logo
বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৬

  আবদুর রাজ্জাক   ১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

বিদায় মেমসাহেব চরিত্রের স্রষ্টা নিমাই ভট্টাচার্য

বিদায় মেমসাহেব চরিত্রের স্রষ্টা নিমাই ভট্টাচার্য
মরণ ছুঁয়েছে তোমার প্রাণ

ছুঁতে পারিনি তোমার সৃজন।

জীবনমরণ প্রকৃতির কঠিনতম নিয়ম। এই আসা-যাওয়ার নিয়ম মেনে মানুষ চলে যায় আবার কেউ কেউ এই পৃথিবীতে রেখে যায় সৃজনশীল কর্মকান্ড। যা পরবর্তী মানুষের হৃদয়কে আকর্ষিত করে প্রবলভাবে। উজ্জ্বল করে পৃথিবীকে। বাংলাসাহিত্যের এমনই একজন নিমাই ভট্টাচার্য। তিনি এলেন, জয় করে নিলেন কোটি কোটি বাঙালির হৃদয় এবং রয়ে গেলেন আরো সবুজ হয়ে এপার বাংলা ওপার বাংলার ভক্তদের প্রাণে।

'মেমসাহেব' নামের কালজয়ী উপন্যাসের স্রষ্টা, সাংবাদিক ও বহুমাত্রিক প্রতিভাধর নিমাই ভট্টাচার্য গত কয়দিন আগে এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তবুও তার সৃজনশীলতা বাঙালির অন্দরমহলে ঠাঁই করে নিয়েছে কিংবদন্তির মতো।

এই সাহিত্যে বিদগ্ধ নিমাই ভট্টাচার্য যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শালিখা থানার অন্তর্গত শরশুনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন সুরেন্দ্রনাত ভট্টাচার্য। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। তিনি ১৯৪৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং কলকাতার রিপন কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তার কর্মজীবন শুরু হয়। পঁচিশ বছর দিলিস্নতে ভারতীয় পত্রিকার রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনে ভারতের অনেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফর করে নিউজ কাভার করেছেন। সাংবাদিকতা জীবনে জওহরলাল নেহেরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, ভি কে কৃঞ্চমেনন, মোরারজী দেশাই, ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেকের স্নেহভাজন ছিলেন। নির্জোট শীর্ষ সম্মেলন, কমনওয়েলথ সম্মেলনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীসহ বিখ্যাত নেতৃবৃন্দের সঙ্গী হয়ে প্রতিবেদন করেছেন। তাদের জীবনাচরণ দেখেছেন একেবারে কাছ থেকে।

এই পেশায় থাকার কারণে সেই সময়কার রাজনৈতিক মহল এবং একই সঙ্গে গস্ন্যামারের দুনিয়াকে নিবিড়ভাবে অনুভব করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার ছায়া পড়েছে তার গল্পে ও উপন্যাসে। তার প্রথম গ্রন্থ 'রাজধানীর নেপথ্যে' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। পরে লেখালেখিকেই পুরো সময়ের পেশা হিসেবে নেন। একটা দীর্ঘ পর্বে বাঙালির পড়ার খিদেকে মিটিয়েছে নিমাই ভট্টাচার্যের রচনা। ১৯৬৩ সালে তার লেখা একটি উপন্যাস কলকাতার সাপ্তাহিক 'অমৃতবাজার' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় এবং তা ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। এরপর, তার চারটি উপন্যাস একই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

এপার এবং ওপার বাংলা মিলিয়ে তার সবচেয়ে বেশি পঠিত ও জনপ্রিয় উপন্যাস 'মেমসাহেব' নিয়ে জানতে চাওয়া হলে-

বিখ্যাত এ লেখক-সাংবাদিক সম্প্রতি কলকাতার টালিগঞ্জের মোর এভিনিউতে নিজ বাসায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন-

বহুল পঠিত উপন্যাস 'মেমসাহেব'-এর আলোচিত মেমসাহেব চরিত্রটি একেবারেই কাল্পনিক। তার মতে, 'রিপোর্টার' যেমন একটি বই, 'মেমসাহেব'ও তেমনি একটি বই। পাঠক পড়ে যেটা ভাববে সেটাই আসল কথা।

মেমসাহেব প্রকাশের ৫০ বছরে এসে অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমি খুবই খুশি। ৫০ বছর ধরে একটা বই সমানভাবে জনপ্রিয় তা খুব একটা দেখা যায় না।'

\হমেমসাহেব পড়েননি, এমন বাঙালি হয়তো খুঁজে পাওয়া মুশকিল আছে। যে বইটি নিয়ে এত তোলপাড়, এত এত পাঠকপ্রিয়তা বইটি লেখা হয়েছে চিঠি আকারে।

এই 'মেমসাহেব' মূলত প্রেমের উপন্যাস হলেও এখানে রয়েছে দেশভাগের কথা, এক রিপোর্টারের অজানা জীবনকথা। সাতচলিস্নশের দেশ ভাগ পরবর্তী কলকাতা শহরের লাখ লাখ বেকারের মাঝে কি করে একজন হাফ বেকার, হাফ রিপোর্টার শুধু মনের জোর আর নিষ্ঠায় ভালোবাসার শক্তিকে অবলম্বন করে কিভাবে সর্বোত্তম পদে নিজেকে অধিষ্ঠিত করার গল্প। পুরো উপন্যাসটিই চিঠির মতো করে লেখা।

উপন্যাসের মূল চরিত্র দু'জন। একজন মেমসাহেব অপরজন এই উপন্যাসের নায়ক বাচ্চু। নিজের অনাড়ম্বর জীবনের কথাগল্প শোনাতেই একদিন চিঠি লিখতে শুরু করে দোলা বৌদির কাছে। পাঠকের চোখকে গভীর সমুদ্রের ঢেউ দিয়ে ভিজিয়ে সুনিপুণভাবে লেখক তুলে আনেন মেমসাহেব চরিত্রটিকে।

সময়ের পরিক্রমায় একদিন এই মেমসাহেব কলকাতার রাজনৈতিক লীলা-খেলায় প্রিয় ভ্রাতৃসম ভাই খোকনকে মিছিল থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় তারপর অকালমৃতু্য। যে মৃতু্যটি কারও কাম্য ছিল না। উপন্যাসের নায়ক বাচ্চুর চরম বেদনাদায়ক পরিণতি আর আকাশ ভারী করা কান্নার পরিবেশ খুব করুণ ভেসে উঠে চোখে। মেমসাহেব তার সবচেয়ে উলেস্নখ্যযোগ্য রচনা। মেমসাহেব গ্রন্থ অবলম্বনে ১৯৭২ সালে একই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার এবং অপর্ণা সেন। এ চলচ্চিত্রটি বাংলা সিনেমার রোম্যান্টিক পর্বের মাইলফলক।

'মেমসাহেব' ছাড়াও 'রিপোর্টার', 'ডিপেস্নাম্যাট', 'বংশধর', 'পিকাডেলি সার্কাস', 'চিড়িয়াখানা', 'কয়েদী', 'গোধূলিয়া', 'ইনকিলাব', 'মিনিবাস', 'ব্যাচেলর', 'মাতাল' এরকম একের পর এক উপন্যাস এক সময়ে বাঙালির অন্দরমহল মাতিয়ে রেখেছিল। অসংখ্য বই লিখেছেন নিমাই ভট্টাচার্য। তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা দেড়শ'র অধিক।

এপার এবং ওপার বাংলা মিলিয়ে তার সবচেয়ে বেশি পঠিত ও জনপ্রিয় উপন্যাস 'মেমসাহেব' ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি প্রকাশের ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। তার ৩৫ বছর বয়সে লেখা এ বইটি জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বিক্রিত একটি বই যেটি এখন পর্যন্ত সমানভাবে জনপ্রিয়।

\হ১৯৩১ সালে জন্ম নেয়া বাংলা ভাষার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য। তিনি এ অসময়ে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তার টালিগঞ্জ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এ চলে যাওয়া বাংলা সাহিত্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তার এই চলে যাওয়া এবং তার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে