logo
  • Thu, 15 Nov, 2018

  শীলা বৃষ্টি   ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০  

গ্রন্থালোচনা

আমার ঘরে বাস করে কয়জনা

আমার ঘরে বাস করে কয়জনা
কৌত‚হল উদ্দীপক একটি প্রশ্ন দিয়ে যে-উপন্যাসের শিরোনাম রচিত হয়েছে সে-উপন্যাস শেষ পযর্ন্ত আগ্রহ ধরে রাখবে এই ব্যাপারে একটা বিশ্বাস পড়বার আগেই যেন ভিত গড়ে তুলেছিল পাঠক মননে। যদিও নামকরণটি একটি লোকগানের প্রখম কলি থেকে উৎসরিত কিন্তু তা উপন্যাসটিকে শক্ত গাঁথুনিতে গেঁথে দিয়েছে। এবং কীভাবে তা ঘটেছে তা-ই আমরা আলোচনা করব এই লেখায়।

উপন্যাসটির শুরু আসমা নামের একটি মেয়ের আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। জীবনের সব সাফল্যের ভেতরও মেয়েটি নিজেকে হত্যা করার বিভিন্ন উপায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু মৃত্যুর চাইতেও মূলত মৃত্যু-প্রক্রিয়ার প্রতি তার আগ্রহ ও কৌতূহল পাঠককেও সমান কৌতূহলী করে তোলে গল্পের শুরুতেই। মেয়েটির সাথে সাথে পাঠক গল্পটিতে ভ্রমণ শুরু করলে একসময় আবিষ্কার করে মেয়েটির অবচেতনে একইসঙ্গে দু’জন পুরুষের প্রতি আকষর্ণ এবং প্রথমজনের সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধতার কারণেই মেয়েটি অপরাধবোধ থেকে এমন ভাবনায় উৎসারণ। সত্যি কি তাই! অভিজ্ঞ পাঠক তাদের ব্যাপৃত পাঠরুচি ঘেঁটে বের করতে পারেন এই আপাতসরল সমস্যার মধ্যে একটি জটিল মনোজাগতিক দ্ব›দ্ব রয়েছে। রয়েছে এই সকল পাওয়ার ভেতরে একজন তরুণীর আকাক্সক্ষার প্রবল বেদনা। সে কী চায় সে নিজেও হয়তো জানে না। কিন্তু একটি তৃষ্ণা তাকে জাগিয়ে রাখে, তাকে জ্বালিয়ে রাখে চাচের্র মোমবাতির মতো।

আর যারা সরল পাঠক তাদেরকেও লেখক বঞ্চিত করেননি এই উপন্যাসে। তারা এই জটিল মনস্তত্তে¡র ভেতরেও নিজেদের কাক্সিক্ষত একরৈখিক গল্পটি আবিষ্কার করে নিতে পারে।

শৈশব থেকেই আসমার সঙ্গে সাইফের প্রগাঢ় বন্ধুতা নিজেদের অজান্তেই ভালোবাসায় রূপ নেয়। প্রেম কী জানার আগেই তারা পরস্পরের প্রতি গভীর প্রণয়ে আবদ্ধ হয়। প্রথম অবস্থায় আসমার পরিবারে অসম্মতি থাকলেও বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে দুই পরিবারই তাদের মেনে নেয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সাইফকে বিদেশে চলে যেতে হয় সুষ্ঠুভাবে সংসারের হাল ধরার জন্য। সংসার বলতে নিজের পরিবার এবং আসমা। আসমাকে সুখী দেখতে আসমার পরিবারের কিছু দায় নিজের কঁাধে নিয়ে নেয় সাইফ। ফলে সাইফের প্রতি আসমার কৃতজ্ঞতার পাহাড় যেন দৈঘর্্য ও আয়তনে আরেকটু বেড়ে ওঠে। কিন্তু যে-প্রেম বোঝার আগেই পাথরের মতো জমাট বেঁধেছে আর কৃতজ্ঞতার শক্ত খোলস যাকে চারদিক থেকে মুড়িয়ে রেখেছে সোহাগ স্যারে আবিভাের্ব ভেতর থেকে ফাটল ধরে সেই প্রেমে। কিংবা ঠিক ফাটলও বলা যায় না, আসলে অপরিণত প্রেমকেই যেন আসমা নতুন করে আবার আবিষ্কার করতে চায় সোহাগ স্যারের প্রতি তীব্র আকষের্ণর ভেতর দিয়ে।

অন্যদিকে সোহাগ স্যারের জীবনও তীব্র নাটকীয়তায় মোড়া। রূপ, জৌলুস, শিক্ষা-দীক্ষায় অপ্রতিদ্ব›দ্বী-প্রায় সোহাগ স্যার ভাগ্যের ফেরে বাংলাদেশে এসে পড়েছেন। অপেক্ষায় আছেন নিজের ভালোবাসার মানুষ সারা গোল্ডস্মিথের কাছে ফিরে যেতে। শুধু একটু সুসময়ের অপেক্ষায় আছেন তিনি। কিন্তু তিনি তো জানেন না আপাতভাবে যাকে তিনি দুভার্গ্য বলে মেনে নিচ্ছেন তা আসলে তার প্রেমিকা সারার বাবারই সৃষ্টি। অঢেল ক্ষমতাবান ইহুদি ব্যবসায়ী আইজ্যাক গোল্ডস্মিথ নিজের মেয়ের সাথে সোহাগকে সম্পকের্ জড়াতে দিতে চান না বলেই ক‚টকৌশলে ফেরত পাঠিযেছেন তার নিজের দেশে।

সোহাগের কি আসমাকে ভালো লাগে? ভালো না লাগার কোনো কারণই তো নেই। অসম্ভব রূপবতী, মেধাবী, সপ্রতিভ আসমা যে কাউকেই আমূল নাড়িয়ে দিতে পারে মুহূতের্র মধ্যে। কিন্তু বয়স ও মননে পরিপক্ব সোহাগ নিজের ভালোবাসার প্রতি স্থির-প্রতিজ্ঞ আসমার মধ্যে প্রেমের প্রকৃত স্বরূপ আবিষ্কার করে যেন। মেয়েটির জন্য তার অন্যরকম ভালো লাগা তৈরি হয়। সারার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ সোহাগ নিজের ভালোবাসাকেই যেন অভিনন্দিত করতে চায় সাইফের প্রতি আসমার দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে। যদিও জানে না, আসমার ভালোবাসার ছেলেটি কে? এবং এও জানে না, আসমার হৃদয়ের গহীনে জাদুকর পতাকা নাড়িয়ে দিয়েছে। সেই জাদুকর আর কেউ নয়, সোহাগ নিজেই।

কিছু অনুভ‚তি থাকে যা মানুষ তার সীমিত প্রকাশভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এ এমন এক আকুলতা যা মানুষকে বিহŸল করে তোলে, অসহায় করে তোলে; এমনকী জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ করে তোলে কখনও কখনও। জীবনকে ক্ষুদ্র মনে হয় তখন, যখন এই অনুভ‚তির ক্রমাগত ঢেউ আছড়ে পড়ে পাড় ভেঙে দিয়ে যায়। আসমা ঠিক এমন এক উত্তাল ঢেউয়ের ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করে। এই অবণর্নীয় যন্ত্রণা আসমাকে কুরে কুরে খায়। মৃত্যুকেই তখন সহজ সমাধান মনে হয়। এখানেই লেখক তার চরম মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। পরিমিত বাক্যভঙ্গিতে আবেগের বাহুল্য বজর্ন করে এক অসাধারণ সরল বয়ানভঙ্গি তিনি তৈরি করেছেন, যা উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রনহীন অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়। এর ঢেউয়ের ছিটে পাঠকের গায়ে এসেও লাগে। চরিত্রগুলোর সঙ্গে পাঠক ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়।

এই উপন্যাসের আরেকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানকার প্রতিটি চরিত্রই স্বতন্ত্র এবং পরিপূণর্। যার ফলে উপন্যাসটি সম্পূণর্ভাবেই সম্পন্ন হয়ে উঠেছে। কোথাও অতৃপ্তি থেকে যেতে পারেনি। বরং কোথাও কোথাও এই সম্পূণর্তা কিছুটা বিস্তৃত। যেমন জোবায়েদার শাশুড়ি মানে আসিফের মৃত মায়ের প্রতি তার বাবার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের অভিব্যক্তি প্রকাশ। নিশ্চিতভাবে এই অংশটুকুর প্রয়োজন ছিল এই উপন্যাসে। কারণ, একটি পূণার্ঙ্গ গল্প নিমাের্ণর ক্ষেত্রে এইসব শক্তিশালী শাখাগল্প শুধু সৌন্দযর্বধর্ণই করে না, গল্পে এনে দেয় ভিন্ন আমেজ। তাই তৃপ্তির ঢেকুর এই অংশেও অব্যাহত।

লেখক উপন্যাসটির বণর্নাভঙ্গিতে নিজের পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান জুড়ে দিয়েছেন কখনোসখনো। এই ছোট-ছোট সংযোজনগুলো লেখাটিকে আরও সত্যের দিকে নিয়ে গেছে। কল্পনার ভেতরে সত্য যেমন কল্পনাকে গাঢ় করে তেমনি জীবনের এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলো গল্পটিকে সুসংহত করেছে। উপন্যাসটির আরেকটি অংশ নিমগ্ন পাঠকের আনন্দকে জাগিয়ে তোলে ক্ষণে ক্ষণে, তা ‘পিংগা দুপুরির অলঙ্কার। এই হিন্দি গানের আপাতচটুল পঙ্ক্তিটির ব্যবহার উপন্যাসটিকে অলঙ্কৃত করেছে। ছোট্ট কিন্তু চমকজাগানিয়া এই শব্দটি একদিকে যেমন ধারণ করে তারুণ্যের উচ্ছ¡াসকে তেমনি এর মাঝে সুপ্ত থাকে চরম হতাশার মাঝেও মানুষের স্বাভাবিক থাকার অভিনয় প্রচেষ্টার বেদনাটিও দুইয়ের দ্ব›েদ্ব টালমাটাল হয়ে আসমা যখন আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তখন তাকে নবীনবরণ উপলক্ষে এই গানের সঙ্গে নাচতে হয়েছিল।

সুপরিকল্পিত এই উপন্যাসটিতে লেখক একদিকে যেমন দেখিয়েছেন মানব মনের দোলাচলবৃত্তি থেকে উদ্ভ‚ত অস্তিত্বের সঙ্কট, তেমনি অনেক নদী সরোবর সঁাতরিয়ে তাকে নিয়ম, শৃঙ্খলা এবং সভ্যতার আবরণের মাঝে তাকে প্রতিস্থাপন করে সামাজিক সমতা নিধার্রণ করেছেন নিপুণ কৌশলে। আর তাই আসমা সোহাগ স্যারের প্রতি গভীর আকষর্ণ ভুলে ফিরে গেছে সাইফের কাছে, সোহাগও খুঁজে পেয়েছে সারাকে। লেখক উপন্যাসের নামের মধ্যে এক গভীর রহস্য জাগ্রত রেখে আমাদের অনুসন্ধানে ব্রতী করে তুলেছেন সেই সত্যেরই যে-সত্য জীবনকে সুস্থির ও স্বস্তির করে তোলে। আমাদের অন্তরে অনেকের আসা যাওয়া থাকলেও তার গহীন কন্দরে নিরন্তর বাস করে আমাদেরই নিয়তি, হয়তো সত্য প্রেম। আর তাই উপন্যাসের শুরুর প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যায় শেষে, আমার ঘরে বাস করে একজনা।

যাচিত পদাথের্র মোড়কটিকে শুধু সৃদৃশ্য হলেও চলে না তাকে রসেও টইটম্বুর রাখতেও হয়। এই গ্রন্থটির নামকরণ এবং পাবলিকেশনস ঠিক এই কাজটিই করেছে। চারুপিন্টুর অঁাকা প্রচ্ছদটিও আমাদের ভাবনার খোরাক জোগায়। শব্দ সাজিয়ে অঁাকা প্রচ্ছদটি উপন্যাসটির প্রতি আগ্রহের সলতে প্রথম দেখাতেই উসকে দেয়। প্রচ্ছদ আর উপন্যাসের এই মেলবন্ধন ইদানীং বাংলা উপন্যাসে নিয়মিত হয়ে উঠছে। এটি খুবই আশাব্যঞ্জক।

উপন্যাসের শুরুর চমক, কাহিনীর প্রবাহন প্রক্রিয়া, চরিত্রের মনস্তাত্তি¡ক বিলোড়ন, উপান্তে প্রাপ্ত দশর্ন প্রভৃতির সুসমন্বয় উপন্যাসটি পাঠককে সক্রিয় রাখে শেষ পৃষ্ঠা পযর্ন্ত। আর এখানেই একজন সূ² পরিমিতিবোধের নিখুঁত শিল্পী হয়ে ওঠেন ঔপন্যাসিক; এই শিল্পীর আছে অফুরন্ত জীবনতৃষ্ণা। এই শিল্পী জীবনরসিক, জীবনবাদী। সাধারণ এবং অসাধারণ দুই জীবনের গরল আর অমৃতের তীব্রতাকে এক অনন্যসাধারণ ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করেন ঔপন্যাসিক ইমরান চৌধুরী।

আমার ঘরে বাস করে কয়জনা

ইমরান চৌধুরী, প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ

প্রচ্ছদ: চারুপিন্টু
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে