logo
মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

বৃহন্নলাদের থাকুক নিজস্ব পরিচয়ে শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা

একসময় হিজড়াদের প্রতি প্রায় সবাই সহানুভূতিশীল থাকলেও বর্তমানে তাদের দ্বারা মানুষজন অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনার শিকার হওয়ায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিরূপ। কিন্তু জনসাধারণের বিড়ম্বনার পথ হিজড়াদের কেনই বা বেছে নিতে হয়? রাষ্ট্রের সব পর্যায়েই তারা অবহেলা, অপমান, উপহাস এমনকি নির্মম প্রহারেরও শিকার। কারো মুখাপেক্ষী বা বিড়ম্বনার কারণ হয়ে নয়, আসুন আলোর পথে। রাষ্ট্রীয় অধিকার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করুন। আর তাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকায়। এভাবেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিষ্ঠিত হবে স্মার্ট বাংলাদেশ।

বৃহন্নলাদের থাকুক নিজস্ব পরিচয়ে শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা
ডেনিশ গার্ল' নামক ডেনমার্কের একটি সিনেমায় নায়িকা লিলি তার প্রিয়তমকে বলেছিলেন, 'এড়ফ সধফব সব ধ ড়িসধহ. ইঁঃ :যব ফড়পঃড়ৎৃঐব...ঃযব ফড়পঃড়ৎ রং পঁৎরহম সব ড়ভ :যব ংরপশহবংং :যধঃ ধিং সু ফরংমঁরংব.' ঈশ্বর আমাকে মহিলা বানিয়েছেন। তবে ডাক্তার...তিনি...ডাক্তার আমাকে অসুস্থতা থেকে নিরাময় করেছেন...... যা আমার ছদ্মবেশ ছিল।

বিভিন্ন জাতিসত্তার নিবিড় মেলবন্ধনে তৈরি আমাদের সংস্কৃতি-কৃষ্টি। এখানে পরিচালিত হয় বিভিন্ন রকমের মানুষের জীবনধারা। লিঙ্গ ভিন্নতায় নারী ও পুরুষ বাদ দিলে আরও একটি গোত্র আছে যাকে আমরা বলি তৃতীয় লিঙ্গ। তারা পুরুষও না, নারীও না। সমাজে তাদের বলা হয় হিজড়া। খেয়াল করলে দেখা যায়, অনেকেই অবজ্ঞার্থে এদের হিজড়া বলে থাকেন। দেশের অনেক স্থানে এদের বলা হয় 'ছক্কা'। কিন্তু এই মানুষের পরিচয় অন্যভাবেও আছে। যেমন, বৃহন্নলা, শিখন্ডি, নপুংসক, ক্লীবলিঙ্গ, উভয়লিঙ্গ, ট্রান্সজেন্ডার, কমনজেন্ডার, ইন্টারজেন্ডার বা হারমাফ্রোডাইট।

এসব তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর পথে বাধা বা চ্যালেঞ্জ এক নয় একাধিক, আমাদের দেশে হিজড়া কথাটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে তা হলো- নবজাতকের আগমনে নাচ-গান-বাজনায় মেতে ওঠে যারা। দেখতে ভিড় জমায় সব বয়সী মানুষ; হয় বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

সময়ের বিবর্তনে পরিবর্তন ঘটেছে সর্বত্রই। এক সময় হিজড়াদের প্রতি প্রায় সবাই সহানুভূতিশীল থাকলেও বর্তমানে তাদের দ্বারা মানুষজন অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনার শিকার হওয়ায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিরূপ। কিন্তু জনসাধারণের বিড়ম্বনার পথ হিজড়াদের কেনই বা বেছে নিতে হয়? রাষ্ট্রের সব পর্যায়েই তারা অবহেলা, অপমান, উপহাস এমনকি নির্মম প্রহারেরও শিকার। সমাজ-রাষ্ট্রের কোথাও যেমন সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা নেই, তেমনি নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে নিজস্ব লৈঙ্গিক পরিচয়ে শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পিতামাতা হিজড়া সন্তানের পরিচয় দিতে সঙ্কোচবোধ করেন। পাশাপাশি সমাজ কারো 'হিজড়া' পরিচয় জানার পর ভুক্তভোগীদের আপন করে নিতে ব্যর্থ। ফলে মানসিক হীনমন্যতা, লোকলজ্জা সর্বোপরি সামাজিক নিগ্রহের শিকার হয়ে তাকে যেতে হয় 'গুরু মা'-এর আশ্রয়ে। আয়ত্ত করতে হয় নাচ-গান-বাজনা-হাততালি, অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি; বেছে নিতে হয় ব্যতিক্রমধর্মী একটি জীবনধারা।

হিজড়াদের সামাজিক বিড়ম্বনা বর্তমানে চরম নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে। আগে জনসাধারণ হিজড়াদের কিছু দিলে আনন্দের সঙ্গে নিতেন, দাবি থাকলে জানাতেন; থাকতো সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু সহনশীলতা এবং সৌহার্দ্য বর্তমান সমাজ থেকে বিলুপ্তপ্রায়। রাস্তাঘাটে-যানবাহনে-বাড়িতে হিজড়াদের নির্যাতন জনজীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ; চাঁদাবাজি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, আক্রমণাত্মক আচরণ, অশ্রাব্য ভাষা, নবজাতককে ছুড়ে ফেলা, কৃত্রিম হিজড়া তৈরি, খুনোখুনিসহ লোমহর্ষক কাহিনী গণমাধ্যমে আসে প্রায়ই। একটি তরতাজা উদাহরণ দিচ্ছি। আমার পরিচিত সন্তানসম্ভবা একজন ভদ্র মহিলার প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ জানতে পেরে হিজড়ারা ইতোমধ্যে কয়েকবার চাঁদা দাবি করেছেন এবং প্রসবের পর সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছেন। সন্তান জন্মগ্রহণের জন্য হিজড়াদের পাঁচ হাজার টাকা দিতে হলে উচ্চমূল্যের বাজারে তার সংসার চলবে কিভাবে? নিম্ন আয়ের মানুষজনের ওপর হিজড়াদের অত্যাচার-জুলুম চলতে থাকলে যে কোনো মুহূর্তে মানবিক বিপর্যয় ঘটতে বাধ্য। নষ্ট হতে পারে সামাজিক সম্প্রীতি-সহানুভূতি। লোকলজ্জার ভয়ে জনসাধারণ প্রকাশ্যে কিছু না বললেও পুঞ্জিভূত হচ্ছে ক্ষোভ; যার বিস্ফোরণ শক্তিশালী সামাজিক বন্ধনের বিপরীতে তৈরি হবে লজ্জাকর উদাহরণ।

অজস্র ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত দেশে প্রত্যেকে তার নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচার অধিকার রাখেন। ব্যতিক্রম হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যথাযথ প্রতিকার চাইতে পারেন। যদিও হিজড়াদের ব্যাপারে আইনি প্রক্রিয়াসমূহ জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে উভয় পক্ষের মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে এ সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত অপরিহার্য।

বাংলাদেশে ১০ বছর অন্তর আদমশুমারি হলেও আজও হিজড়াদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় হয়নি। আদমশুমারিতে নির্দিষ্টভাবে লিঙ্গভিত্তিক জনসংখ্যা উলেস্নখ থাকে। এ সময় প্রতিটি মানুষকে গণনা করা হলে হিজড়াদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় অসম্ভব নয়। যদিও সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপ অনুসারে হিজড়াদের সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। আইসিডিডিআরবি'র ২০১২ সালের জরিপ অনুসারে নয় হাজারের কিছু বেশি। অভিযোগ, সেই জরিপে মাথা গণনা নয়; হিজড়া নেতাদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সংখ্যা নির্ণয় করা হয়। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থাসহ হিজড়াদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যানুসারে তাদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের মতো। অর্থাৎ পরিসংখ্যানের খেরো খাতা এখানে বড়ই অসহায়! তাই হিজড়াদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয়ে দায়িত্বশীল মহলের সক্রিয়তা অত্যন্ত জরুরি।

২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে 'লিঙ্গ' যথা 'হিজড়া লিঙ্গ' হিসেবে চিহ্নিত করে নীতিমালা অনুমোদিত হয়। ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা ইশতেহারে ঘোষণা দেয় যে, "বাংলাদেশ সরকার 'হিজড়া সম্প্রদায়'কে 'হিজড়া লিঙ্গ' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে"। একইভাবে কোনো একটি দিনকে 'হিজড়া লিঙ্গ দিবস' হিসেবে উৎসর্গ করা হলে সেটা হবে তাদের জন্য বিরাট সম্মানজনক। এদিকে নির্বাচন কমিশনের ২০১৮ সালের ১০ জুলাই 'হিজড়া জনগোষ্ঠী'কে 'তৃতীয় লিঙ্গ' হিসেবে ভোটার তালিকায় নাম নিবন্ধনের সিদ্ধান্তনুসারে শতভাগ প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হলে দৃষ্টান্তমূলক একটি অগ্রগতি হবে।

বিশ্বব্যাপী হিজড়াদের আছে উলেস্নখযোগ্য সাফল্য। ওবামার প্রশাসনে হোয়াইট হাউসের নিয়োগ বিভাগের পরিচালক ছিলেন একজন হিজড়া এবং তাদের অধিকার আদায়ের কর্মী 'রাফি ফ্রিডম্যান গুর্সপান'। ভারতে বিচারপতি হয়েছেন হিজড়া 'জয়িতা মন্ডল'। ৪ জানুয়ারি, ২০১৫; ভারতের ছত্তিশগড়ের রায়গড় মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে হিজড়া 'মধু কিন্নর' মেয়র হয়েছেন। পাকিস্তানে হিজড়া 'মারভিয়া মালিক' সংবাদ উপস্থাপক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মডেল হয়েছেন। দৃষ্টান্ত আছে বাংলাদেশেও। সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভা নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন 'দিথি বেগম' এবং 'সুমি খাতুন' নামে দুইজন হিজড়া। বিউটি পার্লার ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন 'শাম্মী' হিজড়া। এদিকে হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কর্তৃক গৃহীত হচ্ছে নানা কর্মসূচি। এ সব কর্মসূচির সুফল প্রকৃত হিজড়ারা পাচ্ছেন কিনা সে বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রে হিজড়াদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে তারা জনবোঝা থেকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও রাখতে পারবেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান- কারো মুখাপেক্ষী বা বিড়ম্বনার কারণ হয়ে নয়, আসুন আলোর পথে। রাষ্ট্রীয় অধিকার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করুন। আর তাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকায়। এভাবেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিষ্ঠিত হবে স্মার্ট বাংলাদেশ।

\হজয়ন্ত কুমার সরকার

লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক এবং গণমাধ্যম কর্মী।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে