, তাহলে আইনে ওই শব্দগুলো ব্যবহার করার প্রয়োজন ছিল না।

আর, মামলার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তহবিল সংক্রান্ত কারণে ডিজঅনার হওয়াটা গ্রহণযোগ্য করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনি-দর্শনও কাজ করে। নানান কারণেই ড্রোয়ী-ব্যাংক কর্তৃক একটি চেক ডিজঅনার হতে পারে। কিন্তু তহবিল সংক্রান্ত কারণের সঙ্গে অন্য সব কারণের পার্থক্য হচ্ছে বৈধতার। ড্রোয়ী-ব্যাংক কর্তৃক তহবিল সংক্রান্ত কারণে কোনো একটি চেক প্রত্যাখাত হওয়ার মানে হচ্ছে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে চেকটিতে বৈধতার কোনো সংকট নেই। কিন্তু অন্য কোনো কারণে প্রত্যাখ্যাত হওয়া চেকের বৈধতা নিয়ে কিন্তু কোনো না কোনো প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ থাকে। মানতে হবে যে, চেক ডিজঅনারের অভিযোগে মামলা করতে হলে তর্কিত চেকটিকে যেমন আইনানুযায়ী বৈধ হতে হবে তেমনি মামলার বাদীকেও হতে হবে ওই চেকটির 'প্রাপক' বা 'বৈধ ধারক'। একটি চেক কোনো কারণে বৈধ আর কোন কারণে অবৈধ, কিংবা কে প্রাপক আর কে বৈধ ধারক, সেটির ফয়সালাও কিন্তু আইনটিতে করা আছে। আইনটিতে শুধুমাত্র ১৩৮ নয়, আরও কমপক্ষে ১৪০টি ধারা রয়েছে! আইন চর্চায় 'অন্ধের হস্তিদর্শন' ঘটলে চলে?

ভুল/অশুদ্ধ

ডিজঅনার-পরবর্তী 'ডিমান্ড নোটিস' ডাকযোগে পাঠানোর ক্ষেত্রে পোস্ট করলেই জারি গণ্য হবে, প্রাপকের হস্তগত হওয়া আবশ্যক নয়।

সঠিক/আইনসিদ্ধ

ভুল! ডাকযোগে পাঠানোর ক্ষেত্রে নোটিস অবশ্যই প্রাপকের কাছে পৌঁছতে হবে এবং পৌঁছার একটি তারিখও জানা থাকতে হবে। আর, ডাকপিয়ন নোটিস নিয়ে প্রাপকের কাছে যাওয়ার পর প্রাপক সেটি রাখতে অস্বীকার করলে তখন সেটি 'কনস্ট্রাকটিভ সার্ভিস' হিসেবে গণ্য হবে এবং এ ক্ষেত্রেও প্রাপক কর্তৃক প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে ডাক পিয়নের প্রত্যয়ন থাকতে হবে।

এই মতের সমর্থকগণের যুক্তি হচ্ছে, আইনে নোটিস দিতে হবে মর্মে বলা থাকলেও কিন্তু প্রাপককে তা পেতেই হবে মর্মে যেহেতু বলা নেই; সেহেতু জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারার বিধান অনুযায়ী নোটিস পোস্ট করলেই তা জারি হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু এরূপ ব্যাখ্যা নির্জলা ভুল। কারণ চেকদাতা-প্রাপকের ঠিকানায় নোটিস পোস্ট করলেই হলো সেটি তার হাতে পৌঁছার দরকার নেই মর্মে 'প্রিজামটিভ সার্ভিস' চেক ডিজঅনারের মামলায় গ্রহণযোগ্য নয়। জোর করে কেউ যদি ২৭ ধারা প্রয়োগ করতে চান, তাহলে ওই আইন নিজেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবে। এটা বুঝতে হলে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ এবং জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারা মিলিয়ে পড়তে হবে। চেক ডিজঅনার বিষয়ক ডিমান্ড নোটিস জারির ক্ষেত্রে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারা প্রযোজ্য না হওয়ার যুক্তি হিসেবে অনেকগুলো কারণ দেখানো যাবে। যেমন:

(১). আইনের ১৩৮ ধারায় ডিমান্ড-নোটিস পাঠানো বা জারির জন্য ৩টি বিকল্প পন্থা রাখা হয়েছে- যেন একটি ব্যর্থ হলে অন্যটির আশ্রয় নেয়া যায়। কিন্তু জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের বিধান সেখানেই চলে, যেখানে পাঠানোর একমাত্র পন্থাই থাকে ডাকমাধ্যম।

(২). তামাদি-সীমা রক্ষা হয়েছে কি না বা নালিশের কারণ কবে উপজাত হয়েছে সে বিষয়ক দিন গণনা কিন্তু শুরু হয় নোটিস পৌঁছা বা পাওয়ার (ৎবপবরঢ়ঃ) তারিখ থেকে, পাঠানোর তারিখ থেকে নয়। নালিশের কারণ উপজাত হওয়ার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে ড্রোয়ী-ব্যাংক কর্তৃক চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনাটি জানার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে চেকদাতার ওপর নোটিস জারি করানো। প্রকৃত না হয়ে 'অনুমিত' নীতি প্রয়োগ করলে জারির কোনো তারিখ জানার সুযোগ আছে কি?

(৩). ডিমান্ড-নোটিস চেকদাতার হাতে পৌঁছা কিংবা পত্রিকায় প্রকাশের পরও ত্রিশ দিন অপেক্ষা করা লাগে চেকদাতা টাকাটি দিয়ে দেন কিনা তা দেখার জন্য। নোটিস পাওয়া অর্থাৎ নিজের দেয়া চেকটি ডিজঅনার হয়েছে মর্মে ঘটনাটা জানা চেকদাতার জন্য যদি আবশ্যকই না হবে তাহলে মামলা করার আগে টাকা পাওয়ার জন্য ৩০ দিন অপেক্ষা করার শর্ত আইনে রাখা হবে কেন, কিংবা বাস্তবে জারির ঘটনা না ঘটে থাকলে ৩০ দিনের শুরু-শেষ নির্ধারণ হবে কীভাবে? ডিমান্ড নোটিসের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ঘটনাটি চেকদাতাকে জানানো এবং মামলার আগেই চেকের টাকা পরিশোধের জন্য তাকে একটি সুযোগ দেয়া এবং এটাই স্বাভাবিক ন্যায়বিচারেরও বিধান। কিন্তু প্রেরিত নোটিস বাস্তবে গড়জারি (প্রাপক অনবগত থাকা) থাকা সত্ত্বেও আইনের মারপ্যাঁচে যদি জারি হিসেবে অনুমিত হয় তাহলে তা নিঃসন্দেহে আইনের সঙ্গে ছেলেখেলা!

(৪). ডাকবিভাগের কার্যপদ্ধতি অনুযায়ী সাধারণ ডাক এবং রেজিস্ট্রিকৃত ডাকের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে। ১৩৮.(১এ) ধারায় নোটিস জারির যে তিনটি পন্থা বলা আছে তার মধ্যে বেশি চর্চিত পন্থা হচ্ছে ডাকযোগে প্রেরণ। এতে শর্ত আছে যে, ডাকযোগে নোটিস প্রেরণ করার ক্ষেত্রে 'রেজিস্ট্রার্ড পোস্ট উইথ অ্যাকনলেজমেন্ট ডিউ' প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। আইনপ্রণেতারা যদি চাইতেন যে, প্রেরিত নোটিস প্রাপক পাক বা না পাক জারি হিসেবে গণ্য হবে, তাহলে ডাকযোগে প্রেরণের ক্ষেত্রে ওই শর্ত জুড়ে দেয়া হতো না। প্রেরিত নোটিস যদি প্রাপকের কাছে পৌঁছার প্রয়োজন না-ই থাকবে, তাহলে 'এডি'র থাকার আবশ্যকতা কী বা সেটি কার জন্য?

(৫). জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারার বিধান যদি নিজ থেকেই শক্তি পেত, তাহলে দেওয়ানি মামলার সমনের ক্ষেত্রে 'অনুমিত' জারির নীতি প্রয়োগের জন্য দেওয়ানি কার্যবিধিতে সে মর্মে আলাদাভাবে বিধান করতে হয়েছে কেন? দেওয়ানি মামলার সমন ডাকঘরে পোস্ট করার ত্রিশদিন পর সেটি জারি হিসাবে গণ্য হয় এ কারণেই যে, দেওয়ানি কার্যবিধিতে সে মর্মে সুস্পষ্টভাবে বিধান করে দেয়া হয়েছে; জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারার আলোকে নয় কিন্তু।

অর্থাৎ, চেক ডিজঅনার বিষয়ক ডিমান্ড-নোটিশ জারির যে সকল পন্থা (তিনটি) ও শর্তাদি আইনের ১৩৮ ধারায় বলা আছে, সেগুলি নিবিড় ও নির্মোহভাবে পাঠ করলেই উপলব্ধি হবে যে, আইনপ্রণেতারা নোটিশ জারি করানো বলতে 'প্রকৃত' জারিই চেয়েছেন, অনুমান গ্রহণ করতে চাননি। এবং আইনপ্রণেতাদের এরুপ ইচ্ছা রক্ষাকবচ পেয়েছে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারার অভ্যন্তরে ব্যবহৃত ঁহষবংং ধ ফরভভবৎবহঃ রহঃবহঃরড়হ ধঢ়ঢ়বধৎং শব্দগুচ্ছ দিয়ে। এ কারণেই শুরুর দিকে বলেছি যে, চেক ডিজঅনার বিষয়ক ডিমান্ড-নোটিশ জারির বিষয়ে অনুমান গ্রহণের জন্য কেউ ঐ ২৭ ধারাকে ধরতে চাইলে সেটি নিজেকে সরিয়ে নিবে! এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত একটি পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ডিমান্ড নোটিশ জারি বিষয়ে যাঁরা ঐ ২৭ ধারাকে ব্যবহার করেন, তাঁরা ১৩৮ বা ২৭ ধারার কোনোটিই নিজে পড়েননি বা পড়লেও বোঝেন নি!

(চেক ডিজঅনার নিয়ে দুই পর্বের আলোচনার আজ ছাপা হলো প্রথম পর্ব)

সোহেল রানা, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, কুমিলস্না।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে