logo
রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৬

  রেজাউল করিম খোকন   ১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

দুঃসময়

দুঃসময়
কালের আবর্তে হারিয়ে গেল পুরনো বছরটি। শাহেদ বাঙালির এই চিরায়ত উৎসবের আনন্দোচ্ছ্বাস দেখে আসছে সেই ছোটবেলা থেকেই। বিয়ের পর রিমিকে সঙ্গে নিয়ে বেশ অনেকবার রমনা, টিএসসি এবং চারুকলার বৈশাখী অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখতে গেছে শাহেদ। ছেলেমেয়ে দুজনকেও নিয়ে গেছে বেশ অনেকবার নববর্ষের অনুষ্ঠান দেখাতে। তবে গত বেশ কয়েকবছর ধরে বাংলা নববর্ষে রমনা, টিএসসি, চারুকলাকে ঘিরে মানুষের ভিড়-বাট্টা বেড়ে যাওয়ায় আর যাওয়া হয় না।

\হতিন বছর আগে নববর্ষের দিনে মামাতো বোন সুমনার ধানমন্ডির বাসায় পান্তা ইলিশ খাওয়ার দাওয়াত ছিল। দিনের লোকসমাগম শুরু হওয়ার আগে খুব ভোরে বাসা থেকে বেরিয়ে অনেক রাস্তা ঘুরে অবশেষে ধানমন্ডি গিয়ে পৌঁছেছিল ওরা। অনেক ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে ধানমন্ডি পৌঁছুতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছিল। নববর্ষের দাওয়াত খেয়ে বাসায় ফেরার পথেও ছিল ট্রাফিক জ্যামের বিড়ম্বনা। রিকশা, সিএনজি পাওয়াটাও ছিল দুর্লভ ব্যাপার। একটা দুইটা পাওয়া গেলেও তারা যেতে রাজি হচ্ছিল না। রাস্তায় কঠিন ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকার ভয়ে তারা বারবার মুখ ঘুরিয়ে যে যার মতো চলে যাচ্ছিল। অসহায়ের মতো বউ, ছেলেমেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে।

এতসব বিড়ম্বনার কারণে গত কয়েকবছর ধরে পহেলা বৈশাখের দিনে বাসা থেকে আর বেরোয় না শাহেদ। নিজের ঘরেই থাকে। রিমি পান্তা-ইলিশসহ হরেকরকমের ভর্তা বানিয়ে ডাইনিং টেবিলে সাজায় শুকনো মরিচ পোড়া আর পেঁয়াজ মাখিয়ে পান্তা-ইলিশের সঙ্গে নানা পদের ভর্তা দিয়ে সবাই মিলে বসে খাওয়ার আনন্দটা বেশ উপভোগ করে সে। প্রতি বছরই বাংলা নববর্ষ এলেই কয়েকদিন আগে থেকে বাজারে ইলিশ মাছের আমদানি বেড়ে গেলেও দামটা থাকে বেশ চড়া। সবার নাগালের মধ্যেও থাকে না। 'এত বেশি দাম দিয়ে ইলিশ খাওয়ার দরকার নেই, অন্য কোনো মাছের ব্যবস্থা করলেই পারো', অনেকবার রিমিকে বলেছেও। কিন্তু শাহেদের কথার পিঠে তার বউ সঙ্গে সঙ্গে বলেছে, 'আরে রাখো তোমার অন্য মাছ ইলিশ-পান্তা না হলে কী পহেলা বৈশাখ জমে? দেখো সবার ঘরে ঘরে আজ পান্তা-ইলিশের আয়োজন চলছে, এত বেশি দাম চড়ার পরও। আমরা বড় সাইজের না হলেও ছোট অথবা মাঝারি সাইজের একটা ইলিশ খাবো। সবাই একটা করে টুকরো পেলেই তো চলবে।' রিমি বাসার আশপাশের বাজার অথবা মাথায় করে পথে হেঁটে হেঁটে ফেরি করা মাছ বিক্রেতাদের কাছ থেকে কীভাবে যেন প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের আগে একটা করে ইলিশ কিনে রেফ্রিজারেটরে রেখে দেয়। পহেলা বৈশাখের সকালে ভাজা ইলিশের গন্ধে সারা ঘর ম-ম করে। প্রতি বছরই টেবিলে খেতে বসে পান্তার সঙ্গে ভাজা ইলিশের চমৎকার আয়োজনের জন্য শাহেদ তার বউকে ধন্যবাদ দেয়। ধন্যবাদ পেয়ে খুশিতে মনটা আরও ভরে যায় রিমির। তখন তার সারা চোখ-মুখে অন্যধরনের উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়তে দেখে শাহেদ।

এভাবেই প্রতিটি পহেলা বৈশাখ কাটলেও এবারে তা এসেছে চরম এক দুঃসময়ে। করোনাভাইরাসের মহামারির এই দুর্যোগে এসেছে বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ। এবার দেশের কোথাও বৈশাখ বরণে মেতে ওঠেনি কেউ। বরং এবার বৈশাখের আবাহন হয়ে উঠেছে 'ওরে আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে' এবারের বৈশাখে নিজেকে ঘরবন্দি রাখার মাধ্যমে সুস্থ ও নিরাপদ থাকার কঠিন এক যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে সবাই। সবার জীবনে নতুন বছর নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এলেও এবারের বৈশাখ ভিন্ন এক আবেদন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে টিভির খবরে শাহেদ দেখেছে যে পহেলা বৈশাখে আগে রমনার বটমূলকে ঘিরে হাজার লক্ষ মানুষের ভিড়ে জমজমাট থাকতো। অথচ এবার ভোরের সূর্যের আলো ফোটার সময় থেকেই রমনা বটমূল প্রাঙ্গণ জনশূন্য। শাহবাগ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ দেশের প্রতিটি উৎসব কেন্দ্র জনমানবহীন, সুনসান। কোনো হইচই নেই, চাঞ্চল্য ব্যস্ততা নেই। এমন পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের মানুষ কখনোই দেখেনি। ছায়ানটের বর্ষবরণ শুরু হওয়ার পর ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধকালের সময়টি ছাড়া নিয়মিতভাবেই রমনার বটমূলে নতুন বছরকে বরণ করার ডাক দিয়ে অনুষ্ঠান করে আসছে। অথচ এবার তা হয়নি। কারণ, বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবীকে এখন করোনাভাইরাসের মহামারি গ্রাস করেছে।

কোভিড-১৯ নামের মরণঘাতী এক ভাইরাসের প্রকোপে আজ সারা বিশ্ব প্রকম্পিত। ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে দেশে দেশে। মানুষের পৃথিবীতে চলছে চরম এক অমানবিক অনিশ্চিত সময়। পৃথিবীর মানুষ হাজার বছরেও এমন ভয়ঙ্কর এক সময়ের মুখোমুখি হয়নি।

\হব্যাপারটা মনে হতেই শাহেদের বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

এবার বাসায় অন্যান্য বছরের মতো বৈশাখী খাবারের জমজমাট আয়োজন নেই। ঘরবন্দি জীবনে অন্যান্য দিনের মতো গতানুগতিক রুটি ভাজি ডিম দিয়ে সকালের নাশতা সারতে হয়েছে, নাশতার টেবিলে বসে রিমি বেশ কিছুক্ষণ আক্ষেপ করেছে।

'আহারে জীবনে এমন পহেলা বৈশাখ আগে কখনও দেখিনি। ঘরে বৈশাখী আমেজ নেই। বাইরে কোথাও যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। আনন্দ, উচ্ছ্বাস, ছুটোছুটি, ব্যস্ততা নেই কোথাও। সবাই ঘরে কীভাবে নিজেদের বন্দি করে রেখেছি। এমন তো আগে কোনো সময়ে হয়নি।'

মায়ের কথায় সুর ধরে প্রভা বলে, 'আজ আমরা বাইরে যেতে না পারলাম। কিন্তু ঘরে তো তুমি বৈশাখী খাবার-দাবারের ব্যবস্থত্মা করতে পারো, আমরা খেয়ে-দেয়ে না হয় পহেলা বৈশাখটাকে অন্যভাবে সেলিব্রেট করলাম।'

এবার রিমি মেয়ের কথায় অনেকটা রেগে যায়। ধমকে ওঠে সে, 'খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করতে পারো' যে বললে তোমার কী খেয়াল আছে বৈশাখী খাবার-দাবার তৈরি করার মতো ঘরে কী কিছু আছে। বাজারে যেতে পারছি না কতদিন ধরে। দারোয়ানকে পাঠিয়ে অল্প যা কিছু আনতে পারছি তা দিয়ে অনেক কষ্টে টেনেটুনে চালাতে হচ্ছে। প্রতিদিন খেতে বসে টের পাচ্ছো না? নিজে যদি বাজারে যেতে পারতাম তা হলে না হয় একটা কথা ছিল। ভালো একটা বৈশাখী নিরামিষ রাঁধতে গেলেও কত ধরনের তরিতরকারি লাগে, সেগুলোর জোগাড় কী আছে বাসায়? আমি কীভাবে কী করব, বলে দাও।'

মায়ের ধমক শুনে চুপসে যায় প্রভা। মায়ের সঙ্গে আর তর্কে যায় না। সেও ভালো করে জানে, এখন যে পরিস্থিতি চলছে তাতে অন্য বছরের মতো বৈশাখী স্পেশাল খাবার-দাবারের আয়োজন করা সম্ভব নয় তার মায়ের পক্ষে। তেমন পরিস্থিতিতে দীপ্ত বিকল্প প্রস্তাব দেয় তার মাকে।

'আম্মু, আজ ইলিশ-পান্তা হোক, ঘরে ফ্রিজে যে মাছ আছে তার কয়েক পিস ফ্রাই করো, আলুর ভর্তা, টমেটোর চাটনি, শিমের ভর্তা করো, ডাল রান্না করো, এগুলোই এবার আমাদের পহেলা বৈশাখের স্পেশাল আইটেম। আমরা সবাই মিলে বেশ মজা করে খাবো।'

এমনিতে বাসায় রান্না-বান্নায়, খাবার মেনু্য তৈরিতে দীপ্ত প্রায় সময়েই তার মাকে বুদ্ধি পরামর্শ দেয় সাধারণ সময়ে। রিমিও ছেলের মতামতকে মূল্য দেয় তার ফরমায়েশ, বুদ্ধি পরামর্শ অনুযায়ী বাসার খাবার-দাবারের মেনু্য ঠিক করে। এটা শাহেদও জানে ভালো করে, এজন্য সে ছেলেকে ফুড এক্সপার্ট বলে ক্ষেপায় সুযোগ পেলেই। আজ অবশ্য দীপ্তকে তেমন কিছু বলে না। ছেলেটি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। সে আর ছোট্টটি নেই। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী তাল-মিলিয়ে চলার মতো বোধ এবং মানসিক সক্ষমতা অল্প অল্প করে সে অর্জন করেছে, এটা উপলব্ধি করে কিছুটা মুগ্ধ হলো।

বউয়ের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল সে, 'বাজারে যেতে পারলে তো কত কিছু আনা যেত। অবশ্য এখন আগের মতো বাজারও বসছে না। সব ধরনের তরিতরকারিও তো বাজারে আসতে পারছে না। দারোয়ানকে পাঠিয়েও তো কোনো কাজ হবে না। আমিই তো তোমাকে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে নিরামিষ রান্না করতে কাঁচা কাঁঠাল, কলা গাছের মোছা, মিষ্টি আলু, গেছো আলু এমন আরও কত কী এনে দিই বাজার থেকে। এবার তো তেমন অবস্থা নেই। দীপ্ত তোমাকে যেভাবে বলেছে সেটা করতে হয়তো তোমার সমস্যা হবে না তেমন। কারণ এসব ভর্তা আর ফিস ফ্রাই করার মতো আলু, মাছ, সবজি তো ঘরেই আছে। বাইরে থেকে কিছু আনতে হচ্ছে না। এটা হলো, নিজেদের সীমাবদ্ধ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করে সংকট উত্তরণের প্রচেষ্টা। ওহ ভালো কথা, আলুর ভর্তাটা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, শর্ষের তেল দিয়ে ভালো মতো করবে কিন্তু। আরে, আলুর ভর্তা আর ডাল হলেই আমার ডিমান্ড পুরোপুরি মিটে যায়। এটা আমার দারুন ফেভারিট মেনু্য তুমি তো জানোই।'

রিমি বেশ ভালো করে জানে শাহেদের ভীষণ পছন্দের খাবার হলো ভাতের সঙ্গে আলু ভর্তা আর ডাল। এবারের পহেলা বৈশাখে অন্যকিছু না হোক তার পছন্দের আলু ভর্তা আর ডালটা ভালোভাবে করতে হবে, সিদ্ধান্ত নেয় সে।

'ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। এবার তোমরা সবাই আমাকে একটু হেল্প করবে আমার বিশেষ অনুরোধ। কারণ, আগে তো বুয়া এসে আমাকে নানা কাজের জোগান দিত। এখন এক হাতে আমাকে সব করতে হচ্ছে। পিস্নজ, তোমরা সবাই এসে হাত লাগাও কাজগুলো ঝটপট করে ফেলতে পারি যেন, রিমি হাসতে হাসতে বলে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে